বয়েস তখন কতো খেয়াল নেই ,শিশু মহলের নিয়মিত শ্রোতা ,সকাল থেকে হাঁ করে রেডিওর সামনে ,রবিবার ,সবার ছুটি , ওটা চালানোই থাকতো , হঠাত্ একদিন কানের মধ্যে ঘা দিলো কেমন যেন মোটা গলায় কেউ একজন গান শেখাচ্ছেন ,এক ছুটে মায়ের কাছে ," আরে ,সুচিত্রা মিত্র গান শেখাচ্ছেন ,চুপটি করে শোন ,যারা শিখছে তারা ও কিন্ত ভালো গায় ,সবাই যাতে শিখতে পারে তাই ইচ্ছে করে ভুল গাইছে মাঝে মাঝে "
ব্যস্ ,আর যায় কোথায় ,শুনে শুনেই শিশু গলায় গান তোলার চেষ্টা ,"কোথা হতে শুনতে যেন পাই" ,"জীবন আমার চলছে যেমন" ," যা পেয়েছি প্রথম দিনে" ..............,l
আমার ছোটমামা সঙ্গীত প্রেমী ,ভাগ্নীর গানের প্রতি আকর্ষণ দেখে মহা খুশী ,মামাবাড়ির পাশের মাঠে ফাংশন ,বেড়াতে গিয়ে মহা বিপত্তি ,"বাবুন ,গান গাইতে হবে ,সবাইকে বলে রেখেছি " আহ্লাদে গদগদ হয়ে তাঁর শেখানো গানই স্টেজে ,"অরূপ তোমার বাণী" ,সবেধন নীলমণি একটা মাত্র আস্ত গান স্টকে , আর কেউ গাইতে বললে আদ্ধেক শেখা গানগুলো গাইতে হতো l
আদ্যন্ত রবীন্দ্র অনুরাগী ছোটমামার দৌলতে গীতবিতানের অনেক গানই পাখির মতো কিচিরমিচির করে গাইতাম ,মানে না বুঝে ,গভীরতা মাপার ইচেছ বা চেষ্টা ,ওই বয়েসে ছিলো না l আমাদের বাড়ীর সামনের বারান্দায় রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পরে গানের আসর বসত ,মামা এলে ,কয়েকটা রাতের কথা মনে আছে ,মামা আর আমার গানের গুরু শ্যামল দা ,(পাশেই থাকতেন ),একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছেন ,মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাবা ,মা বসে ,আর সারাদিনের ক্লান্তি আমার দুচোখে যেন ঘুম হয়ে নেমে আসতো , স্বপ্নের ঘোরে শুনতে পেতাম "কতো অজানারে জানাইলে তুমি " "জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে ".............
কতোবার গেয়ে গেছি কতো গান ,প্রশংসা জুটেছে কপালে ,প্রতিযোগিতায় পুরস্কার ও ,কিন্ত অনুভব করতে পারিনি গানের বাণীর ব্যপ্তি l বাবা চলে যাবার কিছুদিন পরে একদিন মামা এসে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছেন ,"আয় বাবুন,এখানে বোস ,"কয়েকটি গান গাইবার পরে মামা শুরু করলেন "যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে "কেঁপে উঠলাম ,আমার কথাই তো !"সব যে হয়ে গেলো কালো ,নিবে গেলো দীপের আলো ,আকাশ পানে হাত বাড়ালেম ........." দুচোখে ঝাপসা হয়ে এলো চারদিক ,"বন্ধ করো মামা ,আর গেয়ো না এই গানটা ,প্লীজ "অঝোর ধারায় কেঁদে অনুভব করলাম তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন একঘর শূন্যতা আড়াল করে ,সেদিন বুঝলাম আমাদের সব অনুভূতি কেন রবীন্দ্রগানে তার আশ্রয় খুঁজে পায় ...............
