Wednesday, 24 May 2017

আঁকার বিপত্তি


       তখন খুব ছোট ,যতদূর মনে পড়ে কেজি টেজি তে  পড়তাম ,মানে স্কুলে গিয়ে বাঁদরামি করতাম আর কি l পাড়ায় আমাদের দলটা একটু গুন্ডা গোছের ছিলো ,যতো রকম সভ্য কাজ আমরা করে বেড়াতাম l কার গাছে পেয়ারা ,কুল হয়েছে ,আমরা জানতাম ,কার বাড়ীর বাবা মা অফিস বেরিয়ে যান ,তাদের      বাড়ীতে  ,আচার ,আমসত্ত্ব ,পাটালি মজুত থাকে ,আমরা জানতাম ,হজমি গুলি ,কটা কিনলে কটা ফ্রী ,আমরা জানতাম ,মানে অনেক কিছুই ওই বয়েসেই নখদর্পণে ছিলো আর কি l এতো দরকারী সব কিছুর খোঁজ খবর আমাদের কাছে থাকতো ,কিন্ত বাড়ীর বড়রা মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না আমার উপর ,যাক গে ,সবদিকে তো আর সবাই সুখী হয়ও না l

          একদিন কাকামনি বাড়ীতে ঢুকেই বড় চিত্কার চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করে দিলেন ,কি ব্যাপার !না তিনি তখন পাড়ার কালচারাল সেক্রেটারি ,পাড়ায় আঁকার কম্পিটিশন আছে ,সব বাচ্চlরা গিয়ে বসে পড়েছে ,কিন্ত তাঁর নিজের ভাইঝিই আসে নি ,"চল দেখি তোর পেন্সিল ,ইরেজার আর রঙ নিয়ে ,দিনরাত তো পাড়ায় টো টো করে ঘুরিস  ,অথচ কোনও  কাজের বেলায় নেই ,আমাকেই আসতে হলো নিয়ে যেতে ,চল ,শিগগিরই চল "

        জানবো না কেন ?তবে ওই আঁকা টাকার ব্যাপার  থেকে আমি একটু দূরে দূরেই থাকতাম ,আজ অবধি যতো ছবি এঁকেছি ,কোনওটাই কেউ বুঝতে পারেনি কী সেটা l ধরুন বেশ মনপ্রাণ দিয়ে একটা গরু এঁকে সবাইকে দেখাতে গেলাম ,"ও মা ,কী সুন্দর হয়েছে রে ব্যাঙের ছবিটা "অথবা "আরে !কী দারুণ এঁকেছিস গোলাপ ফুলটা !"বুঝুন মনের কষ্টটা l সেই জন্যই আর কী ........তা কে শোনে ছোটোদের কথা ,মিতি ,গুলি , নান্টু  আর পিয়া দের পাশে দুঃখু দুঃখু মুখে গিয়ে বসলাম , কী অবস্থা হবে একটু পরে তাই ভেবেই গায়ে জ্বর আসছে প্রায় ,নাঃ ,দলপতির আসনটি আর বজায় রাখা যাবে না বোধহয় l

           "যেমন খুশী আঁকো ",হাসি হাসি মুখ করে একজন এসে বলে গেলেন ,শুধু পরিষ্কার করে আঁকতে হবে l কী আঁকি ,কী আঁকি ,আড় চোখে তাকিয়ে দেখি সবাই বেশ সিরিয়াস মুখ করে এঁকে যাচেছ ,এতো দূরে দূরে বসিয়েছে যে কে কী আঁকছে দেখাই যাচেছ না l যাকগে ,যা থাকে কপালে ,শুরু তো  করি .........

          সন্ধ্যেবেলা ,কাকামনি এসে ধপাস করে খাটে বসে পড়লেন ,"কী এঁকেছিস সোনা  ওগুলো ?আমি আর লজ্জায় কাউকে বলতে পারছি না যে এই আঁকার পাতাটা আমার ভাইঝির ...."সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুমড়ি খেয়ে এলো "কেন কেন ?কী এঁকেছে সোনা ?"

    "একটা ঘর ,একটা মাছ  ,দুটো ফুল  ,সবার তলায় আবার লিখে দিয়েছে সেগুলো কী ,নইলে কারো সাধ্যি ছিলো না বোঝার l আরেকটা ওটা কী এঁকেছিস রে ?আমি তো তলপেল বলে কিছুর নাম শুনিনি কোনোদিন ,ওই যে গোল মতো ,ওটা কিসের ছবি রে ?"

