Saturday, 29 April 2017

"হিমঘর "

                             "১"
     এই সকালের দিকেই ঘুমটা আসে আজকাল ,  কিন্ত বয়েসের সাথে সাথে শরীরে বিনা আমন্ত্রণে আসা অতিথিরা ঘাড় ধরে বিছানা থেকে তুলে দেয় l  এতো গরম পড়েছে এই বছর ,আর সহ্য করা যাচ্ছে না l মায়া কোথায় শুয়েছিল রাত্রে ?  হ্যাঁ ,যা ভেবেছেন তাই ,সেই মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে ,মাথার কাছে ক্লান্ত টেবিল ফ্যান টা ঘুরে চলেছে l নাঃ ,এতো বারণ করা সত্ত্বেও কোনো কথাই শুনবে না ,তারপরে লাগুক ঠান্ডা , ডাক্তারের কাছে দৌড়তে  এই বুড়ো তো আছেই l
        "অ্যাই শুনছ ?উঠে পড় , সকাল হয়ে গেছে তো ,কী হলো ,ওঠো ,মায়া ,মায়া............ !!!!"
     
                               "২"
      মৃদু হাসি ফুটে উঠলো বিমানবাবুর মুখে , আজ তিরিশ বছরের কাছাকাছি দুজনে   একসঙ্গে আছেন  ,মায়াকে তিনি হাতের তালুর মতোন চেনেন l কিছুই না বললেও  সবটাই বোঝেন ,অথচ তাঁর কাছ থেকে  ছেলে আর বৌয়ের দোষ ঢেকে রাখবার এই প্রাণান্তকর প্রয়াস কেন ? প্রভিডেন্ট ফান্ডে খাবল মেরে মেরে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন ছেলেকে , বিয়ের আগেই ,পরে ভালো চাকরী পেয়ে রিম কে নিয়ে চলে যায় , এই বছর দুই হলো কর্মসংকোচন নামক দুর্বৃত্তের আক্রমণে গরীব দেশে ফিরে এসেছে l একটা বিষন্নতার মেঘলা ছায়া সর্বক্ষণ আটকে থাকে পৌষ আর রিমের মুখে l কাকে যে দায়ী করে ওরা ,কে জানে l মায়ার ও খেয়েদেয়ে কাজ নেই ,দিনরাত ওদের মন রাখতে ব্যস্ত , ওরা  যে এতে বিরক্ত হয় ,এটা ও বোঝার ক্ষমতা নেই l
গত সপ্তাহে ই  তো , রিমের ভাই এসেছিলো দমদম থেকে , দিদির সাথে  কথা বলতে ,ছেলেটার বিয়ের কথাবার্তা চলছে l তাদের ব্যক্তিগত কথা থাকতেই পারে , স্বাভাবিক ব্যাপার ,তুমি গেছো ওদের মাঝখানে আদিখ্যেতা দেখাতে ,"ও মা ,টুবলু ,কতোদিন আসোনি ,তা কোথায় ঠিক হলো বিয়ে ? "ঠিকঠাক ঝেড়ে কাসে নি নিশ্চয়ই ভাইবোন ,থমথমে মুখে নীচে এসে বাংলা সিরিয়ালে মুখ গুঁজে বসে পড়েছে মায়া l আবছা বুঝতে পেরে বিমান বাবু ও আর ঘাঁটাননি , অনেকবার বারণ করা সত্বেও এই ভুলগুলো মায়া করবেই ,তারপর মনখারাপ  করে থাকবে l
          অনেকদিন হলো বিমান বাবু মানসিক ভাবে ওদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন নিজেকে , নির্দিষ্ট করে কোনো কারণ ছিলো কী ?কে জানে  l গতবছর এপ্রিল মাসে পৌষ হঠাত্ই এসি বসালো নিজেদের ঘরে , বাড়ীর সবচেয়ে ভালো ঘর ,প্রচুর হাওয়া ওদের ঘরে ,তবুও l বিদেশ থেকে ফিরে আসবার পরে যে ঘরটা ছেড়ে দিয়ে নিজেরা নেমে এসেছিলেন নীচের এই বদ্ধ ঘরটায় ,মায়ার পীড়াপীড়িতে "আহা ,সবে ঠান্ডার দেশ থেকে ফিরেছে ,মনটা ও খারাপ ,ভালো ঘরটায় থাকুক ",এসি লাগানোর সময় কিচ্ছু জানতে পারেননি ,পরে পৌষ এসে মায়ের কাছে বোধহয় কিছু সাফাই গেয়েছিল ,তাতেই মায়া খুশীতে ডগমগ l
         রোদ্দুরে এই পশ্চিম মুখী ঘরটা এতো তেতে থাকে ,নিজেই  সহ্য করতে পারেনা মায়া  ,রাত্তিরে উঠে দুতিন বার গায়ে জল ঢালে , কষ্ট বিমান বাবুর ও হয় ,কিন্ত  বোকা ভালমানুষ স্ত্রী টির  জন্যই বেশী দুঃখ হয় তাঁর , তিনি চলে গেলে কী যে হবে তার ,কে জানে l কয়েকদিন ধরেই ভাবছেন ,যা হয় হবে ,নাহয় আরেকটু কমবে সঞ্চয় ,মাসের শেষে একটু কম টাকা আসবে হাতে ,তবুও যে কটা দিন বেঁচে আছেন তাঁরা ,একটু মসৃণ হোক না চলার পথটা l
     
