Thursday, 19 December 2019

        সন্তুর সান্তাক্লজ
       ------------------------

    গতকাল থেকে বড্ড বিপদে পড়েছে রেখা।কে যে সন্তুর  মাথায়  এইসব  ঢুকিয়েছে কে জানে, ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে। রেখা আর পারে না।সন্তুর বাবা  চলে যাওয়ার পর থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে ছেলেটাকে মানুষ করবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সকালে দুটো  বাড়িতে রান্নার কাজ, ফিরে এসে ছেলেটার  আর নিজের জন্য একটু ভাতে ভাত বসিয়ে দেয়। সাথে থাকে রান্নার বাড়ি থেকে পাওয়া একটু তরকারি টরকারি।মা ছেলের ওতেই হয়ে যায়। টিফিনের জন্য সন্তুর হাতে  চার পাঁচ টাকা দিয়ে দেয় রেখা, একটু মুড়ি কিনে খায় যাতে। তা ছেলে কিছু খেলে তো, ওইটুকু টাকা জমিয়ে জমিয়েই সে শুধুই আঁকার বই কেনে, রঙ পেন্সিল কেনে, স্কুলের সামনের দোকান  থেকে।বাবুর নাকি খিদে পায় না। সন্ধ্যেবেলা রেখা যখন  ফিরে আসে ব্যাগ কারখানা থেকে,পথের পাশের বাজার থেকে কিছুমিছু সবজি কিনে আনে,হাতে টাকা বেশী থাকলে একটু চুনোমাছ বা ডিম।সেই ঝোল দিয়ে একপেট ভাত খায় দুজনে।ততক্ষণ না খেয়েই থাকে।অনেক বকেও ছেলের এই অভ্যাস  ছাড়াতে পারেনি রেখা।
" ও মা, এনে দাও না একটা নতুন মোজা,লাল রঙের "
প্রথমে  প্রায় আকাশ থেকে পড়েছিল রেখা,এই মাসের শেষে মোজা কেনার টাকা কোথায় পাবে?তা ও আবার লাল রঙের!সে তো ছোট্ট বাচ্চারা পরে। তুই কেন পরবি!অবাক হয়ে যায় রেখা।ছেলের এমনিতে বায়না টায়না কম। মায়ের কষ্টটা বোঝে। সেইজন্যই মুখ ফুটে কিছু চাইলে রেখার বড্ড মায়া হয়।আহারে,ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা কত আদর আবদারে বড় হয়, সন্তুর বাবা বেঁচে থাকতে কোনও অভাব ছেলেকে বুঝতেই দেয় নি।কোত্থেকে যে কী হল, অত খাটুনিতেই বুকের দোষ ধরেছিল বোধহয়। একদম শেষ সময়ে ধরা পড়লো। কিছুই করা গেল না। 
" হ্যাঁ রে, সামনের মাসে এনে দেব, মাইনের টাকাটা পেলেই, ঠিক আছে?"
" না মা,এই চব্বিশ তারিখ রাত্তিরেই লাগবে তো, সান্তাক্লজ আসবে না?"
 কেমন করে ছেলেকে বোঝায় রেখা, ওদের কাছে সান্তাক্লজ আসে না। তাদের এই ছোট্ট নোংরা গলিতে সান্তাক্লজের গাড়ি ঢুকবেই না। গতবছর বড়দিনে সেবাবউদির বাড়িতে রান্না করতে গিয়ে রেখা দেখেছিল কত্ত বড় একটা সবুজ পাতাওয়ালা  গাছ,আলো দিয়ে সাজানো। তার ডালপালা থেকে লাল,নীল, সবুজ বাক্স ঝুলে আছে।পাশে সাদা দাড়িওয়ালা একটা খুব সুন্দর দেখতে বুড়োলোক, কেমন মিষ্টি করে হাসছে।ওই নাকি সান্তাক্লজ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য উপহার নিয়ে আসে।কিন্তু তাদের মতো গরীব লোকের ঘরে কেন আসবে সে? তারা কি আলো দিয়ে গাছ আর ঘরবাড়ি সাজাতে পারবে? নাকি রঙিন রঙিন কেক, মিষ্টি  কিনতে পারবে?