গোঁজ হয়ে উত্তর দিই "তলপেল  আবার কী ?ওটা তো আমি আপেল এঁকেছি "

   ঘরে যুগপৎ স্তব্ধতা এবং খোউয়া খোউয়া হাসির মিশ্রণ বিরাজ করে ,কিছুক্ষণ বাদে খবর আসে আমি নাকি ওই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছি !!!!!

      অবিশ্বাস্য খবরের সত্যতা যাচাইয়ে গিয়ে বাবা শোনেন যে আঁকার তলায় লিখে বুঝিয়েছি বলেই নাকি আমার দ্বিতীয় স্থান প্রাপ্তি ,পরিচ্ছন্নতার জন্য l

        তারপর থেকে আর জীবনে কোনোদিন আঁকার দিকে হাত বাড়াই  নি,পড়ার আঁকাগুলো ছাড়া ,তবে সেগুলো নিয়ে দুঃখের কাহিনী লিখতে গেলে মহাভারতের সেকেন্ড এডিশন রচনার সম্ভাবনা আছে ,তাই থাক ........

Monday, 22 May 2017

ভালবাসা ,ভালো --বাসা

                            দৃশ্য (১)

-অ্যাই শোন না ,অ্যা....ই

-কী বলবে বলো ,তাড়াতাড়ি ....

--কেন ,তাড়াতাড়ি কেন ?

-আরে বাবা ,দেখতেই তো পাচ্ছ কাজ করছি

-হ্যাঁ ,শুধু কাজ ,কাজ আর কাজ ...😢😢 😥  কখনো    কোনো   সময় নেই ....😥😥আমার জন্য  তোমার কোনো সময় থাকে না ...😥এর থেকে .....😥😥😥😥😥😥😥

-আচ্ছা আচ্ছা বলো ,উফ্ !

-থাক ,দরকার নেই ,তুমি কাজ করো .....

-আহা বলো ,কী চাই , রাগ করে থেকো না প্লী--জ

-শোন না  ,কাল তো মিস্টার দত্ত র কাছে যাওয়া ,ওঁকে বলতে হবে আমাদের কিন্ত দুটো বারান্দা চাই ,সাউথের ঘরের সঙ্গে একটা না হলে চলে বলো ?

-মানে টা কী ??উনি কি দেওয়াল ফুঁড়ে বারান্দা ঝুলিয়ে দেবেন !!

-তা কেন ?ওঁরা সব পারেন ,দেখো না একটু কথা বলে

-আমি পারবো না বলতে ,কেন ,আগে বললেই তো অন্য ফ্ল্যাট দেখতাম ,তখন তো দেখে গলে গেলে একেবারে

-আহা ,ফ্ল্যাট টা তো খুবই সুন্দর ,তবে দক্ষিণে একটা বারান্দা না থাকলে ....ভেবে দেখো ....আজ থেকে পঁচিশ তিরিশ বছর পরে .....আমরা বুড়ো বুড়ি .....বারান্দায় বসে সন্ধেবেলায় চা ...সাথে দখিনা হাওয়া....আহা ..

-আচ্ছা ,থাক ,থাক ,দেখছি , পার ও বটে তোমরা ,

-😃😃😃😃😃😃

                                 দৃশ্য (২)

-দ্যাখো দ্যাখো ,কী সুন্দর

--কী  দেখবো ?

-আরে বাবা দেখতে পাচ্ছ না ? ওই দেখো দুটো শালিখ কী সুন্দর গল্প করছে ,আর ....

-কী আর ?

-বাড়ী বানাচ্ছে

-উফ্ !এই রোদ্দুরে চোখ ঝলসে যাচেছ আর উনি বাচ্চাদের মতো পাখির বাড়ী দেখছেন ....

-বাড়ী নয় স্যার ,বাড়ী বানানো

-একই হলো

-মোটেই না ,দুজনে কী সুন্দর আলোচনা করে নিচ্ছে আগে দেখো

-চলো চলো ,দেরী হয়ে গেলে আর মিস্টার দত্ত কে অফিসে পাবো না ,তখনই দক্ষিণে বারান্দার শোকে আবার চোখে সমুদ্র নামবে কিন্ত  ,এটা ও আমাকেই বলতে হবে ,লজ্জার মাথা খেয়ে ,একটা কাজ নিজে পারে না ,শুধু আমার উপর চোখরাঙানী

-তাই তো স্বাভাবিক ,দেখো না ছেলে শালিখটা মুখে করে খড়কুটো নিয়ে যাচেছ ,আর মেয়েটা বলে দিচ্ছে কোনটা নিতে হবে ,বাসা তৈরী করতে গেলে কোনটা ভালো হবে

-তাতে কী !!!!

