Sunday, 20 August 2023

আরও কত কিছু কথা বাকি রয়ে গেল
কতটুকু তার বলতে বা পারতাম,
চলে যেতে গিয়ে ফিরে ফিরে আসি যদি
বিষন্ন ফুল স্মৃতিতেই হারাতাম।
আকাশের ডাকে বহমান এক নদী,
শুধু সে জানে না শিকর কখন খোঁজে,
ফেলে আসা পথ, নিশ্চিত গলি ঘুঁজি,
ছিঁড়ে ফেলা, বাসি পথের মায়ার টান।
তবু একদিন প্রতিশ্রুতির ব্যথা,
নীল হয়ে যায় মিথ্যার বেসাতিতে,
বোঝেনি সেও, বোঝেই না কেউ আর,
সংকেতস্থলে কাগজফুলের ঘ্রান।




Sunday, 3 January 2021

জিমি

      পড়তে বসেছে সোনা ,দাদু আর ঠাম্মার  ঘরে। আশপাশ থেকে বিচিত্র  সব  গন্ধ ভেসে আসছে,তার মধ্যে চেনা বলতে মামণির রান্না মাছের ঝোলের গন্ধ,,ঠাম্মার  মুখের পান সুপুরির গন্ধ,  আরও আছে,  ছোটদাদুর একগাদা ওষুধের মেশানো ঝাল ঝাল,টক তেতো গন্ধ। পড়তে বসা না ছাই, বই খুলে সামনে রেখে অনন্ত বকবক করে  যাওয়া   দাদু ঠাম্মার সাথে।  এই ঘরে থাকতে খুব ভালো লাগে সোনার। ঠাকুরের সিংহাসন একধারে, সেখানে বেশ কেমন ঠাকুরের সংসার যেন।সকালে ঠাম্মা ঘন্টা বাজিয়ে তাঁদের ঘুম থেকে তোলে, পুজো করে, তারপর সবাইকে  ছোট ছোট নকুলদানা, বাতাসা, শশার টুকরো প্রসাদ দেয়। সন্ধ্যেবেলা ' গুরুদেব দয়া কর দীনজনে' গাইতে হয়।তখনও একবার প্রসাদ পাওয়া যায় । রাত্তিরে আবার ঠাকুরদের ঘুমনোর জন্য  সামনের পর্দাটা টেনে দেওয়া হয়। বেশ সুখের ব্যাপারস্যাপার কিন্তু,  পড়াশোনা করতে হয় না,  নামতা মুখস্থ করতে হয় না, দুষ্টুমি করার জন্য পা সুড়সুড় করে ওঠে না, তাই কানমলা অথবা থাপ্পড়ের বালাই নেই,  সুন্দর জীবন। 

      জিমি বারান্দায় ঘুরে এসেই সোজা সোনার কোলের কাছে। " আরে জিমি সর সর ,  দেখতে পাচ্ছিস না সোনা পড়ছে? " বেশ করে কোলের কাছে বাগিয়ে নিয়ে আনন্দে জিমির গায়ে হাত বোলায় সোনা। আরেকটু হলেই নামতা মুখস্থ ধরতো দাদু, বাপরে,খুব বাঁচিয়ে দিয়েছে জিমি।খানিকক্ষণ হুড়ুদ্দুমুস করার পরে খাবার ডাক পড়ে, নরম নরম রুটি, ঝাল ছাড়া মাছের ঝোল  আর মৌরী দেওয়া সুজি।খেতে বসে বাপী বলে," নাহ্, সোনাটার আর পড়াশোনা হলো না। ওই জিমির সাথেই  কাল থেকে ওকে মাঠে পাঠিয়ে দিও তো, লোকজনের বাড়ি চিনে টিনে রাখুক, সবজির  ব্যবসা করেই খাবে নাহয়। " নিজের নাম শুনে দুধরুটি খেতে খেতে আহ্লাদে ভুক ভুক শব্দ করে জিমি, আর রাগে অপমানে লাল হয়ে রুটির টুকরো কুচিকুচি করে ছিঁড়তে থাকে সোনা।                                

