Thursday, 19 December 2019

        সন্তুর সান্তাক্লজ
       ------------------------

    গতকাল থেকে বড্ড বিপদে পড়েছে রেখা।কে যে সন্তুর  মাথায়  এইসব  ঢুকিয়েছে কে জানে, ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে। রেখা আর পারে না।সন্তুর বাবা  চলে যাওয়ার পর থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে ছেলেটাকে মানুষ করবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সকালে দুটো  বাড়িতে রান্নার কাজ, ফিরে এসে ছেলেটার  আর নিজের জন্য একটু ভাতে ভাত বসিয়ে দেয়। সাথে থাকে রান্নার বাড়ি থেকে পাওয়া একটু তরকারি টরকারি।মা ছেলের ওতেই হয়ে যায়। টিফিনের জন্য সন্তুর হাতে  চার পাঁচ টাকা দিয়ে দেয় রেখা, একটু মুড়ি কিনে খায় যাতে। তা ছেলে কিছু খেলে তো, ওইটুকু টাকা জমিয়ে জমিয়েই সে শুধুই আঁকার বই কেনে, রঙ পেন্সিল কেনে, স্কুলের সামনের দোকান  থেকে।বাবুর নাকি খিদে পায় না। সন্ধ্যেবেলা রেখা যখন  ফিরে আসে ব্যাগ কারখানা থেকে,পথের পাশের বাজার থেকে কিছুমিছু সবজি কিনে আনে,হাতে টাকা বেশী থাকলে একটু চুনোমাছ বা ডিম।সেই ঝোল দিয়ে একপেট ভাত খায় দুজনে।ততক্ষণ না খেয়েই থাকে।অনেক বকেও ছেলের এই অভ্যাস  ছাড়াতে পারেনি রেখা।
" ও মা, এনে দাও না একটা নতুন মোজা,লাল রঙের "
প্রথমে  প্রায় আকাশ থেকে পড়েছিল রেখা,এই মাসের শেষে মোজা কেনার টাকা কোথায় পাবে?তা ও আবার লাল রঙের!সে তো ছোট্ট বাচ্চারা পরে। তুই কেন পরবি!অবাক হয়ে যায় রেখা।ছেলের এমনিতে বায়না টায়না কম। মায়ের কষ্টটা বোঝে। সেইজন্যই মুখ ফুটে কিছু চাইলে রেখার বড্ড মায়া হয়।আহারে,ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা কত আদর আবদারে বড় হয়, সন্তুর বাবা বেঁচে থাকতে কোনও অভাব ছেলেকে বুঝতেই দেয় নি।কোত্থেকে যে কী হল, অত খাটুনিতেই বুকের দোষ ধরেছিল বোধহয়। একদম শেষ সময়ে ধরা পড়লো। কিছুই করা গেল না। 
" হ্যাঁ রে, সামনের মাসে এনে দেব, মাইনের টাকাটা পেলেই, ঠিক আছে?"
" না মা,এই চব্বিশ তারিখ রাত্তিরেই লাগবে তো, সান্তাক্লজ আসবে না?"
 কেমন করে ছেলেকে বোঝায় রেখা, ওদের কাছে সান্তাক্লজ আসে না। তাদের এই ছোট্ট নোংরা গলিতে সান্তাক্লজের গাড়ি ঢুকবেই না। গতবছর বড়দিনে সেবাবউদির বাড়িতে রান্না করতে গিয়ে রেখা দেখেছিল কত্ত বড় একটা সবুজ পাতাওয়ালা  গাছ,আলো দিয়ে সাজানো। তার ডালপালা থেকে লাল,নীল, সবুজ বাক্স ঝুলে আছে।পাশে সাদা দাড়িওয়ালা একটা খুব সুন্দর দেখতে বুড়োলোক, কেমন মিষ্টি করে হাসছে।ওই নাকি সান্তাক্লজ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য উপহার নিয়ে আসে।কিন্তু তাদের মতো গরীব লোকের ঘরে কেন আসবে সে? তারা কি আলো দিয়ে গাছ আর ঘরবাড়ি সাজাতে পারবে? নাকি রঙিন রঙিন কেক, মিষ্টি  কিনতে পারবে?
