Wednesday, 18 January 2017

"মিশর ভ্রমণ "

পথচলা মানেই আনন্দের ,সে রায়চক  হোক বা রোম , আগ্রা বা  আলেকজান্দ্রিয়া ,বেড়াতে যাওয়ার নামেই বুকের মধ্যে হাজারটা গঙ্গাফড়িং কিছু না ভেবেই, তিড়িং বিড়িং নাচানাচি শুরু করে দেয় l "ওরে শান্ত হ ,সবদিক দেখেশুনে নে "কে শোনে কার কথা ,নাচাই তাদের কাজ ,সামলাতে গিয়ে বকুনি কম খাই না ,যাই হোক ............

       গন্তব্য মিশর ,ছোটবেলায় পড়া "নীলনদের দান"i  কথাবার্তা শুরু হতেই উত্তেজনায় ঘুমের বারোটা বেজে গেলো ,যেটুকু ঘুম হয় ,ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নে ভেসে আসে পিরামিড ,মমি ,সাহারা মরুভূমি ,আর ও কতো কী l রাত তিনটে বেজে পাঁচ ,উড়ে চললাম কলকাতা থেকে কায়রো ,ভায়া দোহা .........
      
           আহা ,কী নীল আকাশ , সুন্দর নীলনদ সেই রঙ ভাগাভাগি করে নিয়েছে ,কারো ভাগে একটুও কম পড়ে নি l হোটেলের বিশাল ছাদে সুইমিংপুল , এলোপাতাড়ি ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে দূরে দেখা গেলো গিজা পিরামিডের হাল্কা ছায়া ,কোথায় কোথায় ???আরে ,তাই তো !সত্যিই মিশরে এলাম তাহলে l সন্ধ্যেবেলায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো ,কে জানতো রাত্তিরে এতো ঠান্ডা পড়ে ?চার পাঁচটা লেয়ারে গরম কাপড় জড়িয়েও ভাড়া করা কম্বলে আপাদমস্তক ঢেকে সেই অপরূপ শো দেখেই দৌড়ে হোটেলে ফিরে মোটা লেপের তলায় l

          সে অপূর্ব সৌন্দর্য্য ভাষায় বর্ণনা করবার সাহস নেই , দুচোখ ভরে শুধু দেখে নিয়েছি  সাহারার  মরীচিকা , সত্যিই যেখানে মায়াবী পুকুরে ভেসে আছে উড়ো ঝুরো বালির পাহাড়ের ছায়া ,পথভোলা কোনো হতভাগা দৌড়ে কাছে গেলেই  নিমেষে উধাও হবে , দেখেছি আবু সিম্বল ,কারনাক ,লাক্সার ,ফিলে মন্দির ,হাজার হাজার বছরের ইতিহাস যেখানে খোদাই হয়ে আছে ,তাদের বিস্মৃতপ্রায় রূপ রঙ ,কাহিনী নিয়ে ,নীলনদের বুকে পালতোলা নৌকায় ভেসে যেতে যেতে মেতে উঠেছি নুভিয়ানদের গানের তালে ,সে  এমনই মোহময় যে আমার মতো মানুষও  হাত পা ছুড়ে নেচে টেচে একাকার ,কেউ হাসলো কিনা পরোয়া নেই , বেলুনে  উড়তে উড়তে পেরিয়ে এসেছি  দুপাশে সবুজ আদর  মাখিয়ে বয়ে চলা নীলনদ , রাজা রাণীর উপত্যকায়  দেখেছি ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তে ..........

          ছোটবেলায় রাজা হয়েছিলেন তুতানখামেন ,মাত্র দশ বছর রাজত্বকালের শেষে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে ,মমি দেখে কী অদ্ভুত এক বিষাদে মনটা ভরে উঠলো ,কায়রো মিউজিয়ামে তাঁর ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেখেও ,কী অন্যরকম ছিলো মিশরীয় সভ্যতার এই মৃত্যুবিলাস ,এই জীবনের চেয়ে মৃত্যুর পরের জীবনকেই বেশী গুরুত্ব দেওয়া .....l

          আর একটা কথা না বললেই নয় , বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা শুনে তাহরীর স্কোয়ার এর সামনে দাঁড়িয়ে একটা গা ছমছমে অনুভূতি হচ্ছিলো ঠিকই ,কিন্ত পরক্ষণেই মনে পড়ে গেলো আরে !ইসমাইল ভাই আছে না ? আমিরা  এবং মেহমুদ ভাই ও ,ওরা কী অপরিসীম যত্নে এই কদিন  আমাদের নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায় ,আগলে রেখেছে প্রাণপণে  ,আরো কতো এই  প্রাচীন  সভ্যতার মানুষ সহাস্যে বলেছে "আপনারা ভারত থেকে এসেছেন না ?আপনাদেরও তো সভ্যতা অনেক প্রাচীন ,"গর্বে বুক ভরে উঠেছে ,নাড়ির টান অনুভব করেছি তাদের সাথে .........

