Friday, 1 December 2017

পিকনিক পিকনিক


             

          বিকেলবেলা এখন ওদের খেলার সময়,  কিন্তু     দেখা যাচ্ছে   বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছে  রাজু , পাশে বসে বুবলু একমনে নখ খেয়ে যাচ্ছে , আর  সামনের খেলার মাঠ , একদিকে হেলে পড়া অশ্বত্থ গাছ , ভুলো কুকুরের তিনটে সাদা লাল ছানাপোনার দুষ্টুমি , নীল ঘাসফুল , হলুদ সবুজে মেশানো প্রজাপতির দিকে দুখী দুখী মুখে তাকিয়ে  আছে  পুটকি , ঝুপুর , ন্যাড়া আর রুপাই l সামনে এক খাবলা তেঁতুলের আচার শূন্য দৃষ্টি মেলে অসহায় মুখে প্লাস্টিকের টুকরোয় লেপ্টে আছে , কেউ মুখে তুলছে না , ভাবা যায় ! ! !
           
            এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের কারণ খুঁজতে গেলে চলে যেতে হবে আজ দুপুরে এদের পিকনিকের মেনুতে , যেখানে ছিল . . . . . . . না থাক , প্রথম থেকেই শোনা যাক l

            ধুয়োটা প্রথম তুলেছিল রাজুই , ছোটদের পিকনিক , ' কেন , আমরা কিচ্ছুটি পারি না নাকি ? বড়দের পিকনিকে কোন কথাটা শোনা হয় আমাদের ? আমরা কি মেনু ঠিক করি , নাকি কোথায় যাওয়া হবে কেউ আমাদের জিগ্গেস করে ? আর কতদিন পরাধীন থাকবো বল তোরা ?'
' হ্যাঁ , ঠিক ঠিক , কিন্তু কী করে পিকনিক করবি ? টাকাপয়সা কোথায় পাব আমরা ? ' ভীতু গলায় করা  ঝুপুরের প্রস্নটা প্রায় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় রাজু , 'আরে সিম্পল ব্যাপার , টেনশন নিচ্ছিস কেন ? সবাই নিজের বাড়ি থেকে চাল ডাল ডিম ফিম নিয়ে আসবো , দুপুরবেলা বাবা অফিসে থাকবে , মা কে ম্যানেজ করে , আরে বাবা সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে , দেখ না '
' সব তো বলে যাচ্ছিস , রান্নাটা করবে কে ? ' গম্ভীর গলায় বলে ন্যাড়া , একটু  থতমত খেয়ে রাজু বলে ' আমরা পারব না ? ' ' হ্যাঁ , কোনওদিন এক কাপ চা করেছিস ? ' ন্যাড়ার ঠান্ডা গলার স্বরে একদম মিইয়ে যায়  রাজু l
 
            শেষ পর্যন্ত্য চায়ের দোকানের হারুদার প্রায় হাতে পায়ে ধরে রাজী করানো হয় শুধু খিচুড়ি আর ডিমভাজা করে দেওয়ার জন্য , ' তাড়াতাড়ি চাল টাল গুলো এনে দিয়ো , নইলে আমার বিকেলের চপ ঘুগনি রান্নায় দেরী হয়ে যাবে , খদ্দের এসে ফিরে গেলে কিন্ত খুব খারাপ হয়ে যাবে '

            সব ঠিকঠাক হয়ে গেল , ঝুপুর আর রাজু আনবে ডিম ,( রাজুদের পাশের একটা বাড়ীতে পোল্ট্রি আছে  , ঝুপুর বাড়ি থেকেই আনবে , ) রুপাই আনবে তেল আর আদা , পেঁয়াজ,  রসুন , নুন , হলুদ ,  গরমমশলা ইত্যাদি ( হারুদা লিস্ট করে দিয়েছে  ) আর ডাল আনবে ন্যাড়া , চাল আনবে বুবলু আর পুটকি  দু ' জনে মিলে l আসলে প্রায় সবটাই তো ম্যানেজের ওপর দিয়ে চালাতে হবে , পরাধীন যে , পকেট গড়ের মাঠ , সম্মিলিত দীর্ঘঃশ্বাসে ভুলো কুকুরটা ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল l

