Sunday, 24 December 2017

সাহসী


          জোর তর্ক জমে উঠেছে বাবিয়া আর চুমকির মধ্যে,এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, এই দুই মাসতুতো ভাইবোন দেখা হলেই প্রথমে ঝগড়া তারপর মারপিট করবেই , কয়েকদিনের ছোট বড় বলে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, অন্য তুতো ভাইবোনরা সামাল দিতে (মতান্তরে বাড়িয়ে দিতে) ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
               আজকের টপিক হল ভূত আছে কী নেই, বাবিয়ার মতে খুব আছে, ওদের বাড়ীর থেকে একটু দূরের  আমবাগানটা  একদম গিজগিজ করছে ভূতে, আনেকদিন আগে গ্রামে ডাকাত পড়েছিল, তাদের সংগে লড়াই করতে গিয়ে কয়েকজন শহীদ হয়েছিলেন, চার পাঁচজন ডাকাত ও মারা গিয়েছিল, তাদের আত্মা এখন ও ঘুরে বেড়ায়, তবে কেউ রাত্তিরে ওই বাগানে গেলে একসাথে তাড়া করে ঘাড় মটকে দেয়। এই অবধি শুনে যেই  চুমকি হি হি করে হেসেছে, অমনি চোখ মুখ লাল করে তেড়ে এসেছে বাবিয়া,

'দেখ চুমকি, কলকাতায় থাকিস তাই ভূত দেখিস নি কোনওদিন, তা বলে তারা নেই? গাধার মতো কথা বলিস না '

' আর তুই বুঝি রোজ ভূতেদের সাথে বসে চা বিস্কুট খাস '

' যা না, আজ রাত্তিরে ওই আমবাগানে এক চক্কর  ঘুরে আয় না, দেখি তুই কেমন সাহসী '

                  কুহুদির বিয়েতে আজ অনেকদিন পরে সব ভাইবোন একসাথে হয়েছে, রান্নাঘর থেকে মুখরোচক খাবারদাবার সাপ্লাই হচ্ছে, আড্ডা, গল্পও চলছে দেদার, এর ওর পিছনে লাগা, চুলের মুঠি ধরে টান, গুম গুম করে ফিরতি ঘুসি, বিভিন্ন পরিকল্পনা, সবই চলছে নিয়মমাফিক, তার মধ্যে  চুমকিকে  এই ওপেন চ্যালেঞ্জ, অ্যাকসেপ্ট না করলে নিজের দলের কাছে মান থাকে কখনও? মুন্না, জিনি,বুকু কতো আশা নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, বুকের ভিতর মৃদু ভয়ের শিরশিরানি উপেক্ষা করে চুমকি বলে, 'ঠিক আছে, যা, ডান, দেখতে পেলে একটার নাকে দড়ি বেঁধে নিয়ে আসবো, কলকাতায় গিয়ে দোকান বাজার করতে শিখিয়ে দেবো, মায়ের খুব সুবিধে হবে '

                মাসিমণির বাড়ী স্টেশন থেকে একটু দূরে, হেঁটেই যাওয়া যায়, পথে বাঁ দিকে পড়ে আমবাগানটা, ওইদিক দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছনো যায়, কিন্ত সন্ধ্যে হয়ে গেলে সবাই নাকি ডান দিকের পাকা রাস্তাটা ধরে আনেক ঘুরে স্টেশনে যায় তাতে যদি দু'একটা ট্রেন মিস ও হয় তা ও সই, সারাদিনের  ফাঁকে ফাঁকে এই কথাগুলো চুমকির কানের সামনে বলে যাচ্ছিলো বাবিয়ার সাঙ্গপাঙ্গরা, জিকো, বুবলু আর মিঠাই, পাত্তা দিতে বয়েই গেছে চুমকির, আর ওইসব বেশী শোনাও উচিত নয়, অপপ্রচার যতো। কে নাকি বাগানে ঢুকেছিল, হসপিটাল যাওয়ার তাড়া ছিল তার, দেখে বাগানের মধ্যে দু 'দল লোক লাঠি  খেলছে, ওকে দেখেই নাকি হা রে রে রে করে তেড়ে এসেছিলো, কোন ও রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে সে।