-মানে হলো যে যাদের বুদ্ধি বেশী ,তারা শুধু নির্দেশই দেয় ,যাদের কম ,তারা কাজ করে 😉😉

-কী ই ই !!!!থাক ,পারবো না আমি যেতে ,নিজে গিয়েই সব কথাবার্তা বলে নিও 😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡😡

Sunday, 21 May 2017

"পথের টুকিটাকি "

কাল  রাত্তিরে  একটা  অনুষ্ঠান  দেখে  ফিরছি  মহাজাতি  সদন  থেকে ,মেট্রোর  দুটো  কাউন্টার ,দুটোর  সামনেই  বিশাল  লাইন ,সাড়ে নটা  বেজে  গেছে ,বাড়ি  ফেরার  ব্যস্ততা  আঁকি বুকি কাটছে যাত্রীদের  বিরক্ত  মুখে চোখে ,আমিও  লাইনে ,হঠাৎ একটা  ছেলের  দিকে  চোখ  আটকে  গেলো ,পাশের  লাইনে  দাঁড়িয়ে  অসহায়ের  মতো  খুচরো  পয়সা  গুনে  যাচ্ছে ,মাথা  নাড়ল ,পিছন  থেকে  ঠেলা  খেয়ে কাউন্টার এর  সামনে  পৌঁছে  গেছি  দুজনেই ,আমি  টিকিট  কেটে  সরে  আসছি ,ছেলেটা  কাকুতি মিনতি  করছে  দেখে  দাঁড়িয়ে  গেলাম ,কতো  আর  বয়েস  হবে ,বোধহয়  ক্লাস  ইলেভেন  বা  টুয়েলভ এ  পড়ে ,পিঠে  ভারী  ব্যাগ ,মুখ  শুকনো ,আমার  খুব  চেনা  এই  মুখগুলো ,হা ক্লান্ত  হয়ে  ফেরে  পড়াশুনা নিয়ে  ধস্তাধস্তি  করে ___
                 কিছুক্ষণ পরে  ছেলেটি  লাইন  থেকে  বেরিয়ে  এলো ,তাকে প্রায়  ঠেলে সরিয়ে  দিয়ে অন্যরা  টিকিট  কাটতে  ঝাঁপিয়ে  পড়েছে ,খুব মায়া  হলো  আমার ,জিজ্ঞেস করলাম "কী  হয়েছে  তোমার ?খুচরো  পাচ্ছ  না ?"
"না  আন্টি , এই  দশ টাকার  নোটটা  নিচ্ছে  না  দেখুন  না ,কতোবার বললাম  "
  "তুমি  আমাকে দাও ,আমি  ভাঙিয়ে  দিছি "
"না  মানে  এই _____"
     বুঝতে  পারলাম  ওই  দশ টাকার  নোটটাই  ওর  ভরসা ,বাকিটা  হয়তো  খরচ  হয়ে  গেছে  বন্ধুদের  সাথে ফুচকা  অথবা ঝালমুড়ি নিদেনপক্ষে  সিগারেট ......
  "ঠিক  আছে ,তুমি ওটা  আমাকে  দাও ,আমি  পাল্টে  দিচ্ছি "
        দুটো গাল ভর্তি  হাসির  আলো  ছড়িয়ে  ছেলেটি  আমার  হাতে  ধরিয়ে  দিলো একটা  নোট ,সেটার   অবস্থা  এতোটাই  খারাপ  যে  রাস্তায়  পড়ে   থাকলেও  কেউ  তুলবে  না ,নিশ্চয়ই কেউ  ওকে এই  নোটটা গছিয়ে দিয়েছে বাসের কন্ডাক্টর অথবা দোকানদার ,বন্ধুদের  সাথে গল্পে  অন্যমনস্কতার সুযোগে......
            এই  কথোপকথন এর  সময়  আমার  বাড়ির  লোকটি  ট্রেন  ধরতে  গিয়েও দাঁড়িয়ে  পড়েছেন ,এবার  কাছে  এসে  বললেন  "কী  হলো  ব্যাপারটা ?তুমি  ওই  টাকা  চালাতে  পারবে !"আমি  একটু  হেসে  বললাম "তুমি এবার  চলো তো ,দেরী  হলে  বাড়িতে  চিন্তা  করবে না ?"