                               "৩"
        একদৃষ্টে নিজের স্ত্রী এর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বিমান বাবু , কী অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে আছে না মায়ার মুখে ?কেমন জব্দ করে চলে গেলে আমায় ,একটুও তর সইলো না l

"কাকু ,এবার তো কিছু ভাবতে হয় ,অনেকক্ষণ হয়ে গেলো "
      কতো লোক এসেছে তাঁদের বাড়ীতে আজ ,যে লোকজন ভালবাসতো ,সে তো কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না ,আর দেখতে পাবে ও না কোনোদিন l
    "হ্যাঁ বুবলু , কী করতে হবে বলো ?আমি তো ....মানে ....."
  আরো কয়েকজন এগিয়ে আসে ," না না কাকু ,আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না ,আমরা তো আছি ,পৌষদাকে ফোন করা হয়ে গেছে , কাশ্মীরে একটু গন্ডগোল চলছে ,প্লেনের টিকিট পায়নি আজ ,আসতে আসতে কাল বিকেল "
"হ্যাঁ ,জানি ,তাহলে ?"
   "আজকের দিনটা কোথাও রাখতে হবে ,নীলদা সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে "
  "কিন্ত কোথায় রাখবে ?"
  "ও আছে কাকু , কলকাতায় অনেক জায়গা আছে ,ঠান্ডা ঘরে রেখে দেয় ,মানে আজকাল তো অনেকের ছেলেমেয়েই বাইরে থাকে ,যাতে বডি পচে না যায় "
         বিমান বাবু সাগ্রহে বলেন "হ্যাঁ হ্যাঁ ,তাই ভালো ,মানে ওর তো খুব গরম লাগতো ,খুব কষ্ট পেয়েছে ,একটু ঠান্ডায় থাকুক ........"
   বলতে বলতে অনুভব করেন তাঁর হঠাত্ শীত করছে ,প্রবল শীত ,সৃষ্টির আদি যুগের হিমেল প্রবাহ গ্রাস করে নিচ্ছে তাঁকে ......l
        
              --------------:-----------------:--------------

          
          
         
          