                একটু আগে কুহুদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল, কান্নাকাটি করে মা, মামা,মাসী, মামীরা সব গাল ফাল ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে,আর চুপচাপ কালকের জন্য তত্ব গোছাচ্ছে,  সারাক্ষণ ওদের ওপর  সবকিছু নিয়ে খিটখিট করছে না, আজকেই সুযোগ, ঠিক হয়েছে সন্ধ্যেবেলা পেরিয়ে অন্ধকার হলেই  চুমকি আমবাগানে ঢুকে ওখানে যে শহীদ বেদীটা আছে, তার উপর কিছু চিহ্ন রেখে আসবে, সকালে বাবিয়ারা সবাই মিলে যাবে (কী ভীতু রে বাবা, একা যেতে ও পারবে না) ওই চিহ্নটা দেখে এসে তবে মেনে নেবে যে চুমকি ওদের থেকে বেশী সাহসী।

              চুমকি একদম রেডী, এইবার বেরবে, সংগে নিয়েছে একটা লাঠি, তার মাথায় লাল ওড়না বাঁধা, একসাথে দু'টো কাজ ই হবে, যারা মাটিতে লতিয়ে চলে, তাদের হাত থেকে বাঁচতে হবে তো নাকি? আর নিয়েছে একটা শক্তিশালী টর্চ।  ও মা, মুন্নার চোখ ছলছল করছে কেন! চুমকিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বুকু আর জিনি একসুরে বলে ওঠে 'থাক না দিদিভাই, ছেড়ে দে, যা ইচ্ছে বলুক গে ওরা, এই অন্ধকারে একা একা ওই জংগলে যাস না তুই, আমাদের খুব ভয় করছে, ছোটমামা জানতে পারলে খুব বকবে  কিন্ত , আর তোকে যদি, মানে সত্যিই যদি কেউ --মানে কেউ যদি ধরে? 'তুতলে যায় মুন্না। 

                ছেড়েই দেবে নাকি চুমকি ? কী ই বা দরকার এই অন্ধকারে ভূতের হাতে কানমলা খাবার? বিয়েবাড়ী এসেছে, খাবে দাবে, ঘুরে বেড়াবে, এই তো ভালো, না মানে হঠাৎ  কেউ যদি তত্ব সাজাতে কোন ও দরকারে ওকে ডাকে? অসুবিধে হবে না তার? ভাবতে ভাবতেই দেখে বাবিয়া দলবল নিয়ে উঠোনের একপাশে এসে দাঁড়িয়েছে, মুখে সেই গায়ে জ্বালা ধরানো একপেশে হাসিটা, মুন্নার গালটা একটু টিপে দিয়ে রাস্তায় নামে চুমকি।

             যাক, অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে, ওই যে শহীদবেদীটা দেখা যাচ্ছে, এখনও অবধি তো  তেনাদের কাউকে দেখা টেখা যায় নি, এইবার ওড়না লাগানো লাঠিটা রেখে দিয়েই এক ছুট্টে বাড়ী।

                 বিপত্তি টা ঘটলো এর পরেই, যেই না ও লাঠিটা রাখতে গেছে, কে যেন বলে উঠলো ' বাঃ বাঃ বেশ বেশ 'প্রচন্ড চমকে উঠলো  সে, এমন ভয় পেলো যে মনে হলো ওর হার্টটা  এক্ষুণি লাফিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে, কোনও রকমে তাকিয়ে দেখে ওরে বাবা!! ওটা কী!! একটা কালো কুচকুচে ভূত ওর সামনে, মুখটায় আলো ঝকমক করছে, আর  ভূতটা হিঁ হিঁ খিঁক খিঁক করে হেসেই চলেছে। একটুও দৌড়তে পারছে না চুমকি, পায়ে কোনো জোর নেই, চোখ টোখ বন্ধ করে রামায়ণের সব ভাইদের নাম আউড়ে যাচ্ছে, শুধু রামের নামে যদি কাজ না হয়,  কে জানে। কিছুক্ষণ সময় কেটে যাবার পরে মনে হল, আরে, হাসিটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? মনে জোর এনে এক ঘুসি চালিয়ে দিলো ভূতটাকে, সেটা হঠাৎ নাকি গলা ছেড়ে এমনি গলায় বলে উঠলো,

         'ও চুমকি দিদিমণি গো, মেরোনি গো, আমি গোপাল, তোমারে ভয় দেখাতে পাল্লে আইসকিরিম দেবে বলিছে বাবিয়াদাদা '

           
               তাই এত চেনা লাগছিলো গলাটা, এ তো গোপাল, মাসিমণির বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করে  আর টুকটাক ফাইফরমাশ খাটে, কী শয়তান দেখেছ বাবিয়াটা? চুমকিকে ভয় দেখানোর জন্য গোপালকে ভূত সাজিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ও আবার গায়ে একটা কালো চাদর জড়িয়ে চিবুকের তলায় একটা টর্চ জ্বালিয়ে ধরে আছে, তাই অতো ভয়ানক দেখতে লাগছিলো।  ব্যস, আর যায় কোথায়, টানতে টানতে গোপালকে নিয়ে মাসিমণির বাড়ীতে এসে হাঁক পাড়ে চুমকি।