Tuesday, 20 December 2016
"রবির আলোয় "
Sunday, 4 December 2016
ছোট্টবেলায়
আমি মাঝেমধ্যেই ধমক খাই "নাঃ,তুমি আর বড় হলে না "....আমার থেকে বয়সে বড় এবং হ্যাঁ ছোটোদের কাছে ও l চাই ও না হতে ,আমি যে চোখ বুজলেই এখনো চলে যাই সেই শিউলি ,বেলফুলের গন্ধ মাখা দিনগুলোতে ,যেখানে আমার জন্য অপেক্ষায় আছে তিনচোখো মাছের দল , নীলচে হলুদ প্রজাপতি ,সবুজ গঙ্গাফড়িং , রাজু ,বুবুন ,লিলি ,মুন্না আর হ্যাঁ ,অবশ্যই টমি ,যাকে নিয়ে প্রায় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের পাড়ায় , অস্ত্র মজুত ,বোমা বর্ষণ ,কান্নাকাটি , কানমলা ,মুচলেকা ........আচ্ছা থাক ,প্রথম থেকেই বলিl
টমিকে কেউ ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিলো পাড়ায় ,কেন কে জানে ,এতো সুন্দর দেখতে ছিলো যে কেউ ভালো না বেসে থাকতে পারবে না l বিভিন্ন দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় আসতো আমার , অন্যের গাছ থেকে কুল ,পেয়ারা চুরি অথবা আমাদের বকুনি দেওয়ার অপরাধে পাশের বাড়ীর বাগানে গরু ঢুকিয়ে ফুলগাছ মুড়িয়ে খাবার সুযোগ করে দেওয়া , এই বিচিত্র প্রতিভার কারণে বন্ধুমহলে একটু প্রভাব প্রতিপত্তি ছিলো আমার ,যদিও স্কুলে আর বাবার কাছে পড়তে বসে এর উল্টো মন্তব্যই শুনতে পেতাম , তা বড় কোনো কাজ করতে গেলে ছোটখাটো ব্যাপারে কান দিলে চলে না l বন্ধুরা আমরা একসাথেই থাকতাম ,পুকুরের শ্যাওলার মতো , ঝগড়ার সময়ে দলাদলি হতো বটে ,কিন্ত কিছুদিন পরে আবার ভাব ,ভাব ,ভাব .........
টমির দখলদারি নিয়ে ঝগড়া অনেকদূর গড়িয়ে ছিলো ,মুখ দেখাদেখি ও বন্ধ ,ও কাদের কাছে থাকবে ,কারা ওকে বেশী ভালোবাসে ,এই সব l টমি আমাদের বাড়ীতে থাকতো ,কারণ আমার বরাদ্দ বকরাক্ষসের পরিমাণের খাবার অনেকটাই খেয়ে নিয়ে আমাকে নিত্যদিনের বকুনির হাত থেকে বাচাঁতো l বিদ্রোহ দেখা দিলো ওকে নিয়েই ,টমি কেন শুধু এখানেই থাকবে l অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম ,আরে বাবা ,ডেভিল তো অরণ্যদেবের সঙ্গেই থাকবে ,তা কে শোনে কার কথা ! পুরো দুটো দলে ভাগ হয়ে গেলাম আমরা ,কথা কাটাকাটি ,মন কষাকষি , উপরন্তু টমিকে নিয়ে আদরের বাড়াবাড়িতে পাড়ার লোকেরা কিছুদিনের জন্য হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো l পাকা কুল , পেয়ারা ,জাম ,আবার দেখা যেতে লাগলো গাছে গাছে l
পড়তে বসে লাল চোখ দেখা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেলো ,সবসময় ওই একটাই চিন্তা ,কোন ফাঁক দিয়ে আর ল .সা .গু , বা সিঁড়ি ভাঙা ঢুকবে ?