" শোন না বাবা, ও হল বড়লোকদের ঠাকুর, আমাদের জন্য নয়।"
" তুমি আনো না, আমি জানি  সান্তাক্লজ আসবে"
" কে বলেছে তোকে এইসব উল্টো পাল্টা কথা? "
" আমি বইতে পড়েছি তো,যারা দুষ্টুমি করে না,মায়ের সব কথা শোনে,ভালো  করে পড়াশোনা করে,তাদের সান্তাক্লজ অনেক কিছু জিনিস দেয়। কোনও বার আমি মোজা টানাই নি,তাই বোধহয় এসে এসে ফিরে গেছে।উঁ উঁ, এনে দাও না মা"
    আজ কুড়ি তারিখ, তার মানে হাতে আছে আর তিন দিন মোটে। সুপর্ণা বৌদিকে বললে কিছু টাকা পাওয়া যায় হয়তো। কিন্তু সামনের মাসে আবার সন্তুর নতুন ক্লাস।কিছু বই তো কিনতেই হবে।এবার ক্লাস ফাইভে উঠবে সন্তু। সামনের বাড়ির পিঙ্কির কাছে একটু পড়তে পাঠাতে হবে,উঁচু ক্লাস তো।সেও আরেকটা খরচের ধাক্কা। আঁকার হাত এত ভালো ছেলের,সেটাই বা শেখায় কেমন করে? ভেবে আর কূল পায়না রেখা।যাই হোক,মুখ ফুটে একটা জিনিস চেয়েছে ছেলে, দেখা যাক পারা যায় কিনা।
  বড়দিনের আগের রাতে খুব মন দিয়ে নতুন লাল টুকটুকে মোজাটা দেওয়ালের হুকে ঝুলিয়ে দিল সন্তু। মুখটা তার কেমন অদ্ভুত চকচকে লাগছে। অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয় রেখা। কাল সকালে উঠে যখন দেখবে ওর মধ্যে কিচ্ছু নেই, খুব কষ্ট পাবে ছেলেটা।তবে  তার আর কী ই বা করার আছে।থাক, একটু ঘা খাওয়া ভালো, তাতে স্বপ্নের রঙিন বেলুনগুলো ফেটে যায়, পড়ে থাকে শুধু সাদাকালো আলো। সেই আলোয় পরিষ্কার দেখা যায় সামনের কঠিন রাস্তাটা।ছেলের পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করে সে। 
   পরেরদিন সকালে রেখা চুপিচুপি চোখটা খুলে রাখে।অন্যদিন যাকে ডেকে ডেকে তুলতে হয়,সে আজ এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে।পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় সন্তু মোজাটার কাছে। কী একটা আশায় রেখাও তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকেই। মোজাটা আস্তে করে নামিয়ে আনে সন্তু, তারপরই চোখ জলে ভরে যায় তার।মায়ের কাছে এসে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে সে।
" সান্তাক্লজ এল না মা,তাহলে বইতে কি মিথ্যে কথা লেখা থাকে?"
" ওরা এখানে আসে না রে, তোকে বলেছিলাম না? মন খারাপ করিস না,চল তোকে আজকে একটা ডিম ভেজে দেবো,বেশী করে লংকা দিয়ে।"