' কী রে বাবিয়া, কোথায় গেলি? চোর কোথাকার, তোর চ্যালা চামুন্ডাদের ডাক, তারা দেখুক তুই কেমন চোট্টামি করিস '

' আরে না না, ভূল বুঝলি চুমকি, আমার আসলে চিন্তা হচ্ছিলো, একা একা গেছিস, তাই গোপালকে পাঠিয়েছিলাম, অন্য উদ্দেশ্য ছিলো না, বিশ্বাস কর তুই ' লজ্জা লজ্জা মুখে সাফাই দেয় বাবিয়া।

                জিনি,মুন্নারা আলো জ্বলা মুখে তাদের আইকনের দিকে তাকিয়ে আছে, জিকোরা মুখে বোকা বোকা হাসি মাখিয়ে চুপ করে আছে, এর থেকে সুখের সময় আর চুমকির কী আছে? তবুও সে হঠাৎ 'ওরে বাবা রে, ও মা গো,ও মাসিমণি ই ই, বাঁচাও  ও ও' বলে চিৎকার করে, জিনি আর বাবিয়াকে ধাক্কা টাক্কা মেরে লাফ দিয়ে বাড়ীর মধ্যে ঢুকে গেলো, সব্বাই অবাক, কী দেখে এত্ত ভয় পেলো সে? জিকো ই দেখালো, একটা পুঁচকে আরশোলা উঠোনের মাঝখানে এসে ভ্যাবাচ্যাকা, খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, বেচারি কোনদিকে যাবে ঠিক করতে পারছে না।

Sunday, 3 December 2017

'   কয়েকটা প্রশ্ন ছিলো  '

          ও মাস্টারমশাই শুনতে পাচ্ছেন ? ও এস.  এম স্যার ,  হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি , আপনিই তো সেই ভয়ঙ্কর অংকগুলোর দাঁত নখ মসৃণ করতে শিখিয়েছেন , সলিড জিওমেট্রি , প্যারাবোলার রক্তচক্ষুকে  উপেক্ষা করেছি তো আপনার দেওয়া সাহসেই  l মনে আছে স্যার ? ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ারলিতে আমি অংকে একশোয় একচল্লিশ পেয়েছিলাম , করিডরে আপনাকে দেখে লজ্জায় পালিয়ে যাচ্ছিলাম , ডেকে বললেন ' আমি তোমার খাতা দেখেছি , তুমি কিন্ত মাধ্যমিকে অংকে লেটার পাবে , শুধু ফাঁকিটা একটু কম মেরো ' l যাদের মধ্যে কোনও সম্ভাবনা দেখতেন , তাদের বাড়ীতে গিয়ে শিখিয়ে আসতেন অংক , নিজে থেকে , ভালোবেসে , পয়সার বিনিময়ে নয় l আপনিও তো মেয়েদের স্কুলের টিচার ছিলেন , নিরাপত্তার অভাব তো কোনও দিন কেউ বোধ করিনি l

             আপনাকে বলছি আনন্দ স্যার , ওই যে কী বলে না , নন টিচিং স্টাফ ছিলেন আপনি , তবু কী দাপট ছিল আপনার ছাত্রীদের উপরে , কোন মেয়েটি বেশী  স্কুল কামাই করছে , কোন মেয়েটি দারিদ্রের কারণে ফিস দিতে পারছে না , তাদের কীসে ভালো হয় , তার জন্য সচেষ্ট ছিলেন , কেন ছিলেন স্যার ? কারণ আপনি সব্বাইকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন , আমার বাবার মৃত্যুর খবরে আপনার চোখে আমি জল দেখেছি l

          ও  দ্বারিকদা , স্কুলড্রেসের কোনও ত্রুটি হলে ,স্কুলে  পৌঁছতে দেরী হলে গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে দিতে না ? ভাঙা ভাঙা বাংলায় কত্ত বকুনি খেয়েছি তোমার কাছে , আবার তুমিই দেখতে মেয়েগুলো যাতে টিফিনের সময় উল্টোপাল্টা কিছু কিনে না খায় , কোথাও  বেরিয়ে না যায় , তোমার উপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেন বাবা মায়েরা l আর কালীপদদা , তোমাকেও ভুলিনি , ছুটির খবরগুলো তো তুমিই এনে দিতে ক্লাসে ক্লাসে , ল্যাব অ্যাসিস্টেন্টের দায়িত্বও সামলাতে তুমি , সেবারই তো , কেমিস্ট্রি ল্যাবে যখন সোডিয়ামের বোতলটা বার্স্ট করলো , কারোর গায়ে এতটুকু আঁচড় লাগে নি , শুধু তুমি ছিলে বলে l