" শোন না বাবা, ও হল বড়লোকদের ঠাকুর, আমাদের জন্য নয়।"
" তুমি আনো না, আমি জানি  সান্তাক্লজ আসবে"
" কে বলেছে তোকে এইসব উল্টো পাল্টা কথা? "
" আমি বইতে পড়েছি তো,যারা দুষ্টুমি করে না,মায়ের সব কথা শোনে,ভালো  করে পড়াশোনা করে,তাদের সান্তাক্লজ অনেক কিছু জিনিস দেয়। কোনও বার আমি মোজা টানাই নি,তাই বোধহয় এসে এসে ফিরে গেছে।উঁ উঁ, এনে দাও না মা"
    আজ কুড়ি তারিখ, তার মানে হাতে আছে আর তিন দিন মোটে। সুপর্ণা বৌদিকে বললে কিছু টাকা পাওয়া যায় হয়তো। কিন্তু সামনের মাসে আবার সন্তুর নতুন ক্লাস।কিছু বই তো কিনতেই হবে।এবার ক্লাস ফাইভে উঠবে সন্তু। সামনের বাড়ির পিঙ্কির কাছে একটু পড়তে পাঠাতে হবে,উঁচু ক্লাস তো।সেও আরেকটা খরচের ধাক্কা। আঁকার হাত এত ভালো ছেলের,সেটাই বা শেখায় কেমন করে? ভেবে আর কূল পায়না রেখা।যাই হোক,মুখ ফুটে একটা জিনিস চেয়েছে ছেলে, দেখা যাক পারা যায় কিনা।
  বড়দিনের আগের রাতে খুব মন দিয়ে নতুন লাল টুকটুকে মোজাটা দেওয়ালের হুকে ঝুলিয়ে দিল সন্তু। মুখটা তার কেমন অদ্ভুত চকচকে লাগছে। অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয় রেখা। কাল সকালে উঠে যখন দেখবে ওর মধ্যে কিচ্ছু নেই, খুব কষ্ট পাবে ছেলেটা।তবে  তার আর কী ই বা করার আছে।থাক, একটু ঘা খাওয়া ভালো, তাতে স্বপ্নের রঙিন বেলুনগুলো ফেটে যায়, পড়ে থাকে শুধু সাদাকালো আলো। সেই আলোয় পরিষ্কার দেখা যায় সামনের কঠিন রাস্তাটা।ছেলের পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করে সে। 
   পরেরদিন সকালে রেখা চুপিচুপি চোখটা খুলে রাখে।অন্যদিন যাকে ডেকে ডেকে তুলতে হয়,সে আজ এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে।পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় সন্তু মোজাটার কাছে। কী একটা আশায় রেখাও তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকেই। মোজাটা আস্তে করে নামিয়ে আনে সন্তু, তারপরই চোখ জলে ভরে যায় তার।মায়ের কাছে এসে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে সে।
" সান্তাক্লজ এল না মা,তাহলে বইতে কি মিথ্যে কথা লেখা থাকে?"
" ওরা এখানে আসে না রে, তোকে বলেছিলাম না? মন খারাপ করিস না,চল তোকে আজকে একটা ডিম ভেজে দেবো,বেশী করে লংকা দিয়ে।"