Friday, 28 April 2017

একটি কাল্পনিক কথোপকথন


   "আরে আরে !ঝুঁকছে দেখো বুড়ো !বলি ,এই বয়েসে পড়ে গিয়ে  হাড়গোড় ভাঙলে কে দেখবে শুনি ??"
" চুপ চুপ ,নাঃ,তোমার আর কাণ্ডজ্ঞান হলো না ,দেখতে পাচ্ছ না ?"
" কী দেখবো টা কী ?এ ম্যা গো !! লুকিয়ে লুকিয়ে বাচ্চা  বাচ্চা ছেলেমেয়েদের প্রেম দেখা হচ্ছে !!!কী রুচির ছিরি হচ্ছে দিন কে দিন !!!ছি ছি !!"
"আরে বাবা ,ছি ছি পরে কোরো ,আগে দেখো চিনতে পারো কিনা "
"মানে ? কারা ওরা ?চেনা কেউ নাকি ?"
"মাথাটাই  গেছে তোমার গিন্নী , ওই ছেলেমেয়েদুটো চেনা হতে যাবে কেন ?জায়গাটা চিনতে পারছ ?নাকি চোখের মতো মনেও ঠুলি পড়েছে ?"
"কোন জায়গা এটা ? দূর ছাতা ,এই পোড়ার মুখো বৃষ্টির জ্বালায় কি কিছু দেখার উপায় আছে ?তোমার আবার আজ এতো দূরে বেড়াতে আসবার ইচ্ছে হলো কেন কে জানে ,সর্দি কাশি না বাধিয়ে ছাড়বে না দেখছি ,সরে এসো না ,এই পাতাগুলোর আড়ালে বোসো ,"
"আহ্ , বিরক্ত করো কেন ?মনেও পড়ছে না তোমার ?সেই এইরকম বৃষ্টির দিনে ,একটা ছাতার তলায় ভিজতে ভিজতে ........"
"হ্যাঁ ,ভিজতে ভিজতে ......"
"কী বলেছিলে মনেও নেই !!!"
"আহা ,ঢং ,আদিখ্যেতা !মনে থাকবে না কেন ?সেই বলার পরে কতবার যে হাত কামড়েছি ,কেন যে তোমায়  বিয়ে করতে গেলাম "
"তাই নাকি !!!"
"হ্যাঁ ,তাই তো "
"তাই তো এখনো আমার ঘাড়ে চেপে আছো ,এখনো রেহাই দাও নি "
"বয়ে গেছে আমার ,নেহাতই কে তোমায় দেখবে তাই ভেবে আর ......."
"আর মনকে চোখ ঠেরে কী হবে গিন্নী ?"
"যাও ,কী যে বকবক করো না ,মাথা ধরে গেলো "
"রাস্তার আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো , ওদের ভালবাসার রঙে কেমন উজ্বল হয়ে উঠেছে ,যে পথ দিয়ে ওরা যাবে ,এক এক করে আলো জ্বলে উঠবে "
" হ্যাঁ ,বলেছে তোমায় ,কিছুদিন পরেই তো শুরু হবে ঝগড়া ,মারপিট ,হয় তো বা ডিভোর্স ও "
"তা হোক গে ,এই মুহূর্ত টা তো অনেক দামী ওদের কাছে ,দেখছো না ,মরে ভূত হয়ে গিয়েও কবেকার কথা সব মনে পড়ে গেলো ?"
"আর ভিজতে হবে না ,চলো এবার ফিরি ,অনেকদূর চলে এসেছি আজ "
"তাতে কী হলো টা কী ?এই তো হুশ্ করে পৌঁছে যাবো ,আরেকটু দেখি ওদের , "
"থাক থাক ,ভালো থাকুক ,নজর দিও না ,চলো "
"চলো তাহলে ........."

      

"অনুভব "