           আজ এই কথাগুলোই কেমন করে যেন ভেসে ভেসে উঠছে মেঘ ভারাক্রান্ত মনের গায়ে l   আমরা ছোটবেলায় যে নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে বড় হয়ে উঠেছি , এখনকার বাচ্চাগুলো কেন সেইটুকুও পাবে না ? কেন তাদের মনের মধ্যে জন্ম নেবে সন্দেহ ? কেন আজ এই দাবী উঠবে যে মেয়েদের স্কুলে পুরুষ টিচার রাখা যাবে না , কেন এই ঘাসের মাঠে খেলে বেড়ানোর , সবুজ প্রজাপতির পিছনে ছুটে যাওয়ার সুযোগ হারানো বাচ্চাগুলোর কাছ থেকে আমরা অগাধ বিস্বাস আর স্বপ্নভরা ছোট্টবেলাটাও কেড়ে নিতে বাধ্য হবো ? কেন  . . . . . ?

Friday, 1 December 2017

পিকনিক পিকনিক


             

          বিকেলবেলা এখন ওদের খেলার সময়,  কিন্তু     দেখা যাচ্ছে   বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছে  রাজু , পাশে বসে বুবলু একমনে নখ খেয়ে যাচ্ছে , আর  সামনের খেলার মাঠ , একদিকে হেলে পড়া অশ্বত্থ গাছ , ভুলো কুকুরের তিনটে সাদা লাল ছানাপোনার দুষ্টুমি , নীল ঘাসফুল , হলুদ সবুজে মেশানো প্রজাপতির দিকে দুখী দুখী মুখে তাকিয়ে  আছে  পুটকি , ঝুপুর , ন্যাড়া আর রুপাই l সামনে এক খাবলা তেঁতুলের আচার শূন্য দৃষ্টি মেলে অসহায় মুখে প্লাস্টিকের টুকরোয় লেপ্টে আছে , কেউ মুখে তুলছে না , ভাবা যায় ! ! !
           
            এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের কারণ খুঁজতে গেলে চলে যেতে হবে আজ দুপুরে এদের পিকনিকের মেনুতে , যেখানে ছিল . . . . . . . না থাক , প্রথম থেকেই শোনা যাক l

            ধুয়োটা প্রথম তুলেছিল রাজুই , ছোটদের পিকনিক , ' কেন , আমরা কিচ্ছুটি পারি না নাকি ? বড়দের পিকনিকে কোন কথাটা শোনা হয় আমাদের ? আমরা কি মেনু ঠিক করি , নাকি কোথায় যাওয়া হবে কেউ আমাদের জিগ্গেস করে ? আর কতদিন পরাধীন থাকবো বল তোরা ?'
' হ্যাঁ , ঠিক ঠিক , কিন্তু কী করে পিকনিক করবি ? টাকাপয়সা কোথায় পাব আমরা ? ' ভীতু গলায় করা  ঝুপুরের প্রস্নটা প্রায় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় রাজু , 'আরে সিম্পল ব্যাপার , টেনশন নিচ্ছিস কেন ? সবাই নিজের বাড়ি থেকে চাল ডাল ডিম ফিম নিয়ে আসবো , দুপুরবেলা বাবা অফিসে থাকবে , মা কে ম্যানেজ করে , আরে বাবা সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে , দেখ না '
' সব তো বলে যাচ্ছিস , রান্নাটা করবে কে ? ' গম্ভীর গলায় বলে ন্যাড়া , একটু  থতমত খেয়ে রাজু বলে ' আমরা পারব না ? ' ' হ্যাঁ , কোনওদিন এক কাপ চা করেছিস ? ' ন্যাড়ার ঠান্ডা গলার স্বরে একদম মিইয়ে যায়  রাজু l
 
            শেষ পর্যন্ত্য চায়ের দোকানের হারুদার প্রায় হাতে পায়ে ধরে রাজী করানো হয় শুধু খিচুড়ি আর ডিমভাজা করে দেওয়ার জন্য , ' তাড়াতাড়ি চাল টাল গুলো এনে দিয়ো , নইলে আমার বিকেলের চপ ঘুগনি রান্নায় দেরী হয়ে যাবে , খদ্দের এসে ফিরে গেলে কিন্ত খুব খারাপ হয়ে যাবে '