      হটাৎ ঝনঝন করে বাড়ির দরজার কড়াটা  নড়ে ওঠে। এত সকালে আবার কে এল রে বাবা ‌!  দরজা খুলে দিতেই অবাক হয়ে যায় রেখা। ও মা,কতো লোক তাদের বাড়ির সামনে।কী ব্যাপার!  সবার মুখে হাসি দেখে তবু আশ্বস্ত হয় রেখা,যাক  কোনও খারাপ কিছু নয়।আশেপাশের বাড়ির লোকজন একসাথে হইচই করে কিসব বলতে থাকে।কিচ্ছু বোঝা যায় না। পিছন থেকে এগিয়ে আসেন খুব সুন্দর করে শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা। 
" শুনুন, আমরা একটু সন্তুর সাথে দেখা করতে চাই।আমি ওর স্কুলের দিদিমণি। খুব ভালো একটা খবর আছে,ওকে একটু ডেকে দিন না।"
 হাঁ মুখটা বন্ধ করে কোনও মতে ঘরে আসে রেখা।
" ওরে সন্তু ওঠ ওঠ,তোর স্কুলের দিদিমণি এসেছেন রে,শিগগির ওঠ"
" কে এসেছে? সান্তাক্লজ?? "
  তড়বড়িয়ে বাইরে আসে সন্তু,তাকে পেয়ে আনন্দের হুল্লোড় বয়ে যায় সব্বার মধ্যে। দিদিমণি এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখেন তার।
" তুমি আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করেছ।তোমার আঁকা সারা বাংলায় ফার্স্ট  হয়েছে। মনে আছে তোমাদের ক্লাসে আমি আঁকতে বলেছিলাম তোমরা  কেমনভাবে এই পৃথিবীকে দেখতে চাও?  তোমার আঁকা ছবিটা স্কুল সিলেক্ট করেছিল কম্পিটিশনে পাঠানোর জন্য। সেই কম্পিটিশনে বিচারকেরা তোমার ছবিকে ফার্স্ট প্রাইজ দিয়েছেন। সবে গতকাল রাত্রে খবরটা পেয়েছি, তাই ঠিকানা খুঁজে খুঁজে এই এত সকালে এলাম। "
" কী ছবি? কেমন ছবি?আমরা সবাই দেখবো "
   হইহই করে ওঠে সামনের ভীড়টা। দিদিমণি তাঁর ব্যাগ থেকে একটা রোল করা কাগজ খুলে সবার সামনে মেলে ধরেন।
" এই কপিটা আমাদের স্কুলে রাখা ছিল, আপনারা  দেখুন এইটুকু ছেলের কী অসাধারণ ভাবনা। "
   ছবিতে চোখ আটকে যায় সকলের। পৃথিবীর মানচিত্র, কিন্তু সবুজ নীলে নয়, ধুসর কালোয় আঁকা। ধোঁয়া পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে তার মাথার উপরে। কয়েকটা  গাছ আঁকা সেই মানচিত্রে, তাদের মুখ যন্ত্রণায় বিবর্ণ। গাছের গায়ে অজস্র ক্ষতচিহ্ন। ছবিটা এত সুন্দর, মুগ্ধ হয়ে যায় সবাই।
" আরও ভালো খবর আছে সন্তুর জন্য।"
   লজ্জায় মাথা নীচু করে থাকা সন্তুর মাথায় আদর করে দিদিমণি বলেন।
" ওর ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়াশোনার আর আঁকা শেখানোর ভার নিচ্ছে ওই সংস্থা, আর কোনও খরচ ওর লাগবে না।"
  ছেলের সাফল্য এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না রেখার।আনন্দেও তো চোখে জল আসে,ঝাপসা দেখায় সামনেটা।সান্তাক্লজ তাহলে গরীবের ঘরেও আসে,তার কাছে বোধহয় কোনও ভেদাভেদ নেই। কাছে কোথায় যেন পুজোর ঘন্টা বেজে ওঠে। সন্তুর মনে হয় সান্তার  স্লেজগাড়ির ঘন্টাও  হয়তো এমন করেই বাজে, চুপিচুপি এসে যখন ছোট ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে উপহার দিয়ে যায়।   
  