Friday, 12 May 2017

"পুশকি "

              তখন  আমি  খুব  ছোট ,পাড়ার  অনেক  কুকুর  বেড়াল  নিত্যসঙ্গী ,বাবা  মা  অফিস  গেলেই  বন্ধুদের  সঙ্গে  নতুন  নতুন  দুষ্টুমি  আবিষ্কার  করা ,স্কুলের  ছুটি  থাকলে  তবেই  অবশ্য ,পাড়ার  কোন  গাছে  ফল  পেকে  খাওয়ার  যোগ্য  অথবা  অযোগ্য  হয়েছে  তার  খবর  ছিলো  নখদর্পণে .একদিন  একটা  ঘটনা  ঘটেছিল , যার  জন্য  আজ ও  নিজেকে  ক্ষমা  করতে  পারি না..

             আমার  সেদিন  স্কুল  ছুটি ,দুদিন  পড়ে  পরীক্ষা ,তাই  study  leave ; তা  আমিও  পড়ছিলাম ,গল্পের  বই ,জিম  করবেট,মানুষখেকো  বাঘের  সঙ্গে  লড়াই ,পড়তে  পড়তে  তন্ময়  হয়ে  পড়েছি ,নিজের  বাড়িতে  বসে  আছি  না  জঙ্গলে , তাই গুলিয়ে  গেছে ,
আমাদের  বাড়িতে  কয়েকটা  বেড়ালের  অবাধ আনাগোনা  ছিলো ,তার  মধ্যে  একজন  ছিলো  পুশকি, সাদা হলুদে মেশানো ,খুব  মিষ্টি  মুখটা ,আমার  প্রশ্রয়  পেয়ে  বেশ  দুষ্টু ও  বটে __

        সেদিন  দুপুরে  আমার  জন্য  রাখা  ছিলো  মাছের  ডিমের  ঝোল ,দারুণ  প্রিয়  খাবার  আমার ,সকালে  একটু  টেস্ট  করে  রেখে  দিয়েছিলাম  ,পরে  ভালো  করে  সময়  নিয়ে  খাবো  বলে ,হঠাৎ  পাশের  ঘরে  ঝন্ ঝন্  শব্দ ,কী  হলো !! করবেট কি  মাচা  থেকে  পড়ে  গেলেন  বাঘের  সামনে ? ও  হরি , জঙ্গল  কোথায় !তাড়াতাড়ি  পাশের  ঘরে  গিয়ে  দেখি  পুশকি মহানন্দে  ঝোলের বাটির  মধ্যে  মুখ  ডুবিয়ে  খাচ্ছে , আমাকে  দেখে ও  কোন ও  হেল দোল  নেই , আমি  বোধ হয়  একটু  জোরেই  চিৎকার করে  উঠেছিলাম , রান্নাঘর  থেকে  মালতী দি   দৌড়ে  এসে  বললো "হলো  তো ? আরো  আদর  দাও  ওই  শয়তান টাকে "বলে  আমার  জলভরা  চোখের  সামনে  পুরো  ঝোল টা  ফেলে  দিলো , ইতিমধ্যে  পুশকি ও  কিছু  আন্দাজ  করে  চম্পট ...

         আমার মাথার  রক্ত  তখন  টগবগ  করে  ফুটছে , কী  করে  ওকে  শাস্তি  দেওয়া যায় ,করবেট  সাহেবের  শিক্ষা  মনে  করে  পরের দিন  ফাঁদ  পাতলাম পুশকির  জন্য ___

       জানলার  পাশে  লুকিয়ে  বসে  আমি ,হাতে  কাঁচা  পেয়ারা ,সঙ্গে  নুন  ,কতক্ষণ বসতে  হবে  জানিনা ,সামনে  রান্নাঘর  থেকে  লুকিয়ে  আনা  মাছ ভাজা ,এমন  ভাবে  রাখা  যেন পুশকি ওটা  নিতে এলে  আমি  দেখতে পাবো ,ও  আমাকে  দেখতে  পাবে  না ,পাশে  একটা  লাঠি  রাখা  আছে ,আজ  ও  পিটুনি  খাবেই  আমার  কাছে ,বড্ডো  বদমাশ  হয়ে  গেছে ,কাল  থেকে  একবার ও  আসেনি  ,....

            আবার  বই তে  ঢুকে  পড়েছি ,কুমায়ূনের  মানুষখেকো র  সামনে ,কে  পুশকি,মাছের  ডিম ই  বা  কী ,সব  ভুলে  গেছি ,হঠাৎ  একটা  টুক  করে  শব্দ ,দেখি উনি  এসে  আস্তে আস্তে  মাছটা  টেনে  নিতে  শুরু  করেছেন ,চোখদুটো  আমার  দিকে  রেখে ,লাঠি ফাঠি  ভুলে  গিয়ে  হাতের  নুনটাই  ছুড়ে  মারলাম  ওর  দিকে ,পুরো  চোখের  মধ্যে  ঢুকে  গেলো  ওর ,....