            সব ঠিকঠাক হয়ে গেল , ঝুপুর আর রাজু আনবে ডিম ,( রাজুদের পাশের একটা বাড়ীতে পোল্ট্রি আছে  , ঝুপুর বাড়ি থেকেই আনবে , ) রুপাই আনবে তেল আর আদা , পেঁয়াজ,  রসুন , নুন , হলুদ ,  গরমমশলা ইত্যাদি ( হারুদা লিস্ট করে দিয়েছে  ) আর ডাল আনবে ন্যাড়া , চাল আনবে বুবলু আর পুটকি  দু ' জনে মিলে l আসলে প্রায় সবটাই তো ম্যানেজের ওপর দিয়ে চালাতে হবে , পরাধীন যে , পকেট গড়ের মাঠ , সম্মিলিত দীর্ঘঃশ্বাসে ভুলো কুকুরটা ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল l

           দুপুরবেলা ,  দোকানের সামনে হারুদা রাগ রাগ মুখে পায়চারী করে বেড়াচ্ছে ,  একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে 230 গ্রাম চাল নিয়ে ( হারুদার হিসেবে  ) বুবলু প্রাণপণে নখ খেয়ে চলেছে , (এটা ওর মুদ্রাদোষ , আনন্দেও খায় , দুঃখেও খায় ), লুকিয়ে নিতে গিয়ে এর বেশী আর আনতে পারে নি  ,  ওদিকে দুটো হোমিওপ্যাথিক শিশিতে নুন হলুদ , একটা রুগী পেঁয়াজ , চারটে শুকনো কাঁচা লঙ্কা বা কাঁচা শুকনো লঙ্কা  নিয়ে দোকানের সামনের বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছে রুপাই , তেল আনতে না পারায় মরমে মরে আছে প্রায় , ন্যাড়া যদিও ডাল নিয়ে পৌঁছেছে তবে তার  প্যাকেট থেকে বেরিয়েছে বিঊলির ডাল , হারুদার প্রবল দাঁত কিড়মিড়ের সামনে কিছু বলতেই পারছে না , দলবলের সামনে আর প্রেস্টিজ বলে কিছুই রইলো না তার  l 

             ' নাঃ , তোদের কথায় রাজি হয়েই ভুল করেছি , এইসব দিয়ে কী রান্না করবো ? বলিস তো আমার মাথাটা কেটেকুটে উনুনে বসিয়ে দিই '

            ' রাগ কোরো না হারুদা , এই তো পুটকি আরেকটু চাল নিয়ে এক্ষুনি আসবে , রাজুরাও এসে যাবে ডিম নিয়ে , কতক্ষণ আর লাগবে তোমার ? ওই ডাল দিয়েই খিচুড়ি বসিয়ে দেবে , তোমার রান্না যা সুন্দর , যা করবে তাই ভালো হবে '

             এত্ত প্রশংসাতেও কোনও কাজ হলো না , খ্যাঁক খ্যাঁক করে দাঁত ফাত খিঁচিয়ে উঠে বললো '       হ্যাঁ দাদা দিদিরা , ওই যেসব বস্তু এনেছো একসঙ্গেই মেখে উনুনে বসিয়ে দিচ্ছি , সোনামুখে খেয়ো এখন '

           পুটকি এল ভগ্নদূতের মতো , রান্নাঘর থেকে চাল বের করতে গিয়ে মায়ের কানমলা খেয়ে পালিয়ে এসেছে , এই পর্যন্ত্য শুনেই হারুদা পায়চারী থামিয়ে ভয়ংকর মুখে এগিয়ে এল ডাল আর মশলার দিকে , এই রে , দিলো বোধহয় সব ছুড়ে ফেলে . . . . . . .

            ভাগ্যিস রাজু আর ঝুপুর দু ' জনে মিলে চারটে ডিম নিয়ে এসেছিল , আর বুদ্ধি করে খিচুড়ির সঙ্গে খাবার জন্য তেঁতুলের আচার , তাই তো সব্বাই পেট ভরে খেল ,  সত্যি , পাউরুটি দিয়ে বিঊলি ডাল আর ডিমভাজা যে খেতে এত ভালো লাগে কে জানত , শুধু খাওয়ার মাঝখানে ঝুপুর ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো , ওর কী বাড়িতে সেদিন রান্না হওয়া পাবদা মাছের ঝালের কথা মনে পড়ে গেল ? কে জানে . . . . . . . . . .

