Wednesday, 22 March 2017

বেলুনে নীলনদ পেরিয়ে


      
মাথার উপর নীল আকাশ রোদ্দুরের আর মেঘের চিঠি পাঠিয়ে হাতছানি দেয় "কী গো ,ঘরের কোণে  পড়ে থাকলে চলে ?চলো না কোথাও ঘুরে আসি ,পৃথিবীর কতো কোনায় কত্তো মণি মুক্তো ছড়ানো আছে ,কুড়িয়ে আনবে না ?"
            তো কী আর করা ,কাজের চাপ ,ছুটি কম এই সব কথা ভুলে গিয়ে চল ,চল চল ..........

            গত বছরের শেষ দিকে সৌভাগ্য হয়েছিল মিশর ভ্রমণের ,ইতিহাসের পাতায় পাতায় ঘুরতে ঘুরতে অজান্তেই কখন ফেরার সময় হলো ,গলায় চাপা কষ্ট নিয়ে ,মন কেমন করা এক সকালে গিজার বিখ্যাত পিরামিডদের  বাই বাই করে প্লেনে চেপে বসলাম l

           গল্পটা সেটা নয় , অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে ওখানে গিয়ে ,বিভিন্ন যানবাহনে চড়ার অভিজ্ঞতা ও , বাস ,ট্রেন ,ঘোড়ার গাড়ি ,বিলাসবহুল ক্রুজ ,ফেলুকা (এক ধরনের পাল তোলা নৌকো ),কিছুই প্রায় বাদ যায় নি ,তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে হট এয়ার বেলুন রাইড l সেই অভূতপূর্ব ,অনাস্বাদিত ,বক্ষে দুরুদুরু শিহরণ জাগানো ,থাক ,এত বিশেষণ ভূষিত হলে কষ্ট করে কেউ আর পড়বে না l
      
             নীল নদের উপর ক্রুজে করে ভেসে বেড়ানো হবে চারদিন ,দ্বিতীয় দিন ভোর চারটে ,ওয়েক আপ কল ,অবাধ্য চোখ দুটোকে শাসন করে লেপের তলা থেকে উঠে কর্তা মশাই  এবং দুই পুত্ররত্নদের ঘুম থেকে তোলার দুরূহ কাজ করে চট করে গায়ে তিন চারটে  শীতের পোষাক পরে বেরোনো তো  হল ,তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার l

          হাতে প্রাতঃরাশের প্যাকেট ,আমাদের ষোলজনের   দল চললো বেলুন অভিযানে ,ছোট স্টিমারে করে আমাদের নিয়ে আসা হলো নদের ওপারে ,ওখান থেকেই বেলুনের বন্দোবস্ত l উঁহু ,এখনও আমরা অনেকটাই দূরে ,এখান থেকে আবার ছোট গাড়ীতে চড়ে বেলুনের কাছাকাছি এসে পৌঁছলাম l

       ওরে বাবা রে !কী বিশাল কর্মকাণ্ড ! বেলুনের চেহারা দেখে আমার তো ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ ,থাক না কী দরকার এইসবের ,বলতে গিয়েও টুক করে গিলে নিলাম ,সবথেকে বেশী তো আমিই নেচেছিলাম ,বোঝ এখন ,নিজেকেই বকে দিয়ে চুপ করে দেখতে লাগলাম l

           বেলুনে হাওয়া ভরা হচ্ছে ,তারা যাতে আমাদের না নিয়েই আকাশে ঘুরতে বেরিয়ে না পরে ,তার জন্য লরির সাথে বাঁধা ,কিছুক্ষণ পরে চারটে সারি তে ভাগ করে দিলো আমাদের ,যেই ওরা স্টার্ট বলবে ,সঙ্গে সঙ্গে বেলুনের তলায় লাগানো ঝুড়ির চারদিক দিয়ে দৌড়ে উঠে পড়তে হবে আমাদের ,নইলে তুমি রইলে নীচে ,বেলুনের শোভা দেখবে ডিম সেদ্ধ খেতে খেতে .........