        মাছটা  রেখে  চোখ  বন্ধ  করে  চুপ  করে  বসে  পড়ল  পুশকি,আমার  তখন  আপশোসের  শেষ  নেই ,এই  রে ,ও  অন্ধ  হয়ে  গেলো  বোধহয় ,গায়ে হাত  বুলিয়ে  দিতে দিতে  আকুল  হয়ে  ডাকছি  ওর  নাম  ধরে ,পুশকি চুপ ,মালতী দি  এসে  সব  শুনে  আমাকে  কী  বকুনি ,"দেখো  ও  আর  চোখে  দেখতে পাবে  না ,বাঁচবে ও  না বোধহয় ,এমন  করতে  আছে ?"আমি  শুধু  কেঁদে ই  যাচ্ছি ,অনেকক্ষণ  পরে  চোখ  খুলল  পুশকি,উঠে  চলে  গেলো  মাছটা  না  নিয়েই .....

      আর  কোনদিন  আসে  নি  পুশকি আমাদের  বাড়িতে ,রাস্তায়  কতবার  ওকে ডেকেছি ,গম্ভীর  ভাবে  চলে  গেছে ,যেন  চেনেই  না  ,যার  সাথে  একটু  দুষ্টুমি  না  করলে  আমার  মন  খারাপ  থাকত  সারাদিন ,তার  কাছে  আজ  ক্ষমা  চেয়ে  নিলাম .........

ইচ্ছেপূরণ

          বছরের এই  সময়টার জন্য সারাবছর  ধরে  ভাললাগার স্বপ্ন  বুনে  চলে সবাই lদুর্গা ঠাকুর ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাপের  বাড়ী  বেড়াতে  আসেন ,কাশফুলে মাঠ  সাদা  হয়ে  যায় ,আর কালো  মেঘেরা  হঠাৎ সাদা  হয়ে  গিয়ে  রোদ্দুরের সাথে  লুকোচুরি  খেলে  বেড়ায় l

         তুতুন এই  কদিন খুব  ব্যস্ত ,মায়ের  সাথে  ছোট্ট  ছোট্ট  হাত  মিলিয়ে  কাজ  করে  চলেছে l কতো সুন্দর  সুন্দর  জামা  বানাচ্ছে  মা ,এবার  নাকি  অনেক  অর্ডার  পেয়েছে ,হাসিমুখে  বলছিলো  বাবাকে ,শুনে  বাবা  কোথায়  খুশী  হবে ,তা  না ,মুখটা  কেমন  যেন  হয়ে  গেলো ,মাকে  বললো "আমি  তো  বিছানায়  পড়েই  গেছি ,এবার  তোমার  কিছু  হলে  যে  মেয়েটা  ভেসে  যাবে ,তোমার  এতো  খাটনি  আমি  আর  দেখতে  পারছি  না "বাবা  যেন  কেমন   কথা  বলে  আজকাল ,বোঝা  যায়  না  সব ,তুতুন  ভেসে  যাবে  মানে ?ও  কি  সাঁতার  জানে  না ?মামাবাড়ির  পুকুরে  ওকে সেবার  ঝর্ণামাসি সাঁতার  শিখিয়ে  দিয়েছে তো , যাই হোক  ,এবার  ও খুব গুড  গার্ল  হয়ে  গেছে ,একটুও  বায়না  করে  নি ,টুসি ,বুলুন ,পিকো সব্বার নতুন  জামা  হয়েছে ,মা  বলেছে  এই  জামাগুলো বানিয়ে  দিলে যা  টাকা  পাবে ,তাই  দিয়ে  চেষ্টা  করবে  একটা জামা  যদি  কিনে  দিতে  পারে ,প্রতিমাসে বাবার  ওষুধে  অনেক  টাকা  লাগছে  তো ,তুতুন  কিন্ত  চায়  নি জামা  এবার ,বাবা  সুস্থ  হয়ে  গেলে  আবার  উঠে  কাজে  যাবে , আর পুজোর  আগে  বাড়ী  ফিরে  বলবে "দেখতো ,তুতুন সোনা ,এই জামা গুলো কেমন হয়েছে ?তোমার পছন্দ  হয়েছে তো ?"ও  তখন  আবার  বাবার  কোলে  উঠে  অনেক  আদর  করে  দেবে ,এখন  তাই  ও  ছোট্ট  হাতে  মায়ের  তৈরী  করা  জামাতে বোতাম  সেলাই  করে  দিচ্ছে ,আর  কেউ  যখন  দেখছে  না ,তখন  ওগুলোকে  একটু  হাত  বুলিয়ে  দিচ্ছে ,কী  সুন্দর  পুজো  পুজো  গন্ধ মায়ের  তৈরী করা  জামায় ........