Monday, 18 September 2017

''দুখজাগানিয়া ''


     
          পুজো  মানেই  ছিলো  একরাশ সিউলিফুলের  গন্ধে  নতুন জামাকাপড়ের  গন্ধ  মিশে যাওয়া ,ছোটবেলায়  ধৈর্য্য  ধরতো  না ,কখন  হাতে  আসবে রঙিন  ফ্রক ,জুতো ,টিপ ,নেলপালিশ ,আরো  কতো কী ,বন্ধুদের  সাথে   চলতো অলিখিত  রেষারেষি ,"অ্যাই ,তোর কটা  হলো  রে এবার ?"
"জানিস  তো ,আমার  দাদু  কী  সুন্দর  গোলাপী  রঙের  একটা  মিডি পাঠিয়েছে ,এবার  ওটা  পরে  অষ্টমী তে  অঞ্জলি  দেবো "
"আমার  আবার  গোলাপী  রংটা  একটুও  ভালো  লাগে না ,আমার নীল  চুড়িদারটা  দেখিস  ,দিল্লী  থেকে  মাসী  এনে  দিয়েছে "
          কতো  পরিকল্পনা ,কতো খুনসুটি ,"অ্যাই  রিঙ্কু ,মহালয়া শুনবি  তো ?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ ,শুনবো  না ?কী যে  ভালো  লাগে "
"ওই  গানটা  শুনতে  দারুণ লাগে ,ওই যে  বাজল তোমার  আলোর  বেণু "
"আমার  ওই  গানটা  বেশী  ভালো লাগে ,জাগো দুর্গা ,জাগো  দশপ্রহরণধারিণী "
           একপাশে  চুপ  করে  বসে  থাকে তিতান ,বড্ডো
    ঘুমকাতুরে   ও ,কোনোদিন  আজ  অবধি  পুরো  মহালয়া শুনতে  পারেনি ,সব্বাই  শোনে ,আলোচনা  করে ,ও  কিছু  বলতে  পারে  না ,ভোরবেলা   বাবা  প্রতিবছর  ওকে  ডেকে  দেন ,"অ্যাই তিতান  ওঠ ,ওঠ ,মহালয়া শুনবি  না ?শুরু  হয়ে  গেছে "
      আঠা লাগানো  চোখ ,অনেক দূর  থেকে  ভেসে  আসে সুরেলা  গলায় গান ,স্তোত্রপাঠ ,হালকা খুশীর  আমেজ গায়ে  মেখে পাশ ফিরে শুয়ে  ঘুমের দেশে  চলে  যায় তিতান ........
         সেই  দিনগুলো  আজ  অনেক  দূরে ,রিঙ্কু ,মৌটুসী আর ঝিলমদের সাথে  কতোদিন  দেখা  হয় নি ,জানা হয়নি  ওরা  এখন  কেমন  করে  পুজো কাটায় ,মহালয়া শোনে কিনা ছেলেমেয়ের সঙ্গে ,তবে তিতান এই  দিনটা  এলেই  অদ্ভুত  এক  দোটানায়  ভোগে ,এক  সঙ্গে  মিশে  যায়  অনেকটা  সুখ ,অনেকটা  দুঃখ .........
               বাবা  চলে  গেলেন পুজোর  কয়েকদিন  আগে ,অসময়ে ,কঠিন  অসুখটা কবে  থেকে  যে  বাবাকে আশ্রয়  করে  বেড়ে  উঠছিল ,আগে বোঝা  যায়  নি ,যখন  ধরা  পড়লো ,তখন  আর  কিচ্ছু  করার  ছিলো  না ,বাবার পারলৌকিক  কাজের  দিন পড়লো  মহালয়ার  দিনে ,বাড়ীতে  রেডিও  চলেনি ,কিন্ত ভোরবেলা  সেই অদ্ভুত  উদাত্ত  কণ্ঠের  সুর  ভেসে এলো আকাশ  বাতাস  মাতিয়ে ,তিতান জেগেই ছিলো ,সেইদিন ও প্রথম শুনলো পুরো অনুষ্ঠান ,মনে  হলো  বাবা  যেন  মাথার  কাছে  এসে  দাঁড়িয়েছেন ,আর
মুচকি  হেসে  বলছেন "কী  রে  তিতান ,কেমন  লাগলো , আর  কে  ঘুম  থেকে তুলে  দেবে  এখন ?"
     না  বাবা ,ঘুম পায়  না আর  এখন  আমার ,মহালয়ার  সময় মনে  হয় ওই  তো   তুমি  দাঁড়িয়ে আছো ,হাত  বাড়ালেই  ছোঁয়া  যাবে ,চলো  আমরা  একসাথে  শুনি "বাজলো  তোমার  আলোর  বেণু ".............

