অনেক মহাপুরুষ এবং মহিলা আছেন ,যাঁরা দুধ খেতে ভীষণ ভালোবাসেন ,আমি দূর থেকে তাঁদের সশ্রদ্ধ এবং ভীতু ভীতু প্রণাম জানাই ,কী অসাধারণ শক্তি তাঁদের ,বাবারে !!!
সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে দুধের সাথে আমার শত্রুতা l জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ওই ফ্যাটফ্যাটে সাদা তরলের গন্ধ ,বর্ণ ,স্বাদ কিছুই পছন্দ হতো না আমার ,তা সে যতই চড় ,গাট্টা ,কানমলা সহ্য করতে হোক না কেন l
চেহারা এমন ছিলো ,বেশী হাওয়া এলে বড়রা বলতেন "ওরে ,ধরে রাখ ওটাকে , নইলে উড়ে যাবে "এহেন অবস্থায় মায়ের এবং ঠাকুমার ইচ্ছে ছিলো যতোটা পারা যায় খাবার দাবার আমার পেটে চালান করে দেওয়া , চেঁচামেচি ,মারধোর , এমনকি খেলনার লোভ দেখিয়েও l
"আমার মাছ শুধু ভাজা হবে ,একটুও ঝোল লেগে থাকবে না l"
" ইস্ !! নিজেদের রান্না কী সুন্দর দেখতে ,আর আমার বেলায় বিচ্ছিরি কালো আর হলুদ রঙের ঝোল ??একদমই খাবো না ,(গালে জোর করে ঠুসে দিলেও না) , "
"ও বৌমা ,তোমার এই বদমাইশ মেয়েকে খাওয়ানো আমার পক্ষে সম্ভব না , হাত শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে গেলো ,ভাত সবটা থালায় পড়ে ,নাও কী করবে করো ,আমি উঠলাম "
"কী বাজে রান্না করো তোমরা ,টিফিনে সরিতা আমাকে ওর মায়ের রান্না সিমুই এর পায়েস খাইয়েছে জানো ?"
"তা যা না ,ওদের বাড়ী গিয়েই থাক ,বাড়ীর পায়েস তার মুখে রোচে না ,কার না কার রান্না ওই কেন্নো গুলো সোনামুখ করে খায় ,দাঁড়া ,বিয়ে দিয়ে দেবো ,শাশুড়ি পিটিয়ে গেলাবে "
অদেখা সেই শাশুড়ি ভয়ঙ্কর রূপে কল্পনায় এলে ভয়ে ভয়ে কিছুটা খাবার গলাধঃকরণ করতাম ,মোটামুটি এই ছিলো রোজনামচা ......
আর সব খাবার কিছু কিছু মারধরের পর পেটে ঢুকলেও দুধ খাওয়াতে এলেই চিত্কারের শব্দে বাড়ীর অন্য লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে যেতেন , আদরের মেয়ের ,ভাইঝির অথবা নাতনীর উপর এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁরা মাঝে মাঝেই জোটবদ্ধ হতে চেষ্টা করতেন ,কিন্ত ওই যা হয় ,দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার ,ইত্যাদি ইত্যাদি ..........
দুধের স্বাদ বদলানোর চেষ্টা করা হলো ,তখন ছিলো নিউট্রামূল ,চকলেট ফ্লেভার ,দেখা গেলো পাজী শয়তান মেয়েটা (কতো যে বিশেষণ যোগ হতো ওই ছোট্ট মেয়েটার নামের আগে ,আহারে ,ভাবলেও কষ্ট হয এখন )শিশি ভর্তি উড়িয়ে দিচ্ছে এমনি এমনি খেয়ে ,আর দুধের গ্লাসটা দুখু দুখু মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে l
মাঝে মাঝে অন্য পথও আবিষ্কার করতে হতো ,(কেয়া করে , জিন্দেগী কা সওয়াল ) ,সেই পথে কয়েকদিন নির্বিঘ্নে চলার পরে আবার কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো জানলার তলায় ,যেখানে একটা গাছের পাতা সব সাদা হয়ে গেছে ,আর টুপটাপ করে দুধের ফোঁটা পড়ছে ,এ বাবা ! এদিকে কেউ আসে না বলেই তো এই জানলাটা দিয়ে দুধটা ফেলেছি ,সবদিকে যাবার কী দরকারটা বাপু তোমাদের ?এটা কি অনধিকার হস্তক্ষেপ নয় ???????
বিয়ের পরে কিছুদিন কেটে যাওয়ায় ভাবলাম ,যাক বাবা ,দুধের হাত থেকে মুক্তি এবার ,কিন্ত আমি ভাবি এক ,হয় আর এক ,কপালে দুঃখ ,সরি ,দুধ থাকলে যা হয় আর কি l
"হ্যাঁ রে ,এই কদিন গোলমালে তোর কী খাওয়া হলো না হলো দেখতে পারিনি ,এবার তো বাড়ীটা খালি হয়েছে ,এবার দেখেশুনে খেতে দিতে পারবো "
প্রতি রাত্তিরে এক গ্লাস দুধ !!!!!!খেতে হবে !!!!!!আমার চোখ থেকে প্রায় জল উপচে পড়ে আর কী ,নতুন বৌ ,বেশী কিছু বলতেও পারছি না ,মৃদু সুরে আপত্তি করে কোনো লাভ হলো না ,স্বাভাবিক লজ্জা ভেবে হেসেই উড়িয়ে দিলেন ,আমিও চুপচাপ দুধের গ্লাসটা নিয়ে সা- আ -আ -ব -ধানে ফ্রিজের তাকের পিছনদিকে রেখে দিলাম ,আঃ ,নিশ্চিন্ত ,ওঁর চোখের আড়ালে গ্লাসটা নর্দমায় খালি করে মাজতে দিয়ে দিলেই হবে l
ব্যাপারটা হলো ,পরদিন থেকে অফিস শুরু হয়ে গেলো ,গ্লাসে খালি করা হলো না ,উপরন্ত তিন চারটে গ্লাস জমা হয়ে গেলো ,চিন্তায় চিন্তায় মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় ,
"হ্যাঁ রে চৈতালী ,গ্লাসগুলো কোথায় গেলো বলতো ?খুঁজে পাচ্ছি না ,কেউ নিয়ে নিলো না তো ?"
আর তারপরেই ,আর্ত চিত্কার ,
"এ কী !!ফ্রিজের মধ্যে এতো দুধ কেন ??ইস্ !!মেঝেতে পুরো ভর্তি হয়ে গেলো যে ,তোর আবার কী হলো ?তুই মাথা নিচু করে আছিস কেন ?"
সীতা কী এর চেয়ে করুণ সুরে ডেকেছিলেন ?কী জানি ,তবে আমার ভাগ্য তো অত ভালো নয় ,মাটি ভাগ হলো না ,আর পরবর্তী কয়েক দিন ধরে বাড়ীতে যে হাসির হররা (ছররা নয় তো ?)উঠলো ,তাতে আমাকেও অংশগ্রহণ করতে হলো ........
No comments:
Post a Comment