                আজ  সপ্তমী ,পাড়ার  ঠাকুর  কী  সুন্দর  দেখতে ,মাঝে মাঝে  গিয়ে  দেখে  আসছে  তুতুন ,মুখের  হাসিটা  দেখে  ওর  খুব  ভালো  লাগছে ,অনেকবার  মনে মনে  বলেছে "ঠাকুর ,বাবাকে  ভালো  করে  দাও ,আবার  যেন  কাজে  যেতে  পারে ,আমার  এবার  জামা  হয়  নি ,তাতে  আমার  একটুও  কষ্ট  হয়নি ,তুমি  শুধু বাবার  সব অসুখ  সারিয়ে  দাও l "

                               সন্ধ্যেবেলা  পেটে  ব্যথা  করছিলো ,তাই  একটু শুয়ে  ছিলো  তুতুন ,মা  বলল "কী  রে ,মন  খারাপ ? সামনের  বছর ঠিক  তোকে  জামা কিনে দেবো দেখিস ......."ও  কিছু  বলতে  যাবে ,হঠাৎ পিকো ছুটে  এসে  ওর  হাত  ধরে  টানতে টানতে  প্যান্ডেলে  নিয়ে  গেলো ,"কখন  থেকে  তোর  নাম  ডাকছে ,শুনতে  পাচ্ছিস  না !"অবাক  হয়ে  গিয়ে  দাঁড়াতেই  ওর  হাতে  পাড়ার  অন্তুকাকু একটা  গোলাপী  ফ্রক  ধরিয়ে  দিলো ,আরে !এটা  তো  মায়ের  তৈরী ,আর এই  নীল  বোতাম ওর ই  লাগানো !আশেপাশের বাচ্চাদের  হাতেও মায়ের  তৈরী  জামা ,সবগুলো  ওর  চেনা ,তাহলে অর্ডার টা  এই  পাড়া  থেকেই  দিয়েছিলো ?আচ্ছা ,মা  দুর্গা  কি  সবার  মনের  কথা  বুঝতে  পারেন !নাহলে  কী করে  জানলেন  যে  এই  গোলাপী  জামাটাই ওর  সবথেকে  পছন্দের   ছিলো ?
             ---------------::::::::::::::::---------------

Wednesday, 10 May 2017

" প্রিয় ব্ন্ধু "


       ছোট্টবেলা থেকে আমার ব্ন্ধু তুই ,তোর সাথে আলাপ  হওয়ার পর থেকে আর কাউকে তোর  জায়গায় বসতে দিইনি ,কোনোদিন দেবো ও  না ....

       তোর  ব্যপারে ভীষণ পজেসিভ আমি ,সবার চোখের আড়ালে রাখতে তোকে ,কয়েকবার বিশ্রী অভিজ্ঞতার রেশ এখনও রয়ে গেছে মনের ঘুলঘুলিতে ....

           ক্লাস সিক্স এ  পড়ি তখন ,বাংলা ক্লাস চলছে ,রেণুদি রচনা লিখতে দিলেন "সন্ধ্যা " ,লুকিয়ে বিভিন্ন বই গোগ্রাসে গেলার সুবাদে বড় বড়  কথা  সাজিয়ে লিখে ফেললাম রচনা ,কী খুশী রেণুদি !প্রায় সারা স্কুল ঘুরিয়ে দেখান আর কি ,ব্যস্ মাথায় চাপলো লেখার ভূত ,পড়ার বই খাতা সরিয়ে রেখে  শুরু হলো পুরোদমে সাহিত্যচর্চা ,ফল যা হওয়ার তাই হলো ,পরীক্ষার খাতায়  নম্বর তলানিতে ,তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলো আমার লেখা ,আর আমার জলভরা চোখের সামনে টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে গেলো আমার প্রথম ভালবাসা ........

            কয়েক বছর কাটলো ,হঠাৎ্ আসা প্রেমের কথা কাউকে বলতে না পারায়  আবার ডায়রির পাতা সমব্যথি হলো ,বিভিন্ন অনুভূতি ভাগ করে নিতে থাকলাম তার  সাথে ,কে জানতো বড়দের পিছন দিকেও একজোড়া করে চোখ থাকে ?আবার তদন্ত ,আবার ধরা পড়া ,এবার ডায়রি বাজেয়াপ্ত ,টেনে ছিঁড়তে পারা গেলো না ,গায়ের চামড়া  মোটা ছিলো বলেই হয়তো .....