Saturday, 16 September 2017

সেদিন সকাল থেকেই বাড়ীতে তুমুল অশান্তি ,বাবার মানিব্যাগ থেকে নাকি দু হাজার টাকার একটা নোট গায়েব ,  বাবা কাল রাত্তিরে অফিস থেকে ফিরে ড্রয়ারে রেখেছিলেন  মানিব্যাগ ,আজ বাজার করতে যাবার সময় দেখেন  এই অবস্থা l এখন তুমুল লড়াই চলছে মা আর বাবার মধ্যো  l

  'কাল দেখেছি ,আজ উধাও ! এটা কী বাড়ী না ম্যাজিকের স্টেজ ,অ্যাঁ ? '

'তোমার কাণ্ডকারখানা তুমিই দেখ ,আমার দেখে দেখে চোখ পচে গেছে ,নিশ্চয়ই কেউ তোমার কাছে  চেয়েছিল ,দয়ার শরীর তোমার ,দিয়ে দিয়েছ ,আর এখন ভুলে গিয়ে টাকা টাকা করে লাফাচ্ছ '

' বাজে কথা বোলো না ,আমি মোটেই কিছু ভুলে যাই না ,জান আমি মাধ্যমিকে নাইনথ হয়েছিলাম ?'

' প্রতিদিনই তিরিশবার করে শুনি ,কী কী প্রাইজ পেয়েছিলে ,পরের কয়েকমাস তুমি শুধু অন্যের বাড়ী নেমন্তন্ন খেয়ে বেরিয়েছ , স্যারেরা কী কী বলেছিলেন ,সব স অ ব l '
           
               কান খাড়া করে বসেছিল জিকো আর জিনা ,হয়ে গেল ,আজ আর কমলা রঙের মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া হবে না ,প্রতি রবিবার একটাই পাঁঠা কাটে ঝন্টুদা , একটু দেরী করে বাজার গেলেই ওই ফ্যাটফ্যাটে সাদা মুরগির টুকরো ব্যাগ থেকে নিরীহের মতো মুখ বাড়িয়ে থাকে ,নাঃ,আজ পুরো ভাত টা পোস্ত মেখে খেতে হবে বোধহয় l জিনা উসখুস করে  'অ্যাই দাদাই , চল না অন্তুদের ফ্ল্যাটে গিয়ে ক্যারাম খেলি , '

'তুই যা ,আমার এখন অনেক বড় কাজ মাথায় চেপে আছে l '

'কী বড় কাজ রে দাদা ?আজ তো রোববার ,স্যার আসবেন না তো '

'পড়াশোনা আবার কবে থেকে বড় কাজ হলো রে গাধা ? আমি এখন গোয়েন্দা ,বাবার টাকাটা কে নিয়েছে আমিই তদন্ত করে বার করবো ,এই সব কাজ পুঁচকে মেয়েদের দিয়ে হয় না '

            বয়ে গেছে জিনাই এর  ,তুই ই কর তদন্ত ,রোববারের সকালটা মাটি হতে দিতে একদমই চায় না ও ,অন্তুদের বাড়ীতে আবার ওর এক পিসতুতো দাদা এসেছে ,অনেকরকম খেলা জানে ,গুটিগুটি পায়ে ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে ওঠে জিনাই l

          বাবার টাকা হারিয়ে যাওয়ার খবরটা সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ফলে আজ প্রচুর মানুষ খোঁজখবর নিতে জিকোদের  বাড়ী এসেছেন ,তাই  মিষ্টি আনতে আনতে হরণ কাকুর  পায়ে এবং শরবত করতে করতে মায়ের হাতে ব্যথা হয়ে গেছে ,রাত্তিরে কী রান্নাবান্না হবে কে জানে l সামনের দোকানের রুটি আর রসগোল্লা ?হতে পারে ll

           সন্ধ্যেবেলা , পড়ার টেবিল ,সারাদিন টাকা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত  দুজন একসাথে ,একজন শিক্ষক এবং অন্যজন  ছাত্রের ভূমিকায় , মাঝে মাঝে বাবার মনে হয় ওরা কিছুই পড়ছে না ,তখন প্রচন্ড মেজাজ গরম করে তিনি ওদের বইপত্র নিয়ে বসেন ,জিকো জিনাই প্রস্তুত হয়েই থাকে মার বকুনি খাবার জন্য ,কারণ ক্লাসে ভালো ছেলেমেয়ের সুনাম থাকা সত্বেও  মাধ্যমিকের নবম স্থানাধিকারীকে সন্তুষ্ট করা প্রায় অসম্ভব l

   'আকবরের বাবার নাম কি ?'