     
  
    

Tuesday, 17 December 2019

আমার এখন দেরী হওয়াই ভালো, 
আবছা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে রোদ---
জলছবিতে মিশিয়ে দেবো আলো, 
বন্ধ হিসেব, নিপাট সমুদ্দুর। 
 
   সঙ্গী থাকুক টুকরো বিকেল স্মৃতি, 
   বিফল হাওয়া ভরিয়ে তুলুক ভোর,
   শব্দহীনের ঝাপসা আঁধার প্রীতি, 
   লাগামছাড়া ছন্দে লাগাক ঘোর।

আমার এখন দেরী হওয়াই ভালো, 
বড্ড কেমন  মনখারাপের সুখ,
অবাক-খুশি একলা আকাশগুলো, 
নিঃস্ব ঠোঁটে বসন্ত্-বাহার সুর।

Thursday, 12 December 2019

জলছবি নীলে মিশে দায়হীন,
লাভক্ষতি বেহিসেবী স্বপ্নের,  
অনেকটা পথ বাঁকে আড়ালে,
ভালোবাসা অভ্যাসে রূপ নেয়।

     কালকে যে কথা রাখা জরুরী, 
     অনেকটা সীমারেখা ছাড়িয়ে, 
     রোদ্দুরে অমিশুক ইচ্ছেরা,
     মুখোমুখি বিষাদের আভাসে।

তুমিও তো কতদিন নাম ভুল, 
চেনা সুর, তাল কাটে যেখানে , 
ছকবাঁধা মুহূর্তে বন্দী, 
ফিরে আসা উন্মুখ দেওয়ালে।








Thursday, 21 November 2019

একটি বিশুদ্ধ গুল্প

        গত পরশু, যাচ্ছিলাম লন্ডনে। রাণী মাসিমণি ডেকে পাঠিয়েছিলেন পরামর্শ করতে।আরে বাবা হ্যাঁ,এলুমাসির কথাই বলছি।অনেককাল আগে থেকেই আমার পরামর্শ ছাড়া এক পাও চলেন না উনি।ছেলেদের বিয়ে,নাতির গার্লফ্রেন্ড, বৌমাদের গাউনের রঙ,নিজের মুকুটে ক'টা মুক্তো,ক'টা পান্না থাকবে,সব এই শর্মা ঠিক করে দেয়।যাই হোক,যে কথা হচ্ছিল, আমার আবার নিজের ঢাক পেটাতে একটুও ভালো লাগে না।বেশ প্লেনের জানলার ধারে বসে ল্যাপটপে কাজ করছি,সামনের সপ্তাহে ট্রাম্প  মেসোমশাই ডেকে পাঠিয়েছেন,মেক্সিকোর দেওয়ালে ক'টা পিলার হবে সেটা হিসেব করে বলে দিতে হবে।এদের জ্বালায় আর পারা যায় না। কয়েকদিন ধরে ফোন করে করে কানের পোকা বার করে দিল। তা সেই ডিজাইন নিয়েই একটু মশগুল হয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ দু'তিনজন এয়ারহোস্টেস এসে মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়াল।

" ও স্যার,একটু উঠুন না প্লিজ,খুব বিপদে পড়েছি"

" আবার কী হল? না না আমি এখন কোত্থাও যেতে পারছি না,অনেক কাজ।"

" ও স্যার, প্লিজ, একটি বার আসতেই হবে। ক্যাপ্টেন বড্ড কান্নাকাটি করছেন,আপনি ছাড়া কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না"