       
        আমি তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি ,বাবা চলে গেলেন l যাদের বাবা ছোটবেলায় চলে যান ,তারাই বোঝে যে পৃথিবীর রূপ পাল্টে যায় সঙ্গে সঙ্গে ,চেনা মানুষদের অচেনা লাগে l দিনরাত চোখে জল চলে আসত l আমাদের সঙ্গেই কেন এমন হলো !আমার সব বন্ধুদের সৌভাগ্য দেখে বড্ডো মন খারাপ হতো l ওদের সাথে মিশতে আর ইচ্ছে  করতো না .......
              অনেক আত্মীয়স্বজন এসে কয়েক দিন করে আমাদের বাড়ীতে থেকে যাচ্ছিলেন,মা আর আমাদের দুই বোনকে দেখাশোনা করতে ,অনেক অনুশাসন মেনে চলতে হতো তখন ,"সন্ধেবেলা বেরোবি না ,চুল খোলা রাখবি না ,একা একা থাকিস না ,আমাদের কাছে এসে বোস ,খাবি কিছু ?মুখটা শুকনো লাগছে কেন ?"এই সময়ে নাকি আত্মা প্রিয়জনদের  কাছাকাছি ঘুরে বেড়ায় ,তাই সাবধানে থাকতে হয় l  খুব কষ্ট হতো আমার ,বাবা যদি সত্যিই  আসেন ,আমি কেন ভয় পাবো! কেন সাবধানে থাকবো !কতোদিন দেখিনি বাবাকে ,কী করে থাকবো তাঁকে ছাড়া ?সবাই নিশ্চয়ই ভালোর জন্যই বলতেন ,কিন্ত আমি একদম সহ্য করতে পারতাম না কথাগুলো ......
           পারলৌকিক কাজের  জন্য ছাদে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছিল ,সন্ধেবেলা সবার চোখের আড়ালে ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে থেকেছি কতোদিন ,যদি বাবার দেখা পাওয়া যায় ,যদি কেউ বলে ওঠে "কী হলো বাবুন,পড়তে বসবে না ?ফাঁকি দিলে কিন্ত নিজেই ফাঁকিতে পড়বে l "  বারবার মনে মনে ডেকেছি ,ও বাপী ,এসো না একবার ,একটুও কি শুনতে পাচ্ছ না আমার কথা ?দেখতে পাচ্ছ না কেঁদে কেঁদে কেমন চোখ ফুলে গেছে আমার .........?
               বাবার চাকরিটা দেওয়া হলো আমায় ,কিছু কারণে পুরনো পাড়া ছেড়ে আমরা তিনজন  চলে এলাম সল্টলেকে ,রাস্তাঘাট এতোটাই গোলমেলে লাগতো যে ভালো করে চিনতে পারতাম না l অন্ধের মতো এক বাসে করে অফিস আর বাড়ী ,এই ছিলো দৌড় l একদিন বাড়ী ফেরবার সময়ে বাসে ঘুমিয়ে পড়েছি ,হঠাত্ ধড়ফড় করে উঠে দেখি আমাদের স্টপেজ ছাড়িয়ে অনেকটা  চলে এসেছি ,তাড়াতাড়ি নেমে হাঁটা দিলাম বাড়ীর দিকে l রাত প্রায় আটটা বাজে ,অন্ধকার ,রাস্তায় কয়েকটা মাত্র আলো মিটমিট করে জ্বলছে l তখন ওখানে এতো দোকানপাট ছিলো না ,লোকজনও খুব কম দেখা যেত l বুক ঢিপ ঢিপ করছে ,সাহস পেতে ছাতাটা হাতে শক্ত করে ধরে আছি l জোরে হাঁটছি ,হঠাত্ একটা ছেলে সাইকেলে করে পাশ দিয়ে চলে গেলো ,কিছুদূর গিয়ে আবার দেখছি ফিরে আসছে ,এইভাবে দু তিনবার পাশ দিয়ে যাতায়াত করলো ,মনে হছে যেন বৃত্তটা ছোট হয়ে আসছে আস্তে আস্তে ,যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে হেঁটে যাচ্ছি ,আরো কাছে এলেই চিত্কার করতে করতে ছাতা দিয়ে এলোপাথারি পিটুনি লাগাবো ,তারপরে যা হবার হবে ,কেউ কি শুনতে পাবে না ?বাড়ী তখনও অনেকটাই দূর ,ছেলেটা এবার এগিয়ে আসতে গিয়েই পিছন ফিরে জোরে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলো ,মনে হলো যেন কী দেখে খুব ভয় পেয়েছে ,আর এলো না l
              পরদিন অফিসে বাবার এক বন্ধু বললেন "বাবুন একটু শোনো ,কাল কি কিছু হয়েছিল ?কোন ও  বিপদে পড়েছিলে?"আমি হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি "কেন কাকু ?হঠাত্ এই কথা জিজ্ঞেস করছেন যে ?" "কী বলবো তোমায় ,কাল রাত্তিরে ঘুমোচ্ছি ,চিত্তদা যেন ঠেলা দিয়ে তুলে দিলো ,বললো ,আমার বাচ্চা মেয়েদের দায়িত্ব তোমাদের দিয়ে এসেছি ,তোমরা একটু নজর রাখছো না ?ওকে বলবে যেন ফেরার সময়ে ঘুমিয়ে না পড়ে ,বিপদ আসতে কতক্ষণ !
            আমি এতবার ডেকেছি ,বাবা কোনওদিন দেখা দেন নি ,একরাশ অভিমান জমা হয়ে ছিলো মনের মধ্যে ,কাকুর কথা শুনে তা শরত্কালের ঝুরো মেঘের মতন উড়ে গেলো ,অনুভব করলাম বাবা ছেড়ে যাননি আমাদের ,এখনও হয়তো কোনও কারণে মন খারাপ হলে বলে উঠবেন " বাবুন,সবার ভালটা নিতে শেখো ,খারাপটা ভুলে যাও ,দেখবে সুখী হবে ,সেই সুখ কেউ কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না"...............