            যদি পারি আবার আসবো , নুভিয়ান মিউজিয়ামে হাঁ করে দেখবো অধুনা লুপ্তপ্রায় শিল্পকলা ,
কোমোম্বো মন্দিরের কারুকাজে আধুনিক ডাক্তারী শাস্ত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ছবি দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবো ,নীলনদের জলের রঙ কেমন পাল্টে যায় আকাশের সুর মিলিয়ে ,দেখবো ,আসবো আবার .........

Sunday, 8 January 2017

দেখা

আশ মেটে না ,চারদিকে তাকিয়ে থাকি ,হাঁ করে l পরিস্থিতির চাপে  স্কুলজীবনের শেষেই  অফিসে  ঢুকে যাওয়ার ফলে মনের বয়েসটা একই জায়গায় আটকে আছে ,আমি না ,ব্ন্ধু /শত্রুরা বলে l প্রথম থেকেই স্টাফ বাসের কল্যাণে নিরুপদ্রব যাওয়া আসা ,কোনোদিন বাস খারাপ হয়ে গেলে অন্যদের সুরে তাল মিলিয়ে মুখে বিরক্তি দেখালেও মন নেচে উঠতো (এখনও  ওঠে) পেখমতোলা ময়ূরের মতো ,আহা কী আনন্দ !বেশ অন্য বাসে বাদুড় ঝোলা  হয়ে যেতে হবে ,তক্ষুনি ভ্যাঁপ  ভোঁ  করে অন্য স্টাফ বাস এসে দয়াপরবশ হয়ে তুলে নিয়ে সসম্মানে অফিস পৌঁছে দিতো ,ভাগ্যিস আমার দাঁত কিড়মিড় কেউ শুনতে পেতো না ,তাহলে গণপিটুনির সম্ভাবনা ছিলো ......
       কতো বছর হয়ে গেলো একই পথে যাতায়াত , তবুও দৃশ্য পাল্টে যায় ,একই রাস্তা প্রতিদিন নতুন লাগে ,মনে হয় আরে !ওই গাছটার পাতাগুলো বেশ অন্য রকম তো !এতদিন চোখে পড়েনি কেন !!রাস্তার পাশের ঝুপড়িতে যারা থাকে ,প্রতিদিন তাদের ঘরবাড়ির চেহারা পালটায় ,হয়তো দড়িতে নীল শাড়ির বদলে গোলাপী ফুল ফুল ছাপ সালোয়ার কামিজের লুটোপুটি ,সামনের বারান্দা নামক উপহাসের জায়গাটুকুর সদ্ব্যবহার করছে দুটো উলুক ঝুলি মিষ্টি মিষ্টি পুঁচকে .......,আরো কতো কী ,হু হু করে সময় কেটে যায় ,বাংলা সাবানের ফেনায় গা না ডুবিয়ে ও l
         আজ হঠাত্ বাসটা দাঁড়িয়ে গেলো ,সামনে চেয়ে দেখি, যে রেললাইনটা আলতো ভাবে শুয়ে থাকে রাস্তার মাঝখানে ,যার জন্য মাঝেমধ্যেই লেটের রক্তচক্ষুর সামনে পড়তে হয় আমাদের ,সেই লাইনে গড়গড়িয়ে চলেছে এক কয়লা বোঝাই মালগাড়ি l ঠিক আছে ,চলুক ,বেশিক্ষণ নয় ,প্রায় পেরিয়েই গেছে ,বেশী অসন্তোষ ধূমায়িত হতে পারলো না বাসের মধ্যে ,কিন্ত কথাটা সেটা নয় ,একদম শেষে গার্ডের কামরায় দেখি সবার নজর এড়িয়ে কেমন করে যেন উঠে পড়েছে একটা বছর সাত আটের বাচ্চা ,কী অবাক কৌতুহলী চোখে চারদিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে সে ,মুখে সব পেয়েছির আদর মাখিয়ে দেওয়া l সেই চোখমুখ সবটাই আমার খুব চেনা , প্রতিমুহূর্তে অনুকূল প্রতিকূল পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে নিতে ,ডানা ঝাপটানো স্মৃতির পাতার গন্ধ শুষে নিয়েও যেন হারিয়ে না যায় তোর ওই চোখদুটো ,খুব দেখ ,দেখে নে সবকিছু ,মনটা যেন সামান্য পেয়েই খুশিতে ছলকে ওঠে ,দেখিস ...........