দু পক্ষ মিলে মিটিংএ বসার পরে ঠিক হলো যুদ্ধ হবে ,যারা জিতবে ,টমি তাদের কাছেই থাকবে ,অন্যরা কোনো দাবী জানাতে পারবে না l দিন ঠিক হয়ে গেলো ,আমার দলে রাজু ,মিতুল ,বুবুন ,ওদের দলে লিলি ,শুভ ,মুন্না আর পুঁচকে l অস্ত্র যোগাড়ে মন দিলাম সবাই ,মানসম্মান জড়িয়ে আছে যে l
এক দুপুরে শুভক্ষণে যুদ্ধ শুরু হলো ,যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল আধখানা হয়ে পড়ে থাকা একটা বাড়ী ,টুকরো টুকরো বর্গাকার জমি ,কিছুটা উঠে পাঁচিল থেমে গেছে ,আগাছায় ভর্তি , কেউ বিশেষ যেতো না ওইদিকে l অস্ত্র বলতে ঢিল ,পাথরের টুকরো ,ঝাঁটার কাঠি দিয়ে তৈরী করা তির ধনুক ,বোমা ,আরে না না ,চমকে ওঠার কিচ্ছু নেই ,কাগজের মধ্যে কয়েক মুঠো ধূলো ,কাঁকরের টুকরো দিয়ে গার্ডার জড়ানো , এগুলো ফুরিয়ে গেলেও যত্ন করে বাড়ানো হাতের নখ তো আছেই l
প্রথমেই পজিশন নিয়ে নিলাম আমরা , প্রবল পরাক্রমে শুরু হলো যুদ্ধ , দুদিক থেকেই ধেয়ে আসতে শুরু করলো ইঁটের টুকরো ,তির ,বোমার ধোঁয়ায় অন্ধকারে ঢেকে গেলো চেনা মুখগুলো ,আহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো ,কিন্ত কেউ আর পিছু হটে না ,এদিকে অস্ত্রের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে প্রায় ,এবার বোধহয় চুলের মুঠি ধরে টানাটানি আর খিমচে দেওয়ার পালা ,এমন সময়ে ঘটলো সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা ............
এই কদিন টমিকে প্রায় দেখাই যায় নি ,ওকে নিয়ে কাড়াকাড়ি আর সহ্য করতে পারছিলো না হয়তো , কোথায় খাচ্ছিল ,কোথায় থাকছিলো কে জানে ,আমাদের তখন ওইসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় নেই l হঠাৎ দেখি তিনি এসে ব্যাপার স্যাপার দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন ,কী করবেন বুঝতে না পেরে ,হয়তো ওটাই তার অস্থায়ী আস্তানা l আমরা সবাই তখন অল্পবিস্তর রক্তাক্ত , মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে , রাজু গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার ওপর ,ঘাড় ধরে বলতে লাগলো "বল টমি বল ,তুই শুধু আমাদের ,বল ওদের কাছে কক্ষনো যাবি না .........",ওদিক থেকে লিলি ওর লেজের দিক ধরে টানতে লাগলো ..........l তিতিবিরক্ত হয়ে টমি পালাতে গেলো ,না পেরে খ্যাঁক করে রাজুর হাতে কামড়ে দিয়েই লেজ টেজ তুলে সেই যে পালাল , আর কোনোদিন তাকে দেখা যায় নি ..........
এর পরেও আর কথা থাকে ?রাজুর কপালে জুটলো ইঞ্জেকশন আর আমাদের সবার পিঠে পড়লো পাইকারি হারে মার ,এই রকম অসভ্য ছেলেমেয়েদের কেন পাড়া থেকে বার করে দেওয়া হবে না তাই নিয়ে বিশাল মিটিং বসলো ,মুচলেকা দিলাম আমরা যে আর জীবনে মারপিট করবো না ...........
এখনও হয়তো একই রকম আছে আমার সেই রঙিন ছোটবেলা , একই সুরে গান করে দোয়েল ,বুলবুলি
টমি এখনও দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের বাড়ীর পাশে , আমি তো চোখ বুজলেই দেখতে পাই ,এ জীবনে আর বোধহয় আমার বড় হওয়া হলো না l
...........................................................................