             আর কাউকে দেখাইনা তোকে ,তুই আমার  একমাত্র বন্ধু যার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার  করা যায় ,উজাড় করে দেওয়া যায় আমার ভালোলাগা ,খারাপলাগা ,ছোট বড় মান অভিমান ........

              তুই আমার লেখা ,আমার সবকিছু জানিস  তুই ,আর কাউকে  তুই সেই কথাগুলো বলে দিতে পারবি না ,কারণ লেখা হয়ে গেলেই আমি কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিই ,আমার চিন্তা ভাবনা মিলিয়ে যায় আকাশ জুড়ে ,বাতাস ভরে ,ঐটুকুই আমার  প্রাপ্তি ,নাই বা পড়ল কেউ ,নাই বা বুঝলো আমায় ,তুই তো কোনওদিন ভুল ধারণা রাখবি না আমার সম্বন্ধে ,আমার প্রিয় ব্ন্ধু ......

Sunday, 7 May 2017

অনেকদিন আগেকার লেখা ,হ্যাঁ ,ঠিক ধরেছেন ,সেই সময়েই ....
                  "নির্ভয়া "

      চলছে ভেসে নামহীন সব ....
     রক্ত মোছায়  চোখের নদী ,
       বাঁচতে চেয়ে যে নির্ভয়া
        শুকিয়ে গেলো মৃত্যু রোদে l

               ঢেউ ওঠে ডুব অথৈ জলে ,
                ওদের দেখে কার কী আসে ?
                  পাখনা কালো পক্ষকালে ,
                    উর্ণনাভর  মরণফাঁসে l

             মোমবাতির ওই টুকরো ক্ষতি ,
               লাভের ঘরে শূণ্য আনে .......
                  আরো অবুঝ সব প্রতিবাদ ........
                  শেষ হয়ে যাক জল কামানে l

Wednesday, 3 May 2017

"দুধ না খেলে ..."

       অনেক মহাপুরুষ এবং মহিলা আছেন ,যাঁরা দুধ খেতে ভীষণ ভালোবাসেন ,আমি দূর থেকে তাঁদের সশ্রদ্ধ এবং ভীতু ভীতু প্রণাম  জানাই ,কী অসাধারণ শক্তি তাঁদের ,বাবারে !!!
       
         সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে দুধের সাথে আমার শত্রুতা l জ্ঞান হওয়ার  পর  থেকে ওই ফ্যাটফ্যাটে  সাদা  তরলের  গন্ধ ,বর্ণ ,স্বাদ কিছুই পছন্দ হতো না  আমার ,তা  সে  যতই চড় ,গাট্টা ,কানমলা সহ্য করতে হোক না কেন l

          চেহারা এমন ছিলো ,বেশী হাওয়া এলে বড়রা বলতেন "ওরে ,ধরে রাখ ওটাকে , নইলে উড়ে যাবে "এহেন অবস্থায় মায়ের এবং ঠাকুমার ইচ্ছে ছিলো যতোটা পারা যায় খাবার দাবার আমার পেটে চালান করে দেওয়া , চেঁচামেচি ,মারধোর , এমনকি খেলনার লোভ দেখিয়েও l

       "আমার মাছ শুধু ভাজা হবে ,একটুও ঝোল লেগে থাকবে না l"

       " ইস্ !! নিজেদের রান্না কী সুন্দর দেখতে ,আর আমার বেলায় বিচ্ছিরি কালো আর  হলুদ রঙের ঝোল ??একদমই খাবো না ,(গালে জোর করে ঠুসে দিলেও না) , "

           "ও বৌমা ,তোমার এই বদমাইশ মেয়েকে খাওয়ানো  আমার পক্ষে সম্ভব না , হাত শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে গেলো ,ভাত সবটা থালায় পড়ে ,নাও কী করবে করো ,আমি উঠলাম "

           "কী বাজে রান্না করো তোমরা ,টিফিনে সরিতা  আমাকে ওর মায়ের রান্না সিমুই এর পায়েস খাইয়েছে জানো ?"

          "তা যা না ,ওদের বাড়ী গিয়েই থাক ,বাড়ীর পায়েস তার মুখে রোচে না ,কার না কার রান্না  ওই কেন্নো গুলো সোনামুখ করে খায় ,দাঁড়া ,বিয়ে দিয়ে দেবো ,শাশুড়ি পিটিয়ে গেলাবে "

      অদেখা সেই শাশুড়ি ভয়ঙ্কর রূপে কল্পনায় এলে ভয়ে ভয়ে কিছুটা খাবার গলাধঃকরণ করতাম ,মোটামুটি এই ছিলো রোজনামচা ......
       