         জিমিটা যেন কেমন একটা। সারাদিন সব ঘরে ঘুরঘুর করে বেড়ায়, কিন্তু রাত্তিরে ঠিক ঠাম্মার ঘরে ওকে  শুতেই হবে। আদুরে ভোঁদড় একটা।     ঠাম্মার খাটের পাশে ওর জন্য নরম নরম বিছানা করে দেওয়া হয়। খুব হিংসে হয় সোনার। ও ঠাম্মার   ঘরে শুতে চাইলে কেউ রাজী হয় না। " না না ,  ও ঘরে সারারাত জানলা খোলা থাকে, ঠান্ডা লেগে যাবে , চুপচাপ এখানে শুয়ে পড়ো। " অবাধ্য চোখের জলকে  ফেরত পাঠিয়ে বোনুর পাশে শুয়ে পরের দিনের জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে সোনা। সরিতাকে অনেক  কষ্টে রাজী করানো হয়েছে, কাল ওর মায়ের আমসত্ত্বের বোতল থেকে কিছুটা নিয়ে আসবে।  বুবুল আজ চোরের দানটা দেয় নি, কাল দেওয়াতেই হবে। আর  সামনেই   দোল আসছে, আগেরবার রন্টু  সোনাকে পুরো  ভূত বানিয়েছিল, এবার তার প্রতিশোধ নিতেই হবে। আচ্ছা, এবার যদি রঙের পিচকিরির  মধ্যে  কুটুস কামড়ানো লাল পিঁপড়ে ভরে ছাড়া যায়?  বেশ হবে, যখন তখন সোনার মাথায় চাঁটি মারা বেরিয়ে যাবে তাহলে। কিন্তু পিঁপড়ে ভরবে কে?  মিঠুকে রাজি করানো যাবে?  উঁহু, মনে হয় না, অন্য উপায় ভাবতে হবে। 

" সোনা, ঘুমোও নি তো, ঘুম আসছে না? " 

    বাপীর মিষ্টি গলা  ভেসে এল,  সাড়া দিলেই বিপদ, এক্ষুণি ট্রান্সলেশন ধরবে। চোখ বুজে ঘুমের ভানে অসাড়ে পড়ে থাকে সোনা। এইভাবেই কখন যেন ঘুম এসে যায়। কতদিন ভেবেছে জেগে থেকে দেখবে কেমন করে ঘুম এসে চোখের পাতায় জড়িয়ে ধরে, সেটা আর দেখা হয় না। সকালে উঠে নিজের উপর বড্ডই রাগ হয় তার । কেমন করে যেন স্বপ্নের মধ্যে  কত সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরে আসে,  কেমন একটা আবছা কষ্ট মেশানো আনন্দ মনে ভেসে থাকে  , ঘুম ভাঙার পরেও।   

         নতুন ক্লাসে উঠে গেল সোনা, বাপরে কত্ত বই!! ক্লাস টু হয়ে গেল এবার তার।  বাপী বলেছে  শুধুই খেলাধুলো করলে এবার আর পরের ক্লাসে উঠতে পারবে না সে। এখন থেকে খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।  ভালো রেজাল্ট না করলে নাকি কোনও বন্ধুই ওর সাথে কথা বলবে না। সামনের মাঠে বিকেলে শুধু একঘন্টা খেলতে যেতে পারে, দেরি হলেই  কাকামণি গিয়ে নিয়ে আসবে।জিমিকে বেশী চটকানো যাবে না,  গল্পের বই তাও দিনে এক ঘন্টার বেশী নয়।  এবার রেজাল্ট এর সময়   বাপীকে  স্কুলের দিদিমণি বলেছেন সোনার লেখাপড়ায় একটু নজর রাখতে, একটুও পড়া করেনা সে।খুব রাগী গলায় খারাপ খারাপ সব নিয়মকানুন চালু করে দিল বাপী। জিমি পাশে বসে ওর গায়ে গা ঘষবার, আদর খাওয়ার চেষ্টা করছিল, ওর জন্য সোনা আরও  বকুনি খেয়ে গেল।  