      হটাৎ ঝনঝন করে বাড়ির দরজার কড়াটা  নড়ে ওঠে। এত সকালে আবার কে এল রে বাবা ‌!  দরজা খুলে দিতেই অবাক হয়ে যায় রেখা। ও মা,কতো লোক তাদের বাড়ির সামনে।কী ব্যাপার!  সবার মুখে হাসি দেখে তবু আশ্বস্ত হয় রেখা,যাক  কোনও খারাপ কিছু নয়।আশেপাশের বাড়ির লোকজন একসাথে হইচই করে কিসব বলতে থাকে।কিচ্ছু বোঝা যায় না। পিছন থেকে এগিয়ে আসেন খুব সুন্দর করে শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা। 
" শুনুন, আমরা একটু সন্তুর সাথে দেখা করতে চাই।আমি ওর স্কুলের দিদিমণি। খুব ভালো একটা খবর আছে,ওকে একটু ডেকে দিন না।"
 হাঁ মুখটা বন্ধ করে কোনও মতে ঘরে আসে রেখা।
" ওরে সন্তু ওঠ ওঠ,তোর স্কুলের দিদিমণি এসেছেন রে,শিগগির ওঠ"
" কে এসেছে? সান্তাক্লজ?? "
  তড়বড়িয়ে বাইরে আসে সন্তু,তাকে পেয়ে আনন্দের হুল্লোড় বয়ে যায় সব্বার মধ্যে। দিদিমণি এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখেন তার।
" তুমি আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করেছ।তোমার আঁকা সারা বাংলায় ফার্স্ট  হয়েছে। মনে আছে তোমাদের ক্লাসে আমি আঁকতে বলেছিলাম তোমরা  কেমনভাবে এই পৃথিবীকে দেখতে চাও?  তোমার আঁকা ছবিটা স্কুল সিলেক্ট করেছিল কম্পিটিশনে পাঠানোর জন্য। সেই কম্পিটিশনে বিচারকেরা তোমার ছবিকে ফার্স্ট প্রাইজ দিয়েছেন। সবে গতকাল রাত্রে খবরটা পেয়েছি, তাই ঠিকানা খুঁজে খুঁজে এই এত সকালে এলাম। "
" কী ছবি? কেমন ছবি?আমরা সবাই দেখবো "
   হইহই করে ওঠে সামনের ভীড়টা। দিদিমণি তাঁর ব্যাগ থেকে একটা রোল করা কাগজ খুলে সবার সামনে মেলে ধরেন।
" এই কপিটা আমাদের স্কুলে রাখা ছিল, আপনারা  দেখুন এইটুকু ছেলের কী অসাধারণ ভাবনা। "
   ছবিতে চোখ আটকে যায় সকলের। পৃথিবীর মানচিত্র, কিন্তু সবুজ নীলে নয়, ধুসর কালোয় আঁকা। ধোঁয়া পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে তার মাথার উপরে। কয়েকটা  গাছ আঁকা সেই মানচিত্রে, তাদের মুখ যন্ত্রণায় বিবর্ণ। গাছের গায়ে অজস্র ক্ষতচিহ্ন। ছবিটা এত সুন্দর, মুগ্ধ হয়ে যায় সবাই।
" আরও ভালো খবর আছে সন্তুর জন্য।"
   লজ্জায় মাথা নীচু করে থাকা সন্তুর মাথায় আদর করে দিদিমণি বলেন।
" ওর ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়াশোনার আর আঁকা শেখানোর ভার নিচ্ছে ওই সংস্থা, আর কোনও খরচ ওর লাগবে না।"
  ছেলের সাফল্য এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না রেখার।আনন্দেও তো চোখে জল আসে,ঝাপসা দেখায় সামনেটা।সান্তাক্লজ তাহলে গরীবের ঘরেও আসে,তার কাছে বোধহয় কোনও ভেদাভেদ নেই। কাছে কোথায় যেন পুজোর ঘন্টা বেজে ওঠে। সন্তুর মনে হয় সান্তার  স্লেজগাড়ির ঘন্টাও  হয়তো এমন করেই বাজে, চুপিচুপি এসে যখন ছোট ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে উপহার দিয়ে যায়।   
  




     
  
    

No comments:

Post a Comment