'কী যে তোরা আজকাল ফুটবল খেলা দেখিস,এতো নিম্নমানের হয় এখন খেলা, কেমন করে লোকে দেখে কে জানে '
গালে হাত দিয়ে বসেছিলো ওরা, তকাই, মুন্নি, পিকলু, শান্তু আর মিঠি, মন টন বেজায় খারাপ, এত্ত কষ্টে সৃষ্টে বাবার আর মেজকার কাছ থেকে টাকা জোগাড় করে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙানো হয়েছে ছাদে, (বাড়ীর মধ্যে প্রতিবারই দুটো দল হয়ে যায় এই বিস্বকাপের সময় ) তা দুটো দলের খেলাই এখনো পর্যন্ত পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়। মেসি পেনাল্টি মিস করবার পরে পিকলু,তকাই আর শান্তু খুব হেসেছিলো, ব্রাজিলের ড্র দেখে তারা পুরো চুপ করে গেছে। বাড়ীতে শোকের আবহাওয়া বিরাজমান, ছোটদের, মানে একদমই বাচ্চাদের খেলাধূলোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে শুধু। এর মধ্যে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়ার মতো কথাটা বলে ছোটদাদু মিটমিট করে হাসতে শুরু করেছেন।
শান্তু রেগে গেলে তুতলে যায়, ' বি- ই বি -ই শ্ব কা- আ প- নি -ই ম্ন মা -নের খে -লা আ!!! তবে উ উ- চ্চ মা -আ- নে এ র খে -এ -লা কো -ও -ন টা শু -উ -নি? '
এইখানে একটু ছোটদাদুর পরিচয় দেওয়া যাক, ওদের দাদুর ছোটভাই, পঁচাশীর কাছাকাছি বয়স, বিয়ে টিয়ে করেন নি, রিটায়ার করে এখন সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। প্রচুর গল্পের স্টক, দেশবিদেশের নানান অভিজ্ঞতা, যখন আসেন সবাইকে মাতিয়ে রাখেন, তকাইরা পছন্দই করে ছোটদাদুকে, কিন্তু আজ একে মুড খারাপ,তার ওপর বিশ্বকাপকে নিম্নমানের খেলা বললে গায়ে লাগবে না?
ছোটদাদু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন 'তা রাগ তোদের হতেই পারে, তবে আমার কাছে তোদের এই মেসি,নেইমার, রোনাল্ডোরা সব একেবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু,একটু চোট লাগলো কি লাগলো না,মাঠের মধ্যে শুয়ে কাতরাতে শুরু করলো,আর আমাদের গ্রামের গোপালদা? তার বেস্ট খেলা দেখেছিলাম, জীবনকে বাজি রেখে, রক্তে সারা গা ভেসে যাচ্ছে, তবু বল নিয়ে সারা মাঠে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, শুনবি নাকি সেই ঘটনার কথা? '
রান্নাঘর থেকে বেগুনী,আলুর চপ এসে গেল, ছোটদাদু এলে তেলেভাজা খাবারদাবার একটু বেশীই তৈরী হয়, একটা পুরুষ্টু দেখে বেগুনীতে কামড় দিয়ে ছোটদাদু বলতে শুরু করলেন।
' আমাদের সময় বুঝলি, বিভিন্ন গ্রামের আলাদা ফুটবল দল ছিলো, বেশ মজার দল,দলে সাতজন করে প্লেয়ার থাকতো, কারোর হাইট চার ফুট দশ ইঞ্চির বেশী হওয়া চলতো না, তাহলেই তুমি টিম থেকে আউট। দলগুলোর নাম ছিলো বেশ মজার, সেভেন বুলেটস, সাত বন্ধু,সেভেন স্টার এইসব, আমাদের পলাশপুর গ্রামের দলের নাম ছিলো সপ্তরথী, জগাদা ছিলো কোচ, আর গ্রামের বিশিষ্ট ভদ্রলোকেরা যেমন হারাধনকাকা, আমার বাবা, নিতাইজেঠু, ভোলাকাকা,আরও কয়েকজন ছিলেন দলটার পরামর্শদাতা, এঁরা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন সপ্তরথীকে।