       সারাদিন মন খারাপ থাকে সোনার। বাড়ির সবাই যেন পুলিশকাকুদের মতো হয়ে গেছে, সবসময়ই সোনার উপর নজরদারি।  বাপী মামণি তো অফিসে যায়,  সোনা যদি একটু দেবরত্নাদের বাড়ি যায়,  তারা কি জানতে পারবে?  কে শোনে কার কথা, " না সোনা তুমি একদম পাড়া বেড়াবে না,  বাপী মামণি জানতে পারলে খুব রেগে যাবে কিন্তু।" দূর ছাতা,  ওদের তিনতলার ফ্ল্যাটের  বারান্দায় গিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আরও কষ্ট হয় , কী সুন্দর খেলে বন্ধুরা সবাই,  সরিতা,  দেবরত্না, রূপক, আর সোনার শুধু দিনে ঘড়ি ধরে এক ঘন্টাই বরাদ্দ।  নিজেকে কেমন জিমির মতো বন্দী মনে হয় ওর,  বাড়ির মধ্যে ছাড়া থাকলেও পার্কে এলে জিমিকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, সোনারও  প্রায় একই অবস্থা।    

              সেদিন  জিমি সন্ধ্যে  থেকেই কেমন যেন ছটফট করছিল। ও সাধারণত খুব শান্ত কুকুর,  অ্যালসেশিয়ান প্রজাতির কুকুররা খুব বাধ্য হয়, প্রভুভক্ত হয়। তাই জিমির হাবভাব দেখে বাড়ির সবাই খুব চিন্তা করছিল। কাকামণির সাথে মাঠে বেড়াতে যায় ,  সেদিন কিছুতেই গেল না। দাদু এসে চেষ্টা করল, তাও গেল না।  সোনার দু'দিন ধরে জ্বর,  ওকে নিয়ে বাড়ির সবার  ব্যস্ততা আছে বলে বেশী  ঘাঁটাঘাঁটি আর করা হলোনা। বাপীর আবার রাত্রে ট্রেন, অফিস ট্যুরে সাতদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে বাপী। জ্বরের মধ্যে মনখারাপটাও বাড়ছিল সোনার, বাপীর সাথে কতদিন দেখা হবে না, কত সুন্দর গল্প  বলে বাপী,  সোনা তাড়াতাড়ি হোমওয়ার্ক করে নিলে। তবে এমনিতে  একটু শরীর খারাপ হলে সোনার  মজাই  হয়,  বকুনি টকুনির   হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আর কত আদর, কত মাথায় গায়ে হাত বুলনো। 

 "সোনা,  কি খেতে ইচ্ছে করছে বল তো,  চিপ্স খাবি?  সন্দেশ খাবি?  চকলেট?  "

 " সোনা গল্প পড়ে শোনাবো? সুকুমার রায় শুনবি?"

          বাপীর সব গোছগাছ কম্পলিট,  ওষুধ  খেয়ে   জ্বরটা একটু কমেছে সোনার, বাপী এসে মাথার কাছে বসলো। 

" লক্ষ্মী হয়ে থাকবে বুঝলে?  একদম দুষ্টুমি করবে না।  আমি এসে নতুন বইগুলো সব মলাট দিয়ে দেবো। "

       জিমি এতক্ষণ সারা ঘরে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছিল,  অস্থির ভাবে। মাঝে মাঝেই দরজার কাছে গিয়ে গরর গর আওয়াজ করছিল। ঠাম্মা বললো ও নির্ঘাত পাশের ফ্ল্যাটের রমাকাকিমাদের   বিড়াল  মানে  ভুট্টাকে ধমকাচ্ছে,  দুই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যেই ঝগড়া করে দু'টোতে।  দাদু  চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লো, কে জানে এইরকম কেন করছে ও। বাপী স্যুটকেস নিয়ে ঠাকুর প্রণাম করে দরজার দিকে  যেই এগোতে যাবে , লাফ দিয়ে এসে বাপীর কাঁধে দুটো পা তুলে দিল জিমি। কিছুতেই যেতে দেবে না বাপীকে। সবাই হাঁ হয়ে গেছে,  এ আবার কেমন অসভ্যতা!  ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে সোনা,