      যদিও কথাবার্তা নীচু স্বরেই হচ্ছিল,তাও কয়েকজন বিপদের আশংকায় আমার হাত পা ধরে টানাটানি শুরু করে দিল।এর পরেও না  উঠলে হয়তো ঘাড়ে করে তুলে ককপিটে নিয়ে যাবে, এই আশংকায় চললাম ওদের সাথে।গিয়ে দেখি সত্যিই মারাত্মক অবস্থা। ক্যাপ্টেন ভ্যাঁ  ভ্যাঁ করে কাঁদছে,সহকারী দু'জন ছলছল চোখে নানারকম সুইচ খটাখট করছে,কিছুতেই প্লেনের মুখ ঘোরাতে পারছে না।ওদিকে র‍্যাডারের গন্ডগোলেই হয়তো, আমাদের প্লেন লন্ডন না গিয়ে  ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে মহাকাশের দিকে।পৃথিবীটা দেখাচ্ছে বেশ চার নম্বরী ফুটবলের মতো। পরিস্থিতি দেখেশুনে আমার বেশ মজাই লাগছিল, এই মওকায় যদি চাঁদের মাটিতে এক চক্কর মেরে আসা যায়, তাহলে মন্দ হয় না। কিন্তু তাহলে এলুমাসি আর ট্রাম্প মেসোমশাইয়ের কী হবে?আমায় ছাড়া ওদের যে এক সেকেন্ড ও চলে না।তাই পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য আমি আমার অল পারপাস ব্যাগটা খুলে বার করলাম ছোট্ট স্ক্রু-ড্রাইভার,আর নিজের তৈরী দিকনির্দেশক ম্যাগনেট। তারপর আর কি, এইসব তো আমার বাঁয়ে হাত কা খেল।পৃথিবীর দিকে প্লেনের মুখ ঘুরিয়ে লন্ডনের রাস্তায় এনে দিয়ে নিজের সিটে চলে এলাম।তখন আমার খাতির দেখে কে,সবাই আমায় নিয়ে কি করবে ঠিক করতে পারছে না। শুনলাম নোবেলের জন্যও আমার নাম পাঠিয়ে দেওয়া হবে।ওইসবে আমার কিস্যু আসে যায় না, খ্যাতি চাইলে এতদিনে অনেক বড় কেউকেটা হয়ে যেতাম।  সিটে এসে যেই বসেছি,দেখি কয়েকটা অ্যালবেট্রস এসে জানলার ধারে ধারে উড়ছে।আসলে বারবার এই পথে যাতায়াত করায় ওরা আমার বন্ধু হয়ে গেছে।জানলাটা একটু খুলে ওদের একটু আদর করে দিলাম,একজন আবার আমার জন্য প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছে।নিয়ে পুঁটলিতে রেখে দিয়ে আবার ল্যাপটপ খুলে বসলাম। বড্ড ঝামেলা বাবা।

Sunday, 10 November 2019

একদিন সব ফেলে... 
রূপকথা হয়ে যাব, 
তোমার শহরে। 
চিনবে না কেউ আর, 
ডাকবে না কোনও নাম ধরে,
একদিন...
অন্ধকার লিখে দেব,
ভুলে থাকা বিমর্ষ  আঁচড়ে।
হয়তো বা ভেজা চোখে,
শিশিরের ঈর্ষণীয় ভুলে,
একদিন...
এখন নদীর বিস্তৃত বুকে,
উদাস কিশোরীর 
যুবতী লাশ ভেসে থাকে। 
চোখ তার ছুঁয়ে গেছে 
কত নিভৃত আদিম অন্ধকার। 
ভেজা ঘাসের উপর 
আলতো পায়ের চিহ্ন,
কবেই মুছে গেছে গভীর অভিমানে। 
শরীর, শুধুই শরীর এখন। 
আকাশের দিকে মনের ওড়াউড়ি, 
ওইটুকুই থাক তার ভিক্ষার সম্বল।

Tuesday, 21 May 2019

"জানিস তোদের মাম্মা আজ কী কান্ড করেছে?"

       এইভাবেই শুরু হয়। তাদের মাম্মা নামক জীবটি যে পৃথিবীতে একপিস মাত্র সৃষ্টি হয়েছিল, তার বিচিত্রকাহিনী শুনে এই কথা মনে হতেই পারে।

"হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা,বলো বলো, আজ আবার কী করলো মাম্মা?"