       আর সব খাবার কিছু কিছু মারধরের পর পেটে ঢুকলেও দুধ খাওয়াতে এলেই চিত্কারের শব্দে বাড়ীর অন্য লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে যেতেন , আদরের মেয়ের ,ভাইঝির অথবা নাতনীর উপর এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁরা মাঝে মাঝেই জোটবদ্ধ হতে চেষ্টা করতেন ,কিন্ত ওই যা হয় ,দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার ,ইত্যাদি ইত্যাদি ..........
        
             দুধের স্বাদ বদলানোর চেষ্টা করা হলো ,তখন ছিলো নিউট্রামূল ,চকলেট ফ্লেভার ,দেখা গেলো পাজী শয়তান মেয়েটা (কতো যে বিশেষণ যোগ হতো ওই ছোট্ট মেয়েটার নামের আগে ,আহারে ,ভাবলেও কষ্ট হয এখন )শিশি ভর্তি উড়িয়ে দিচ্ছে এমনি এমনি খেয়ে ,আর দুধের গ্লাসটা দুখু দুখু মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে l

              মাঝে মাঝে অন্য পথও আবিষ্কার করতে হতো ,(কেয়া করে , জিন্দেগী কা সওয়াল ) ,সেই পথে কয়েকদিন নির্বিঘ্নে চলার পরে আবার কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো জানলার তলায় ,যেখানে একটা গাছের পাতা সব সাদা হয়ে গেছে ,আর টুপটাপ করে দুধের ফোঁটা পড়ছে ,এ বাবা ! এদিকে কেউ আসে না বলেই তো এই জানলাটা দিয়ে দুধটা ফেলেছি ,সবদিকে যাবার কী দরকারটা বাপু তোমাদের ?এটা কি অনধিকার হস্তক্ষেপ নয় ???????

            বিয়ের পরে কিছুদিন কেটে যাওয়ায় ভাবলাম ,যাক বাবা ,দুধের হাত থেকে মুক্তি এবার ,কিন্ত আমি ভাবি এক ,হয় আর এক ,কপালে দুঃখ ,সরি ,দুধ থাকলে যা হয় আর কি l

         "হ্যাঁ রে ,এই কদিন গোলমালে তোর কী খাওয়া হলো না হলো দেখতে পারিনি ,এবার তো বাড়ীটা খালি হয়েছে ,এবার দেখেশুনে খেতে দিতে পারবো "

        প্রতি রাত্তিরে এক গ্লাস দুধ !!!!!!খেতে হবে !!!!!!আমার চোখ থেকে প্রায় জল উপচে পড়ে আর কী ,নতুন বৌ ,বেশী কিছু বলতেও পারছি না  ,মৃদু সুরে আপত্তি করে কোনো লাভ হলো না ,স্বাভাবিক লজ্জা ভেবে হেসেই উড়িয়ে দিলেন ,আমিও চুপচাপ দুধের গ্লাসটা নিয়ে সা- আ -আ -ব -ধানে ফ্রিজের তাকের পিছনদিকে রেখে  দিলাম ,আঃ ,নিশ্চিন্ত ,ওঁর চোখের আড়ালে গ্লাসটা নর্দমায় খালি করে মাজতে দিয়ে দিলেই হবে l

           ব্যাপারটা হলো ,পরদিন থেকে অফিস শুরু হয়ে গেলো ,গ্লাসে খালি করা হলো না ,উপরন্ত তিন চারটে গ্লাস জমা হয়ে গেলো ,চিন্তায় চিন্তায় মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় ,

        "হ্যাঁ রে চৈতালী ,গ্লাসগুলো কোথায় গেলো বলতো ?খুঁজে পাচ্ছি না ,কেউ নিয়ে নিলো না তো ?"

  আর তারপরেই ,আর্ত চিত্কার ,

        "এ কী !!ফ্রিজের মধ্যে এতো দুধ কেন ??ইস্ !!মেঝেতে পুরো ভর্তি হয়ে গেলো যে ,তোর আবার কী হলো ?তুই মাথা নিচু করে আছিস কেন ?"

         সীতা কী এর চেয়ে করুণ সুরে ডেকেছিলেন ?কী জানি ,তবে আমার ভাগ্য তো অত ভালো নয় ,মাটি ভাগ হলো না ,আর পরবর্তী কয়েক দিন ধরে বাড়ীতে যে হাসির হররা (ছররা নয় তো ?)উঠলো ,তাতে আমাকেও অংশগ্রহণ করতে হলো ........