 " ও ঠাম্মা, জিমি পাগল হয়ে গেছে, এবার আমাদের সবাইকে কামড়ে দেবে। "

" আহ্, চুপ কর না সোনা, এ আবার কী বিপদ হল?  অ্যাই জিমি ছাড় বলছি, নইলে মারব কিন্তু এইবার। "

     কিছুতেই বাপীকে ছাড়ছে না জিমি, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে আছে জামার কলার। সবাই এসে চেষ্টা করছে, কাকামণি তো গিয়ে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় মেরেই দিল। বাপী  এরপর  ট্রেন পাবে না। কেমন করে যাবে ডিউটিতে?  আচ্ছা জিমির চোখে জল কেন?  সোনারই চোখে পড়ে ব্যাপারটা।  

" ও ঠাম্মা, জিমি কাঁদছে দেখো, ওর বোধহয় খুব অসুখ করেছে, ও বাপী ডাক্তারকাকুকে ডেকে আনো শিগগিরই। "

" না না, অন্য কিছু, হয়তো  এমন কোনও বিপদ আসতে চলেছে যেটা শুধু জিমিই বুঝেছে।"

 চিন্তিতমুখে বলে দাদু। কিন্তু আর তো সময় দেওয়া যায় না, ট্রেনের ব্যাপার, সে বাপীর জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। কাকামণি জোর করে জিমিকে টেনে ধরে, দাদু ঠাম্মাও হাত লাগায়। মামণি ঘর থেকে আরেকটা জামা এনে বাপীর হাতে দিয়ে দেয়, স্টেশনে চেঞ্জ করে নেওয়ার জন্য, এটা একদম ছিঁড়ে গেছে। প্রবল চিৎকার করে যেতে থাকে জিমি, ওদিকে ভয় পেয়ে বোনুর কান্না, সে এক মারাত্মক অবস্থা। বাপীকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই সবার হাত ছাড়িয়ে জিমি এক দৌড় দেয়। পিছনে সবাই বেরিয়ে আসে, ওকে ধরা তখন  সত্যি  অসম্ভব।  এত  শব্দে তখন প্রায় সব ফ্ল্যাটেরই দরজা খুলে গেছে। বেরিয়ে আসছে মিত্রকাকু, গোমসকাকু, রমাকাকিমা, দিপুদাদা, আবদুলকাকুরা।এবার বাপীর পিছনে জিমি, তার পিছনে অন্য সবাই।   সিঁড়ির নিচে যেখানে মিটারগুলো লাগানো থাকে,   সেখানে এসে হঠাৎ  লাফ দিয়ে কাকে যেন কামড়ে ধরলো। কারা বসে ওখানে!! মিশিরজিই বা কোথায় গেল!! খুব চিৎকার করে লোকটা একটা কী যেন বসিয়ে দিল জিমির গায়ে, কোনও পাত্তাই দিলো না সে। আঁচড়ে কামড়ে অন্য লোকগুলোরও অবস্থা খারাপ করে তুললো। এত গোলমাল শুনে  চারপাশের    ফ্ল্যাটগুলো থেকেও অনেকে বেরিয়ে এসেছে। চলে এসেছে  সি ফাইভের দারোগাজেঠু, এ ফোরের বডি বিল্ডার দাদা।  সবাই মিলে   ধরে ফেলে ডাকাতির উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া চারটে লোককে। যারা মিশিরজিকে হাত, পা, মুখ বেঁধে  ফেলে রেখেছিল  সিঁড়ির তলায়।   