প্রতি বছরের আষাঢ়মাসে একটা টুর্নামেন্ট হতো,বিভিন্ন গ্রামের দল অংশ নিতো তাতে, যে দল জিততো, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো' ত্রিভূবন চৌধুরী শিল্ড '। এই শিল্ড নিয়ে আশেপাশের গ্রামের দলগুলোর মধ্যে দারুণ রেষারেষি চলতো, একবার সেভেন বুলেটস জিতে যায় তো একবার সাতগ্রাম জেতে, তবে গত তিন চার বছর ধরে কিন্তু জিতে আসছে সপ্তরথী, ওই গোপালদার জন্য।
গোপালদা,পলাশপুর গ্রামে ছিলো ওর মামাবাড়ী,খুব ছোটবেলায় বাবা মারা যাবার পর ওর মা শ্বশুরবাড়ীতে থাকতে না পেরে এখানে চলে আসে।খুব কষ্টের জীবন ছিলো মা আর ছেলের,ওর মা লোকের বাড়ী মুড়ি ভেজে, ধান ভেনে, চিঁড়ে কুটে, আর গোপালদা একটা দোকানে ফাইফরমাশ খেটে পেট চালাতো।বস্তা বস্তা জিনিষপত্র বয়ে আনতো হাটের দিনে গোপালদা, তারপর বাড়ী এসে সংসারের কাজে মা কে সাহায্য করে খেলার মাঠে চলে যেতো। সন্ধ্যেবেলা পড়া বুঝে নিতে যেতো হারাধনকাকার কাছে। সবাই ভালোবাসতো ওকে, শান্ত ভদ্র ছেলে,চেহারা ছিলো ছোট্টখাট্টো, পেশীবহুল, অনেকটা তোদের ওই মারাদোনার মতো ( এইখানে মিঠি উশখুশ করছে বুঝে পিকলু সবার অলক্ষ্যে চিমটি কেটে চুপ করিয়ে দিলো,গল্পটা ইন্টারেস্টিং হবে মনে হচ্ছে, এখন কেউ বিরক্ত করে?) কয়েকবছর ধরে চার ফুট পাঁচেতেই আটকে আছে, ওর হাইট যাতে আর না বাড়ে, তার জন্য প্রতিবছর জগাদা মন্দিরে পুজো দিতো, আমরা সবাই প্রসাদ পেতাম,একজন পার্মানেন্ট প্লেয়ার হয়ে গিয়েছিলো সপ্তরথীর, কারণ অন্যরা হাইট বেড়ে গিয়ে খেলা ছেড়ে দিতো, জাগাদার পরিশ্রম পুরো জলে। তা আমি তখন ক্লাস টু বা থ্রি তে পড়ি, ঠিক মনে নেই, সেইবছর গোপালদাকে নিয়ে খুব গোলমাল শুরু হলো। কী রে, মুখে যে ফেনা উঠে গেলো, আরেক রাউন্ড চা আর তেলেভাজা বলে দে তো। '
বাড়ীর রান্নাঘরের সুপারভাইজার রামুদা গজগজ করতে করতে একথালা পেঁয়াজী ভেজে দিয়ে গেছে, ফুঁ দিয়ে একটায় জব্বর কামড় দিয়ে ছোটদাদু আবার শুরু করলেন, ' পলাশপুরের দু তিনটে গ্রাম পরেই ছিলো নিঝুমডাঙা, তাদের দলের নাম ছিলো সেভেন ফ্রেন্ডস, বেশ ভালো শক্তিশালী দল, সপ্তরথীর সংগে সমানে সমানে টক্কর দিতো, তবে গত দু বছর ওরা আমাদের সাথে ফাইনালে হেরে যায়, এইবার নাকি ওরা আমাদের হারাবেই বলে পণ করেছে। এই নিঝুমডাঙাতেই ছিলো গোপালদার নিজেদের বাড়ী, মানে পৈত্রিক বাড়ী আর কী, সেই গ্রামের বাড়ীর কারো সংগে ওর কোনও যোগাযোগ ছিলো না, ওর কাকা জ্যাঠারা মা আর ছেলেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো সম্পত্তির ভাগ দেবে না বলে। তা সেই নিঝুমডাঙার জমিদার হঠাত্ খুব বাড়াবাড়ি শুরু করলেন, কী ব্যাপার? না গোপালদাকে ওঁর গ্রামের টিম মানে সেভেন ফ্রেন্ডস এর হয়ে খেলতে হবে, মামাবাড়ীর টিমে খেলা চলবে না। প্রথমে তিনি লোক পাঠাতে শুরু করলেন, বিভিন্ন প্রলোভন দেখানো শুরু হলো,টাকাপয়সা, নতুন বাড়ী,ভালো চাকরীর সুযোগ, কলকাতার টিমে খেলার বন্দোবস্ত করে দেওয়া আরও কত কী। গোপালদা প্রথমেই বলে দিয়েছিলো সে পলাশপুরের হয়েই খেলবে, এই গ্রাম তাকে ছোটবেলা থেকে আপদে বিপদে আগলে রেখেছে, বেইমানি সে করতে পারবে না।