           দুপুরবেলা ,  দোকানের সামনে হারুদা রাগ রাগ মুখে পায়চারী করে বেড়াচ্ছে ,  একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে 230 গ্রাম চাল নিয়ে ( হারুদার হিসেবে  ) বুবলু প্রাণপণে নখ খেয়ে চলেছে , (এটা ওর মুদ্রাদোষ , আনন্দেও খায় , দুঃখেও খায় ), লুকিয়ে নিতে গিয়ে এর বেশী আর আনতে পারে নি  ,  ওদিকে দুটো হোমিওপ্যাথিক শিশিতে নুন হলুদ , একটা রুগী পেঁয়াজ , চারটে শুকনো কাঁচা লঙ্কা বা কাঁচা শুকনো লঙ্কা  নিয়ে দোকানের সামনের বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছে রুপাই , তেল আনতে না পারায় মরমে মরে আছে প্রায় , ন্যাড়া যদিও ডাল নিয়ে পৌঁছেছে তবে তার  প্যাকেট থেকে বেরিয়েছে বিঊলির ডাল , হারুদার প্রবল দাঁত কিড়মিড়ের সামনে কিছু বলতেই পারছে না , দলবলের সামনে আর প্রেস্টিজ বলে কিছুই রইলো না তার  l 

             ' নাঃ , তোদের কথায় রাজি হয়েই ভুল করেছি , এইসব দিয়ে কী রান্না করবো ? বলিস তো আমার মাথাটা কেটেকুটে উনুনে বসিয়ে দিই '

            ' রাগ কোরো না হারুদা , এই তো পুটকি আরেকটু চাল নিয়ে এক্ষুনি আসবে , রাজুরাও এসে যাবে ডিম নিয়ে , কতক্ষণ আর লাগবে তোমার ? ওই ডাল দিয়েই খিচুড়ি বসিয়ে দেবে , তোমার রান্না যা সুন্দর , যা করবে তাই ভালো হবে '

             এত্ত প্রশংসাতেও কোনও কাজ হলো না , খ্যাঁক খ্যাঁক করে দাঁত ফাত খিঁচিয়ে উঠে বললো '       হ্যাঁ দাদা দিদিরা , ওই যেসব বস্তু এনেছো একসঙ্গেই মেখে উনুনে বসিয়ে দিচ্ছি , সোনামুখে খেয়ো এখন '

           পুটকি এল ভগ্নদূতের মতো , রান্নাঘর থেকে চাল বের করতে গিয়ে মায়ের কানমলা খেয়ে পালিয়ে এসেছে , এই পর্যন্ত্য শুনেই হারুদা পায়চারী থামিয়ে ভয়ংকর মুখে এগিয়ে এল ডাল আর মশলার দিকে , এই রে , দিলো বোধহয় সব ছুড়ে ফেলে . . . . . . .

            ভাগ্যিস রাজু আর ঝুপুর দু ' জনে মিলে চারটে ডিম নিয়ে এসেছিল , আর বুদ্ধি করে খিচুড়ির সঙ্গে খাবার জন্য তেঁতুলের আচার , তাই তো সব্বাই পেট ভরে খেল ,  সত্যি , পাউরুটি দিয়ে বিঊলি ডাল আর ডিমভাজা যে খেতে এত ভালো লাগে কে জানত , শুধু খাওয়ার মাঝখানে ঝুপুর ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো , ওর কী বাড়িতে সেদিন রান্না হওয়া পাবদা মাছের ঝালের কথা মনে পড়ে গেল ? কে জানে . . . . . . . . . .

No comments:

Post a Comment