               অনেক চেষ্টা করেও  জিমিকে বাঁচানো যায় নি। ছুরির আঘাতে অনেক রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল তার।  এখন তার দুটো ছবি  আছে  দুই ঘরে।   ঠাম্মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সেই ঘটনার পরে,   এখন টুকটুক করে কিছু কাজকর্ম করে। সন্ধ্যেবেলা জিমির ছবির সামনেও প্রদীপ দেখায়  ঠাম্মা,  অনেক সময় ধরে। সোনা তখন দাঁড়িয়ে থাকে পাশে, মনে হয় জিমি হাসছে ওদের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু চোখের কোণায় একটু জলও যেন চিকচিক করছে। এদিকসেদিক তাকিয়ে নিজের চোখের জলটুকু মুছে নেয় সোনা।                                                                                                                      

         

                                          


             

 

 

                                                        
 


                                                                                    


                                                                                                


Monday, 14 September 2020

আস্তিনে সাজিয়ে রাখি ঘুমের ওষুধ

বেঁটে তেপায়া টুল, মোমদড়ি,

ইশারায় মুচকি হাসা ব্লেডের বান্ডিল।

আকাশ ছুঁতে চাওয়া হাইরাইজের ফাঁকফোকড়গুলো,

হাতছানি দেয় রোজ।

নদীর জল তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে

ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে আমি,

উচ্চতা মাপি বারবার,

জীবনের সাথে মৃত্যুর দূরত্ব মাপি।

অনেক পথ, নানারকম।

একটা শুধু বেছে নেওয়ার অপেক্ষা।

তবু জীবনের শখ, অনেক রঙ দেখা বাকি থাকাটুকু,

আকাশ খোঁজে, সুখ হাতড়ায়,

দড়ির ভাঁজে ভাঁজে ধুলো জমে ওঠে,

ব্লেডের মসৃন ধার ফিকে হয়ে যায়।

আবার নতুন কোনও আঘাত আসবে বলে,

থেমে থাকি বোবা অপেক্ষায়।







Thursday, 16 April 2020

ধাত্রী


  
অনেক বসন্তদিন পেরিয়ে 
কবে কোথাও  একটুকরো ফুল
 ফুটিয়ে দেবে কি তুমি ? 
অন্ধকারে   বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেলে
যত  তীক্ষ্ণ চাওয়া পাওয়া, বিষাক্ত নির্মাণ, 
পচে যাওয়া সমাজের নিরর্থক আবরণ,
হিংস্র আগ্রাসনের যত অভিযোগ,
একদিন মূল্যহীন হবে---।

তুমি আবার  কুমারী হবে  কোনও এক দিন, 
ধ্বংসের  নৃশংস  সোপান  পেরিয়ে এসে , 
রজনীগন্ধার  আলো গায়ে মাখবে অক্লেশে ।
তীব্র শব্দহীন সেই অপাপবিদ্ধ পরিবেশে, 
ভুল করে যদি তোমায় আবার  কেউ 
 প্রেমহীন  সমর্পণে বাঁধে,
তোমার আস্তিনে যত্ন করে রেখে দিও 
প্রতিশোধের তীব্র বিষমাখা তির,
আবার আঘাত হেনো, বারবার,  
কত আর  ধর্ষিতা হবে তুমি?
শরীরে কত সয় আর, 
এই  সৃষ্টি ধ্বংসাত্মক  ব্যভিচার?