আক্রমণের ধরন পালটে গেলো বুঝলি?হুমকি, শাসানি, প্রানহানির ভয় দেখানো,সব শুরু হয়ে গেলো।বিভিন্ন লোক পাঠিয়ে গোপালদাকে দুর্বল করে দেবার চেষ্টা সবসময় প্রতিহত করতো আমাদের গ্রামের লোক, জগাদা তো ওই লোকগুলোকে মারতে তাড়া করেছিলো একবার, কোনওরকমে তারা পালিয়ে বাঁচে। হারাধনকাকা, ভোলাজেঠু থানায় গিয়ে নিঝুমডাঙার জমিদারের নামে নালিশও করে এলেন, যদিও প্রবল প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করা অত সহজ নয়। গ্রামের বড় ছোট নির্বিশেষে গোপালদার পাশে দাঁড়িয়েছিলো। আমাদের মানে ছোটদের কাজ ছিলো গোপালদার বাড়ীতে কেউ এলেই বড়দের খবর দেওয়া, নাওয়াখাওয়া ভুলে পাহারা দিতাম আমরা। বাবা অনেকবার বলেছিলেন মা কে নিয়ে গোপালদাকে আমাদের বাড়ীতে এসে থাকতে, কিন্তু মৃদু হেসে গোপালদা বলেছে চিন্তা না করতে, ও নাকি সব সামলে নেবে।
ইতিমধ্যে টুর্নামেন্ট এসে গেলো, জোরদার প্র্যাকটিস শুরু হয়ে গেলো। জগাদাকে প্রায় সারা দিনরাতই মাঠের চারপাশে দেখা যায়, দিনের অনেকটাই কাটে দলের ছেলেদের নিয়ে ফুটবল পিটিয়ে, বেশীরভাগ সময় অবশ্য গোপালদাকে নিয়েই কাটায় জগাদা। সেও বাধ্য ছাত্রের মতো
জগাদার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।
লীগের ম্যাচ শেষ হয়ে নক আউট শুরু হলো, সপ্তরথী দুর্ধর্ষ খেলে একটার পর একটা ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠলো। বিপক্ষে কে জানিস? নিঝুমডাঙার সেভেন ফ্রেন্ডস। আর ফাইনালের ঠিক দু'দিন আগে গোপালদা নিখোঁজ হয়ে গেলো।
আমাদের গ্রামের লোকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো, থানায় গিয়ে প্রায় হত্যে দিয়ে পড়লেন হারাধনকাকা, সুবলজেঠুরা। পুলিশ এলো, জিজ্ঞাসাবাদ করে রায় দিলো গ্রামের লোকের অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষের চাপ সহ্য করতে না পেরে নাকি গোপালদা পালিয়ে কাশী চলে গেছে। আসলে পুলিশ ওই নিঝুমডাঙার জমিদারের বিরুদ্ধে যেতে সাহস পায় নি।
হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগলো সবাই গোপালদাকে। ওকে ছাড়া টিমকে নামিয়ে কোনও লাভ নেই, লাস্ট অবধি ওয়াক ওভার না দিতে হয়। ওর মা কেঁদে কেঁদে শয্যাগত, সবার মনে একটাই চিন্তা, খেলার যা ইচ্ছে হোক, গোপালদার কোনও ক্ষতি যেন না হয়। দেখতে দেখতে খেলার দিন এসে গেলো, বিকল্প হিসেবে নান্টুকে তৈরি করেছে জগাদা, একদমই সাদামাটা খেলে ছেলেটা , গোপালদার মতো পায়ের কাজ সে কোথায় পাবে?জগাদা বলে গোপালদা যেন গোলের গন্ধ পায়, ঠিক যেখান থেকে বলে পা ঠেকালে গোল হবেই, নিমেষের মধ্যে সেখানে পৌঁছে যায়। অত ভালো স্ট্রাইকার আজ অবধি চোখে পড়লো না এইদেশে।