      শ্রোতা দু'জনেই খুব উৎসাহী, এই সুযোগে পড়া টড়া শিকেয় তুলে রেখে হাসি হাসি মুখে বাবার দিকে একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে বসে।

" আর বলিস না,মাম্মা আজ একজন সুস্থ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, দেখ গিয়ে এতক্ষণে হয়তো বেচারি মারাও গেছেন,চুক চুক,আহারে"।

       দু'জন অ্যাত্ত বড় হাঁ করে আমার দিকে তাকায়,শেষে মানুষ খুন!!!মাম্মার অনেক কীর্তিকাহিনী তাদের জানা আছে,দাঁড় করানো রিক্সার সাথে ধাক্কা খাওয়া, ট্রাফিক পুলিশের বাইকে উঠে জোরে চালানো  বাস তাড়া করে  ড্রাইভারকে ক্ষমা চাওয়ানো,রান্না করতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিন একটা করে কাচের বাসন ভাঙা, ঝগড়া করতে গিয়ে টপিক ভুলে যাওয়া, শুকনো মাটিতে বেশ বিশ্বাসযোগ্য ভাবে আছাড় খাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি অনেককিছুই তাদের হ্যা হ্যা হি হি করার বস্তু,কিন্তু এটা আবার কি!!!

      আমি সবই শুনছি,কিচ্ছু বলছি না।আজ অনেকের কাছে বকুনি টকুনি খেয়ে একটু চুপ করে গেছি,অন্যায় তো হয়েছেই,তবে তাতে আমার কোনও হাত ছিলো না,কিন্তু সত্যিই কি ভদ্রলোক মারা যেতে পারেন? না না, এইসব কি ভাবছি? আসলে সারাদিন কানের কাছে উল্টোপাল্টা কথা শুনে শুনে  মাথায় চিন্তা চলে আসছে।

" আজ চাটার্ড বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি, তোদের মাম্মা হঠাৎ একটা লোকের হাত টেনে ধরে পাঁই পাঁই করে ছুট লাগালো,সে লোকটার যে কি অবস্থা, তোরা ভাবতেই পারবি না"

"অ্যাঁ!!  কেন মা!! কোন লোক!!!কাকে হাত ধরে টেনে ছুটলে!!কোথায় ছুটলে!!"

"মোটেই আমি কারও হাত ধরে ছুটিনি,একজন অন্ধ ভদ্রলোককে রাস্তা পার করাচ্ছিলাম, তখন বাস এসে গিয়েছিলো,তাই একটু তাড়াহুড়ো হয়েছিলো " মুখ গোঁজ করে বললাম আমি।

" ওটাকে রাস্তা পার করানো বলে?টেনশনে আমিই প্রায় মারা যাচ্ছিলাম, চারদিকে গাড়ি হর্ণ বাজিয়ে প্যাঁ প্যাঁ করছে, ঘ্যাঁ অ্যা চ করে থেমে গিয়ে  তিন চারটে  অটো,পাঁচটা বাইক থেকে লোক নেমে তোদের মাম্মাকে প্রায় মারতে যায় আর কি,ওদিকে আমাদের বাস দাঁড়িয়ে ওয়েট করছে,বাসের লোকেরা, রাস্তার লোকেরা সবাই সার্কাস দেখার মুড নিয়ে দৃশ্য উপভোগ করছে,আমার আর মানসম্মান বলে কিছু রইলো না।"