Saturday, 22 April 2017

বারোমাস্যা

              
বড়ই মুশকিলে পড়েছেন সমীর বাবু ,রক্তে চিনি বেড়েছে ,তাই মিষ্টি খাওয়া বারণ ,গিন্নী সারাদিন গোয়েন্দার মতো নজরে রেখেছেন তাঁকে ,একটুও ফাঁকতালে কিছু মুখে চালান করা যাচ্ছে না .....

          মাত্তোর তো পঞ্চাশটি গ্রীষ্ম ,বর্ষা ,বসন্ত পার করেছেন তিনি ,এরই মধ্যে কোথা থেকে এই বিতিকিচ্ছিরি অসুখ ধরলো তাঁকে কে জানে ,সাদামাটা জীবন কাটান তিনি ,না আছে বিড়ি সিগারেটের নেশা ,না অন্য কিছুর ,খালি একটু খেতে ভালোবাসেন তিনি ,সকালবেলা চার পাঁচটি জিলিপি আর দুশো গ্রাম মাখা সন্দেশ দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারতেন ,আহা ,মাখা সন্দেশ মুখের মধ্যে দিলে কেমন একটা শিরশিরে স্বর্গীয় অনুভূতি হতো ,আবার কবে গিন্নী পারমিশন দেবেন কেউ জানে না ,আর ওই শয়তান ডাক্তারটা  যতো নষ্টের গোড়া ,বলে কিনা "এখন বছর খানেক তেতো খেয়ে কাটান ,আসছে বছর দেখা যাবে "......

   এক বছর !!!!তার মানে বারটা মাস !!!!!তিনশো পঁয়ষট্টি দিন !!!!!ওরে বাবারে ,চোখে অন্ধকার দেখেন তিনি ,গরমকাল আসছে যে ,বাগানের আম আর লিচু গুলো কে খাবে ?বেছে বেছে লাগানো বোম্বাই ,হিমসাগর এইয়া বড় লিচু ,দুধের মধ্যে আম কলা না দিলে মানুষে খায় ?ফজলি আমও চলবে বর্ষাকাল পর্যন্ত ,তার পরেই আসবে তাল ,তালের বড়া ,তালক্ষীর মনে করে শুকনো ঢোঁক গেলেন সমীর বাবু ,একটু ও কি হাতে করে গিন্নী দেবেন না ?এতই কি কঠিন প্রাণ তাঁর ?এতদিন ধরে যে বলে এসেছেন "ওগো ,তুমিই আমার সব "সেই ভালো ভালো কথা কোথায় গেলো !সারাক্ষণ প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে দেখছেন সমীর বাবু বেচাল কিছু করছেন কিনা .......

        হ্যাঁ ,যে কথা হচ্ছিলো ,তালের পরেই হই হই করে পুজো চলে আসবে ,নারকেলের নাড়ু ,কুচো গজা ,ক্ষীরের বরফি ,কতো রকমারি খাবার l "লক্ষী পুজোয় কদমা ,বাতাসা ,চিঁড়ে মুড়ির মোয়া ,মুড়কি ,কতো কী l এই সব খাওয়া যায় বলেই তো তাঁর বিভিন্ন বাড়ীর পুজোয় যেতে ইচ্ছে করে ,সবাই কতো আগ্রহ নিয়ে তাঁকে নেমন্তন্ন করে ,কিন্ত এইবার কী হবে কে জানে ..............

       কালী পুজোর পরে ভাই ফোঁটা ,হুঁ হুঁ বাবা ওইখানে আর গিন্নীর ক্যারদানি  চলবে না ,যা বাঘা বাঘা তিনটি ননদ আছে ,গিন্নী তাঁদের ভয়ে নিজেই তখন জুজু ,আহা ,সেই দিনটার কথা মনে করে এখন থেকেই জিভে জল আসে তাঁর ,আশ মিটিয়ে মিষ্টি খাবেন সেদিন ,না মানে নইলে দিদিরা কষ্ট পাবেন না ?

        আসছে ,ওই আসছে ,আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তার ডাক শোনা যায় "জয় ..ন ..গ ..রের ..মোয়া ..........আ " আহ্ কী অপূর্ব তুলতুলে ক্ষীরের গুঁড়ো ছড়ানো ,ঘিয়ের গন্ধ মাখা ,একবারে  দশ কুড়িটা মেরে দিতে পারেন তিনি ,ওর কমে থামা যায় ও না ,আর নলেন গুড়ের জলভরা তালশাঁষ,অমৃত কুম্ভ ,মাসকাবারি ব্যবস্থা করা ছিলো মিষ্টির দোকানে ,আর কি সেই খাতা ব্যবহার করা হবে ?ছেলে দুটো ও  হয়েছে কুলাঙ্গার ,এসব দেখলে নাকি তাদের গায়ে জ্বর আসে ,তা খা বাবারা ,পিজ্জা খা ,হাউমাউ করে চাউ খা ,এসবের মর্ম তোরা কি বুঝবি !