Thursday, 19 December 2019

        সন্তুর সান্তাক্লজ
       ------------------------

    গতকাল থেকে বড্ড বিপদে পড়েছে রেখা।কে যে সন্তুর  মাথায়  এইসব  ঢুকিয়েছে কে জানে, ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে। রেখা আর পারে না।সন্তুর বাবা  চলে যাওয়ার পর থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে ছেলেটাকে মানুষ করবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সকালে দুটো  বাড়িতে রান্নার কাজ, ফিরে এসে ছেলেটার  আর নিজের জন্য একটু ভাতে ভাত বসিয়ে দেয়। সাথে থাকে রান্নার বাড়ি থেকে পাওয়া একটু তরকারি টরকারি।মা ছেলের ওতেই হয়ে যায়। টিফিনের জন্য সন্তুর হাতে  চার পাঁচ টাকা দিয়ে দেয় রেখা, একটু মুড়ি কিনে খায় যাতে। তা ছেলে কিছু খেলে তো, ওইটুকু টাকা জমিয়ে জমিয়েই সে শুধুই আঁকার বই কেনে, রঙ পেন্সিল কেনে, স্কুলের সামনের দোকান  থেকে।বাবুর নাকি খিদে পায় না। সন্ধ্যেবেলা রেখা যখন  ফিরে আসে ব্যাগ কারখানা থেকে,পথের পাশের বাজার থেকে কিছুমিছু সবজি কিনে আনে,হাতে টাকা বেশী থাকলে একটু চুনোমাছ বা ডিম।সেই ঝোল দিয়ে একপেট ভাত খায় দুজনে।ততক্ষণ না খেয়েই থাকে।অনেক বকেও ছেলের এই অভ্যাস  ছাড়াতে পারেনি রেখা।
" ও মা, এনে দাও না একটা নতুন মোজা,লাল রঙের "
প্রথমে  প্রায় আকাশ থেকে পড়েছিল রেখা,এই মাসের শেষে মোজা কেনার টাকা কোথায় পাবে?তা ও আবার লাল রঙের!সে তো ছোট্ট বাচ্চারা পরে। তুই কেন পরবি!অবাক হয়ে যায় রেখা।ছেলের এমনিতে বায়না টায়না কম। মায়ের কষ্টটা বোঝে। সেইজন্যই মুখ ফুটে কিছু চাইলে রেখার বড্ড মায়া হয়।আহারে,ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা কত আদর আবদারে বড় হয়, সন্তুর বাবা বেঁচে থাকতে কোনও অভাব ছেলেকে বুঝতেই দেয় নি।কোত্থেকে যে কী হল, অত খাটুনিতেই বুকের দোষ ধরেছিল বোধহয়। একদম শেষ সময়ে ধরা পড়লো। কিছুই করা গেল না। 
" হ্যাঁ রে, সামনের মাসে এনে দেব, মাইনের টাকাটা পেলেই, ঠিক আছে?"
" না মা,এই চব্বিশ তারিখ রাত্তিরেই লাগবে তো, সান্তাক্লজ আসবে না?"
 কেমন করে ছেলেকে বোঝায় রেখা, ওদের কাছে সান্তাক্লজ আসে না। তাদের এই ছোট্ট নোংরা গলিতে সান্তাক্লজের গাড়ি ঢুকবেই না। গতবছর বড়দিনে সেবাবউদির বাড়িতে রান্না করতে গিয়ে রেখা দেখেছিল কত্ত বড় একটা সবুজ পাতাওয়ালা  গাছ,আলো দিয়ে সাজানো। তার ডালপালা থেকে লাল,নীল, সবুজ বাক্স ঝুলে আছে।পাশে সাদা দাড়িওয়ালা একটা খুব সুন্দর দেখতে বুড়োলোক, কেমন মিষ্টি করে হাসছে।ওই নাকি সান্তাক্লজ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য উপহার নিয়ে আসে।কিন্তু তাদের মতো গরীব লোকের ঘরে কেন আসবে সে? তারা কি আলো দিয়ে গাছ আর ঘরবাড়ি সাজাতে পারবে? নাকি রঙিন রঙিন কেক, মিষ্টি  কিনতে পারবে?
" শোন না বাবা, ও হল বড়লোকদের ঠাকুর, আমাদের জন্য নয়।"
" তুমি আনো না, আমি জানি  সান্তাক্লজ আসবে"
" কে বলেছে তোকে এইসব উল্টো পাল্টা কথা? "
" আমি বইতে পড়েছি তো,যারা দুষ্টুমি করে না,মায়ের সব কথা শোনে,ভালো  করে পড়াশোনা করে,তাদের সান্তাক্লজ অনেক কিছু জিনিস দেয়। কোনও বার আমি মোজা টানাই নি,তাই বোধহয় এসে এসে ফিরে গেছে।উঁ উঁ, এনে দাও না মা"
    আজ কুড়ি তারিখ, তার মানে হাতে আছে আর তিন দিন মোটে। সুপর্ণা বৌদিকে বললে কিছু টাকা পাওয়া যায় হয়তো। কিন্তু সামনের মাসে আবার সন্তুর নতুন ক্লাস।কিছু বই তো কিনতেই হবে।এবার ক্লাস ফাইভে উঠবে সন্তু। সামনের বাড়ির পিঙ্কির কাছে একটু পড়তে পাঠাতে হবে,উঁচু ক্লাস তো।সেও আরেকটা খরচের ধাক্কা। আঁকার হাত এত ভালো ছেলের,সেটাই বা শেখায় কেমন করে? ভেবে আর কূল পায়না রেখা।যাই হোক,মুখ ফুটে একটা জিনিস চেয়েছে ছেলে, দেখা যাক পারা যায় কিনা।