   'অ্যাঁ ?আকবরের বাবা ?কে যেন ?ও হ্যাঁ ফেলুদা  '
     
     ঠ ক্ কা আ স  করে একটা থাপ্পড় জিকোর গালে এসে গালটা রঙিন করে দিলো ,প্রমাদ গোনে জিনাই ,সারাদিন গোয়েন্দাগিরি করলে এইই হয় ,ওর এখন নিজের বাবার নাম মনে আছে কিনা কে জানে l হঠাত্ প্রচন্ড জোরে কলিং বেল বেজে উঠলো ,থামছেই না , কে রে বাবা ! দরজা খুলতেই গোঁ গোঁ করে প্রায় তেড়ে এলেন  দোতলার রায়কাকু ,শুধু পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে চলে এসেছেন ,চোখদুটো টকটকে লাল

       'কী ই ই !আমি চোর ? দুহাজার টাকা চুরি করেছি ?ছেলেমেয়েকে শিখিয়ে দেওয়া ? আমি মানহানির মামলা করবো , ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে যাব ,পুলিশে খবর দেবো ,আমার সাথে চালাকি ?অ্যাঁ ?'

   বাবা আর মা প্রাণপণে বলে যাচ্ছেন' কী হয়েছে ?ও রায়দা কী হয়েছে ?জিকো  জিনাই কি করেছে ?আপনি একবার শুধু বলুন , তারপর দেখছি ওদের '

  'এটা কী ?অ্যাঁ ,এটা কী ?'

    একটা কাগজ বাবার নাকের সামনে প্রবলভাবে নাড়াতে থাকেন রায় কাকু ,অনেক কষ্টে বাবা দেখেন ওতে লেখা আছে   চোর -2000   ,বাবা বলেন ' কোথায় পেলেন এটা ?' রায় কাকু বলেন 'আবার ন্যাকামি হচ্ছে ? ওদের দিয়ে লিখিয়ে আমার বারান্দায় ছুড়ে ফেলেছেন ,আপনি জানেন না ?'দাঁড়ান ,আমার মাসতুতো শালার বোনপো বোম্বাগড় থানার ওসি ,আমি এক্ষুণি তাকে ফোন করছি ,মজাটা টের পাবেন l '

অনেক কষ্টে জিকোদের বাড়ীর সামনে থেকে  চিৎকারে জড়ো হয়ে যাওয়া লোকজন রায় কাকুকে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হলো ,জিনাই একদমই চুপ ,ওটা তো অন্তুর হাতে লেখা ,আজ সকালে ওদের বাড়ীতে চোর পুলিশ খেলা চলছিলো ,ছোট ছোট কাগজে লেখা হয়েছিলো চোর -2000, পুলিশ -3000, ডাকাত -4000 ইত্যাদি ,খেলা হয়ে যাবার পরে ওর পিসতুতো দাদা কাগজ গুলো প্লেন বানিয়ে উড়িয়ে দিলো ,চোর লেখা কাগজটা রায়কাকুর বারান্দায় পড়েছে তাহলে ,কিন্ত এখন সত্যি কথা বললেও কেউ কি বিশ্বাস করবে ?থাক বাবা ,চেপে যাওয়াই ভালো l

  বিধ্বস্ত বাবা পড়ার টেবিলে এসে বসলেন , পড়ানোর মুড টুড পুরো গায়েব ,আবার কলিং বেল বাজলো ,আবার রায় কাকু ?জিনাই ভাবে এবার পেট ব্যথা বলে বিছানায় শুয়ে পড়াই ভালো ,আর রসগোল্লা তো বেশী খাওয়া উচিত নয় ,যদি কিছুটা বেঁচে থাকে মা কি দু একটা দেবে না ? দৌড়ে পালাতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে সে ,মা দরজ খোলার পরে দেখে একজন অচেনা লোক হাতে একটা বড় ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ,আর সেই ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে ওটা কী দেখা যাচ্ছে ?একটা ছোট্ট কুকুরছানা না ?বাবা একগাল হেসে বলেন 'ওহ্ হো ,ওই দু হাজার টাকা দিয়েই তো অ্যাডভান্স করে এসেছিলাম ,ভুলে গেলাম কেমন করে বলতো !'
   
    ..........................................................................