খেলা শুরু হলো, টিমের পতাকা,বেলুন, কাগজের শিকল নিয়ে আমরা মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছি, বাঁশী টাশী পকেটে আছে, দরকার পড়লেই বাজাবো। প্রচুর দর্শক খেলা দেখছে, একটু আগে বৃষ্টি হয়ে আকাশ এখন পরিষ্কার, মাঠের একধারে ঝকঝক করছে ত্রিভূবন চৌধুরী শিল্ড, যার জন্য এত মারপিট। পুরষ্কারদাতা হিসাবে মাঠে উপস্থিত সেই বদমাইশ জমিদার, মুখে আর হাসি ধরে না জানে তো আজ নিঝুমডাঙা জিতবেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের দল দু দুটো গোল খেয়ে গেলো, আসলে মনোবলটাই ভেঙে গেলে যা হয় আর কী, জগাদা মাঠের ধার থেকে বসে যাওয়া গলায় নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে, যা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। এমন সময় হঠাত গোপালদা এসে জগাদার পায়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়লো।জিজ্ঞাসা করে জানা গেলো জমিদারের লোকেরা ওকে নিয়ে গিয়ে গুম করে রেখেছিলো, দুদিন ধরে কিচ্ছু খেতেও দেয় নি, প্রচন্ড মেরেছে, বিশেষ করে পায়ে বেশী করে মেরেছে, আজ ওদের অন্যমনষ্কতার সুযোগ নিয়ে ও পালিয়ে এসেছে।
জগাদা, আমি খেলবো, আমার ব্যথা সেরে গেছে, আমি খেলবো জগাদা, কাকুতিমিনতি করতে লাগলো গোপালদা। পারবি তুই? এই এত মার খাওয়ার পরে? দেখ কিন্তু ভেবে, খেলার কথা ভাবিস না, এই বছরে না হয় সামনের বছর শিল্ড আমরা ঘরে তুলবোই। কে শোনে কার কথা জোর করে মাঠে নামলো সে।
খেলা এগিয়ে চললো নিজস্ব গতিতে, আমাদের দলের খেলোয়াড়রা গোপালদাকে ওই অবস্থায় খেলতে দেখে পূর্ণ উদ্যমে খেলায় প্রাণ ঢেলে দিলো। গোল শোধ হলো, কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছে, ম্যাচ ড্র হলেই তো টাইব্রেকার এর ঝামেলা , কী হবে কে জানে, এর মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটলো। হঠাত সবাই দেখে গোপালদার বুকের ডানদিকটা রক্তে লাল হয়ে গেলো,খেলার মধ্যেই কেউ ওর বুকে ছুরি মেরেছে।'খুন,খুন চিৎকার করে সবাই মাঠের মধ্যে দৌড়ে গেলো, কে করলো এমন ঘৃণ্য কাজ! মাঠের চারদিকে তখন হইচই, হট্টগোল।মাঠে পড়ে গিয়েছিলো গোপালদা, ওকে ধরাধরি করে মাঠের
বাইরে আনা হতেই তড়াক করে উঠে বসে বললো, কিচ্ছু হয়নি আমার, আমি আবার খেলবো।সবাই বাধা দিলো, কোনও লাভ হলো না, দলের পতাকা দিয়ে বুকের রক্তপড়া জায়গা বেঁধে নিয়ে মাঠে নেমে পড়লো গোপালদা। আমার চোখ চলে গিয়েছিলো ওই জমিদারের দিকে, কী মারাত্মক দৃষ্টি দেখেছিলাম তার, এখন ও মনে আছে সেই কথাটা।
খেলা শেষ হওয়ার ঠিক তিন মিনিট আগে জয়সূচক গোলটা করলো গোপালদা, তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়লো, তাই বলছিলাম, এইসব খেলা আমাকে দেখাতে আসিস না, গোপালদার খালি পায়ের কাজ আমার চোখে লেগে আছে, তোদের বিদেশী দামী দলের বুটপরা খেলা আমার ভালো লাগে না। '