  বড়দিনের আগের রাতে খুব মন দিয়ে নতুন লাল টুকটুকে মোজাটা দেওয়ালের হুকে ঝুলিয়ে দিল সন্তু। মুখটা তার কেমন অদ্ভুত চকচকে লাগছে। অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয় রেখা। কাল সকালে উঠে যখন দেখবে ওর মধ্যে কিচ্ছু নেই, খুব কষ্ট পাবে ছেলেটা।তবে  তার আর কী ই বা করার আছে।থাক, একটু ঘা খাওয়া ভালো, তাতে স্বপ্নের রঙিন বেলুনগুলো ফেটে যায়, পড়ে থাকে শুধু সাদাকালো আলো। সেই আলোয় পরিষ্কার দেখা যায় সামনের কঠিন রাস্তাটা।ছেলের পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করে সে। 
   পরেরদিন সকালে রেখা চুপিচুপি চোখটা খুলে রাখে।অন্যদিন যাকে ডেকে ডেকে তুলতে হয়,সে আজ এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে।পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় সন্তু মোজাটার কাছে। কী একটা আশায় রেখাও তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকেই। মোজাটা আস্তে করে নামিয়ে আনে সন্তু, তারপরই চোখ জলে ভরে যায় তার।মায়ের কাছে এসে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে সে।
" সান্তাক্লজ এল না মা,তাহলে বইতে কি মিথ্যে কথা লেখা থাকে?"
" ওরা এখানে আসে না রে, তোকে বলেছিলাম না? মন খারাপ করিস না,চল তোকে আজকে একটা ডিম ভেজে দেবো,বেশী করে লংকা দিয়ে।"
      হটাৎ ঝনঝন করে বাড়ির দরজার কড়াটা  নড়ে ওঠে। এত সকালে আবার কে এল রে বাবা ‌!  দরজা খুলে দিতেই অবাক হয়ে যায় রেখা। ও মা,কতো লোক তাদের বাড়ির সামনে।কী ব্যাপার!  সবার মুখে হাসি দেখে তবু আশ্বস্ত হয় রেখা,যাক  কোনও খারাপ কিছু নয়।আশেপাশের বাড়ির লোকজন একসাথে হইচই করে কিসব বলতে থাকে।কিচ্ছু বোঝা যায় না। পিছন থেকে এগিয়ে আসেন খুব সুন্দর করে শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা। 
" শুনুন, আমরা একটু সন্তুর সাথে দেখা করতে চাই।আমি ওর স্কুলের দিদিমণি। খুব ভালো একটা খবর আছে,ওকে একটু ডেকে দিন না।"
 হাঁ মুখটা বন্ধ করে কোনও মতে ঘরে আসে রেখা।
" ওরে সন্তু ওঠ ওঠ,তোর স্কুলের দিদিমণি এসেছেন রে,শিগগির ওঠ"
" কে এসেছে? সান্তাক্লজ?? "
  তড়বড়িয়ে বাইরে আসে সন্তু,তাকে পেয়ে আনন্দের হুল্লোড় বয়ে যায় সব্বার মধ্যে। দিদিমণি এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখেন তার।
" তুমি আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করেছ।তোমার আঁকা সারা বাংলায় ফার্স্ট  হয়েছে। মনে আছে তোমাদের ক্লাসে আমি আঁকতে বলেছিলাম তোমরা  কেমনভাবে এই পৃথিবীকে দেখতে চাও?  তোমার আঁকা ছবিটা স্কুল সিলেক্ট করেছিল কম্পিটিশনে পাঠানোর জন্য। সেই কম্পিটিশনে বিচারকেরা তোমার ছবিকে ফার্স্ট প্রাইজ দিয়েছেন। সবে গতকাল রাত্রে খবরটা পেয়েছি, তাই ঠিকানা খুঁজে খুঁজে এই এত সকালে এলাম। "
" কী ছবি? কেমন ছবি?আমরা সবাই দেখবো "
   হইহই করে ওঠে সামনের ভীড়টা। দিদিমণি তাঁর ব্যাগ থেকে একটা রোল করা কাগজ খুলে সবার সামনে মেলে ধরেন।
" এই কপিটা আমাদের স্কুলে রাখা ছিল, আপনারা  দেখুন এইটুকু ছেলের কী অসাধারণ ভাবনা। "
   ছবিতে চোখ আটকে যায় সকলের। পৃথিবীর মানচিত্র, কিন্তু সবুজ নীলে নয়, ধুসর কালোয় আঁকা। ধোঁয়া পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে তার মাথার উপরে। কয়েকটা  গাছ আঁকা সেই মানচিত্রে, তাদের মুখ যন্ত্রণায় বিবর্ণ। গাছের গায়ে অজস্র ক্ষতচিহ্ন। ছবিটা এত সুন্দর, মুগ্ধ হয়ে যায় সবাই।
" আরও ভালো খবর আছে সন্তুর জন্য।"
   লজ্জায় মাথা নীচু করে থাকা সন্তুর মাথায় আদর করে দিদিমণি বলেন।
" ওর ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়াশোনার আর আঁকা শেখানোর ভার নিচ্ছে ওই সংস্থা, আর কোনও খরচ ওর লাগবে না।"
  ছেলের সাফল্য এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না রেখার।আনন্দেও তো চোখে জল আসে,ঝাপসা দেখায় সামনেটা।সান্তাক্লজ তাহলে গরীবের ঘরেও আসে,তার কাছে বোধহয় কোনও ভেদাভেদ নেই। কাছে কোথায় যেন পুজোর ঘন্টা বেজে ওঠে। সন্তুর মনে হয় সান্তার  স্লেজগাড়ির ঘন্টাও  হয়তো এমন করেই বাজে, চুপিচুপি এসে যখন ছোট ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে উপহার দিয়ে যায়।   
  