আরে !বড়দিন এসে পড়লো যে ,কেক ,পেস্ট্রি ,মাফিন ,ম ম  করবে সুগন্ধে ,কল্পনার রাশ ছেড়ে দিয়ে এই গরমে সুখ স্বপ্নে মগ্ন ছিলেম সমীর বাবু ,অন্য জগতের স্বাদ গন্ধে বিভোর হয়ে ,ঘোর ভাঙলো  একটা কর্কশ ঠকাস  শব্দে "হাঁ করে তাকিয়ে কী দেখছো ?এই নাও করলার রস ,খেয়ে আমায় উদ্ধার করো ,গ্যাসে পায়েস বসিয়ে এসেছি ,আজ ছোট খোকার জন্মদিন না ?একটা কথা ও তো মনে রাখতে পারোনা ?"
       
        এট্টু নিশ্চয়ই  ভাগ পাবেন আজ ,আশায় বুক বেঁধে পুরো রসটা গিলে নেন তিনি L

"পরোপকার "

          
       সেই কখন থেকে পিয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বিপুল ,আজই ওদের প্রথম সাক্ষাত ,রবীন্দ্রসদনের সামনে দুরুদুরু বুকে প্রায় আধঘন্টা হতে চললো ,এখনও তাঁর পাত্তা নেই l কে জানে কোনো কাজে ফেঁসে গেলো কিনা ,অথবা সাতশ আশি জন আত্মীয় বাড়ী থেকে কেউ এই রোববারের বিকেলে ওদের বাড়ী বডি ফেললো  কিনা ,কোনো মানে হয় ?আজ  বিপুল নিজেই বিশাল টেনশনে আছে ,কী বলতে কী বলে ফেলবে ,আর পাড়ার সবথেকে সুন্দরীএবং পরোপকারী  মেয়েটা ,যে ওর গুণমুগ্ধ হয়ে আছে ,হাত থেকে ছিটকে যাক আর কি ...........

          আড়চোখে নিজের চেহারার দিকে তাকায় বিপুল ,বহুত দুঃখ ছিলো ,মানে কিছুদিন আগে পর্যন্তও ,এখন আর নেই ,হুঁ হুঁ বাবা ,এই চেহারার জন্যই না আজ ........
      
         টেনেটুনে চার ফুট এগারো ইঞ্চি তে পৌঁছে যখন শরীর জবাব দিলো ,তখন কী করেনি সে ,সাঁতার ,জিম ,দৌড় ,স্কিপিং,আরো কতো কী ,কোনো কিছুই কাজে লাগলো না , দীপু দার পরামর্শে শুরু হলো সাইকেলে দু ঘন্টা এক্সারসাইজ ,পাড়ার এ মাথা থেকে ও মাথা ,আর কিছুদিন পরে লক্ষ্য করলো ,ওকে দেখলেই সবার কেমন বাজার পেয়ে যায়

   "ও বিপুল ,দু আঁটি ধনেপাতা কিনে এনে দিবি ?"
  "বিপুল দা , আজ অঙ্ক পরীক্ষা ,একটা জিওমেট্রি বক্স কিনে আনবে ?"
   "অ্যাই ,তাড়াতাড়ি গরম মশলা র প্যাকেট কিনে আনতো ,মাংস টা নামাতে হবে "

          তখন লম্বা হওয়ায় ব্যস্ত থাকায় এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে কিছুই মনে করতো না বিপুল ,যে যা বলতো এনে দিতো ,ক্রমে কানে এলো পাড়ার ছোটরা ওকে "সাইকেল বিপুল "বলে ডাকছে ,বাড়ী এসে মেপে দেখলো এক চুল ও বাড়েনি উচ্চতা ,সেই যে সাইকেল থেকে নামলো সে ,আর ও পথে পা বাড়ায় নি ,তবে পাড়ায় নতুন আসা পিয়া ,বিপুলের পরোপকারী মানসিকতা দেখেই নাকি ওর প্রেমে পড়েছে ,বিপুল ও পিয়ার সেই ভুল ভাঙায় নি l

    "এই যে বিপুল ,এখানে ঘুরঘুর করছিস কেন রে ?"