       হয়ত কিছুটা ঠিকঠাক বলছে,কিন্তু আমার পতিদেবতাটির বেশ বাড়িয়ে বলা অভ্যাস। অতটা মোটেই হয়নি। আমাদের বাসস্ট্যান্ডের উল্টোদিকে একটা ফোন বুথ আছে,কয়েকজন দৃষ্টিহীন ভদ্রলোক সেটি চালান।মাঝে মাঝে রাস্তার এদিকে দাঁড়িয়ে তাঁরা রাস্তা পার করে দেওয়ার অনুরোধ করেন,অনেকেই তাঁদের সাহায্য করেন।সেদিন ঘটনাচক্রে কেউই আসছিলেন না, এক ভদ্রলোক অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।এদিকে আমাদের চাটার্ড বাস আসবার সময় হয়ে গেছে,আমি ওঁর হাত ধরে একটু তাড়াহুড়ো করেই প্রথম রাস্তাটা পার করেছি,মাঝখানে পৌঁছতেই সিগন্যাল লাল হয়ে গেল।এদিকে আমাদের বাসের নাক দেখা যাচ্ছে, এসে পড়লো প্রায়,মিস করলে অফিস যেতে মহা মুশকিল, আমি তখন ওই লাল সিগন্যালের মধ্যেই পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ওঁর হাত ধরে টেনে নিয়ে রাস্তা পার করিয়ে দিয়েছি।এইবার আবার নিজে দৌড়ে এইদিকে চলে এসে বাসে উঠে পড়েছি,এ আর এমন কী ব্যাপার, যদিও ফেরবার সময় কয়েকটা বাস, অটো ফটো দাঁড়িয়ে গেছিলো, বিভিন্ন গালাগালিও ভেসে আসছিলো এদিক ওদিক থেকে, কিন্তু তখন তাতে আর কে পাত্তা দেয়।

" ওই ভদ্রলোকের শিওর হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে,অমন হিড়হিড় করে কেউ টেনে নিয়ে যায়? চোখে দেখতে না পেলেও বুঝতে তো পারছিলেন গায়ের কাছে বাস,মিনিবাস এসে দাঁড়িয়েছে,এই ধাক্কা দিলো বলে,তারপরেও কেউ সুস্থ থাকতে পারে?নাঃ,কালকেই একবার খবর নিতে হবে ওই দোকানে গিয়ে যে উনি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা,নইলে তোদের মাম্মাকেই তো আবার অনিচ্ছাকৃত খুনের দায়ে পুলিশ ধরবে।"

       এইসব উল্টোপাল্টা কথার উত্তর দেওয়ার কোনও মানে হয় না,আমিও চুপ করে গেলাম।

       এই ঘটনা ঘটেছে  মাসখানেক আগে,সেই ভদ্রলোককে এর পর আর দেখিনি।ভুলে যেতেই চাইছিলাম, কিন্তু আমায় এরা ভুলতে দিলে তো।প্রায় প্রতিদিনের টপিক হয়ে গেল এটা।

" কি গো,একটুও খবর নিলে না সত্যিই বেঁচে আছেন কিনা,তোমার কি কোনও দায়িত্ববোধ নেই"

" না না বাবা,নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন,কিন্তু মাম্মার ভয়ে রাস্তা পার হওয়া ছেড়ে দিয়েছেন,এইদিকেই কাজ খুঁজে নিয়েছেন। "

" হ্যাঁ রে দাদা,আর রাস্তা পারাপারের ঝুঁকি নেন নি,বলা যায় না,আবার যদি মাম্মা ধরে? অথবা হয়তো চাকরিই ছেড়ে দিয়েছেন, প্রাণের মায়ায়।"

      ওদের এইসব ভুলভাল কথার উত্তর দেওয়ার থেকে আমার মেগাসিরিয়ালই ভালো।

       আজ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি, ক্যাব নিতে হবে,বাস মিস করে গেছি,হঠাৎ দেখি সেই ভদ্রলোক রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।তার মানে বেঁচেই তো আছেন উনি,হার্ট অ্যাটাকে মারাও যান নি আর চাকরিও ছেড়ে দেন নি। আজ তো আর আমার বাস মিস হওয়ার ভয় নেই,ধীরেসুস্থে ওঁকে রাস্তা পার করিয়ে দোকানে পৌঁছে দিয়ে এসেই জোর ধমকের মুখে," তোমার এই পরোপকারের জ্বালায় চোখের সামনে দিয়ে ফাঁকা বাসগুলো বেরিয়ে গেল, এখন নাও, উবের খোঁজো,চাকরি বাকরি আর থাকবে না দেখছি। "

      কে বোঝাবে অফিসটাইমে ফাঁকা বাস বলে কোনও শব্দবন্ধ তৈরীই হয় নি, মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে নেটটা অন করলাম,উবের খুঁজতে হবে তো।