     
  
    

Tuesday, 17 December 2019

আমার এখন দেরী হওয়াই ভালো, 
আবছা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে রোদ---
জলছবিতে মিশিয়ে দেবো আলো, 
বন্ধ হিসেব, নিপাট সমুদ্দুর। 
 
   সঙ্গী থাকুক টুকরো বিকেল স্মৃতি, 
   বিফল হাওয়া ভরিয়ে তুলুক ভোর,
   শব্দহীনের ঝাপসা আঁধার প্রীতি, 
   লাগামছাড়া ছন্দে লাগাক ঘোর।

আমার এখন দেরী হওয়াই ভালো, 
বড্ড কেমন  মনখারাপের সুখ,
অবাক-খুশি একলা আকাশগুলো, 
নিঃস্ব ঠোঁটে বসন্ত্-বাহার সুর।

Thursday, 12 December 2019

জলছবি নীলে মিশে দায়হীন,
লাভক্ষতি বেহিসেবী স্বপ্নের,  
অনেকটা পথ বাঁকে আড়ালে,
ভালোবাসা অভ্যাসে রূপ নেয়।

     কালকে যে কথা রাখা জরুরী, 
     অনেকটা সীমারেখা ছাড়িয়ে, 
     রোদ্দুরে অমিশুক ইচ্ছেরা,
     মুখোমুখি বিষাদের আভাসে।

তুমিও তো কতদিন নাম ভুল, 
চেনা সুর, তাল কাটে যেখানে , 
ছকবাঁধা মুহূর্তে বন্দী, 
ফিরে আসা উন্মুখ দেওয়ালে।