       কাঁসার থালা বাসন যেন ঝনঝন করে উঠলো ,মুখ ঘুরিয়ে দেখেই আত্মারাম খাঁচাছাড়া ,ওরে বাবারে !পাড়ার গেজেট মলি পিসি !কার বাড়ীতে কোন বেলা কী রান্না হয় ,ওঁর নখদর্পণে ,বিস্টু র দিদি কেন শ্বশুর বাড়ী যেতে চায় না ,উনি জানেন ,এমনকি ধরকাকুদের অফিসে যে পুলিশি রেড হতে চলেছে ,তা ও ওঁর অজানা নেই ,এই রত্নের খবর এখনও কেন যে গোয়েন্দা সংস্থারা পায় নি ,কে জানে l

  "না ,মানে ......এই আর কী ,একটু বেড়াচ্ছি "
"আর বেড়াতে হবে না ,বাড়ী চল , বেহালার বাস কোথা থেকে পাওয়া যায় কে জানে ,কী হত কুচ্ছিত জায়গা রে বাবা ,সব গুলিয়ে যায় ,চ চ "

          এ কী রে বাবা ! ধমক দিচ্ছে দেখো ,ঠিক যেন লীলা মজুমদারের পদীপিসি ! না না ,মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে ,পিয়া আসবার আগেই এঁকে সরাতে হবে ,নইলে আজ রাত্তিরে র মধ্যেই সবাই জেনে যাবে বিপুল পিয়ার প্রেম কাহিনী ,তারপর দুই বাড়ীর বাবাদের সামনে কে দাঁড়াবে ,অ্যাঁ ?

   "এই তো ,এই বাসটা বেহালা যাবে ,রোখকে ভাই ,রোখকে ,শিগগিরই উঠে পড় মলি পিসি ,ভাই একটু দেখে নামিয়ে দেবেন ,"

  কন্ডাক্টর বোধহয় পুরো কথা শুনতে পায়নি ,নইলে বলে দিতো ওটা উল্টো দিকের বাস l যাকগে ,এখান থেকে সরে তো পড়ুক ,পিয়া কে দেখতে না পেলেই হলো l

          আহা ,কী দারুণ মানিয়েছে নীল টপ আর পিংক জিন্সে  ,সাগ্রহে এগিয়ে যায় বিপুল ,নিজের ভাগ্য যে এতো ভালো ,তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করে নি , বন্ধুগুলোর থোঁতা মুখ ভোঁতা হবে এবার l
 
        চকলেট আইসক্রীম হাতে বিভোর হয়ে হাঁটছিল দুজনে ,রবীন্দ্র সদনের সামনেই ,কোথায় যাওয়া যায় এখনও ঠিক হয় নি l হঠাত্ পিঠে চটাস করে এক থাপ্পড় ,চমকের চোটে ধুলোয় গিয়ে পড়লো  আইসক্রীম ,পিছনে সেই এক এবং অদ্বিতীয় মলি পিসি ,

"শয়তান ,পাজী ,আমাকে উল্টো দিকের বাসে উঠিয়ে দিয়েছিস !কেন রে ?দাঁড়া আজ যাচ্ছি তোর বাড়ীতে ,একটা অবলা বুড়ো মানুষের ওপর একী অত্যাচার ,অ্যাঁ ? কী শরীর খারাপ লাগছে আমার "

  আড়চোখে বিপুল দেখে পিয়ার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে ,রাগে  নিশ্চয়ই ,ওর ওপর কী ?না না ,ও  কী করেছে ?মলি পিসি কে আগে ঠিকঠাক বাসে তুলে দেওয়া যাক  ,তারপর দেখা যাবে l

      "  আন্টি ,চলুন ,আমিও বাড়ী যাবো ,"

এতক্ষণ প্রতিশোধ নেবার নেশায় অন্য দিকে চোখ পরে নি পিসির , "ও মা পিয়া !তুমি এখানে !কোনো কাজে এসেছিলে ?"

"  হ্যাঁ ,তবে কাজটা একটু ভুল হয়ে গেছে ,বাড়ী যাবো এবার ,"

          আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ ই পেলোনা বিপুল ,শুধু ট্যাক্সি টাকে চলে যেতে দেখলো ,বেহালার দিকে l

                 :::; :; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; "