           একজন ফটোগ্রাফার সেই স্টিমার থেকেই আমাদের সবার ফটো তুলে যাচ্ছে ,বেলুন চড়ার নিয়ম শুনতে শুনতে আমরা ও তার কথামতো পোজ দিয়ে যাচ্ছি ,আসলে ওইদিকে আর কারো মন নেই ,সবার মাথায় তো একটাই চিন্তা খেলা করে যাচ্ছে ,কেন এলাম ,কেন এলাম ,এই হাত বাড়ানো যাবে না ,মাটিতে নামবার সময় উবু হয়ে বসে পড়তে হবে ,নইলে চোট লাগতে পারে ,দূর ছাই !

           ঝুড়িতে উঠবো কী ,তার আগেই আমাকে ওর মধ্যে প্রায় ছুড়ে ফেলে দিলো ,যদি উঠতে না পারি ,ও বাবা ,কতো টুকু জায়গা এর ভিতরে , কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি এর মধ্যেই আমরা অনেকটাই উঠে গেছি ,সদা হাস্যময় আমাদের বেলুন চালক জানালেন "ব্যস্ আর ভয় নেই ,এবার নীচে তাকিয়ে দেখুন ওই দেখা যায় রাজা রাণীর উপত্যকা ,ওই দেখুন নীলনদ " সত্যিই আর ভয় করছিলো না ,শুধু একটু ঠেলাঠেলি হচ্ছিল ঝুড়ির ভিতরে ,ওই ইয়ে মানে সবারই তো ইচ্ছে করে একটু ভালো জায়গায় দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখার বা ছবি তোলবার l

            নীচে আমরা পেরিয়ে এলাম এক আকাশ রোদ্দুরে গা ভেজানো ছোট ছোট পাহাড় ,যাদের অবস্থান এতো সুন্দর ,প্রাকৃতিক পিরামিড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তারা প্রাচীন যুগ থেকে ,ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে দেখলাম নীলনদের দুপাশে কিছুটা সবুজ ,তার বাইরে পড়ে থাকা বন্ধ্যা ভূমি ,দূরে সাহারা মরুভূমির ভয়াল ছায়া ,ছবি তোলা ও বিড়ম্বনা ,হাতের গ্লাভস খুলতে হচ্ছে ,নইলে ঠান্ডায় জমে যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা l

           একটু অন্যমনস্ক হয়েই পড়েছিলাম সবাই ,তারপরে একটা ভয় ক্রমশই দানা বাঁধতে শুরু করলো সবার মনে ,এ কী !বলেছিল বড়জোর চল্লিশ মিনিট লাগবে ,এ তো একঘন্টা পেরিয়ে গেলো ,নামাবে কোথায় আমাদের ? দেখি বেলুন চালকের হাসিতে একটু মেঘের ছায়া লেগেছে  l -এবার আবার আমাদের নতুন চিন্তা শুরু হলো ,"ও ওসমান ভাই ,সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে যাবে না তো ?"
--আরে না না ,আপনাদের তো কোনো চিন্তা নেই ,আমি আছি না ?"
          হ্যাঁ ,সে তো আছেন ই ,কিন্ত এই শীতের সকালে যদি নদীতে পড়ি ,তুলবে কে ,অ্যাঁ ?একে অতগুলো করে মোটা জামাকাপড় পরা ,পড়ব আর ডুববো l এর মধ্যেও কিন্তু ফটোগ্রাফারের কাজের কমতি নেই ,ঝুড়ির ধারে বিপজ্জনকভাবে বসে একমনে সব্বার ফটো তুলে যাচ্ছে , টুপ করে কখন পড়ে যাবে জলে তখন বুঝবে মজা .........

           ওসমান দেখি ফোনে কাকে কী সব বলছে ,মুখ টুখ শুকিয়ে এইটুকু ,এদিকে দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেলো ,
এই মনে হয় আমরা নামছি ,আবার দেখি কতটা উঠে গেলাম ,এরকম ভাবে চললে আর প্লেন লাগবে না ,এই বেলুনে চেপেই দেশে ফিরে যেতে পারবো ,ওমা !নামছি তো আমরা ,কিন্ত এটা কোথায় !নীচে অজস্র কাঁটা গাছ ,এ যে আবার উল্টো বিপত্তি ,নামবো কী করে ?"ধরে বসুন ,না না ,পুরো বসবেন না ,যেমন শিখিয়ে দিয়েছি ,সেইভাবে "
      
      স্কুলের নিল ডাউনের মতো পোজে  নিশ্বাস চেপে মুখ টুখ শিটকে বসে পড়লাম ,কিছুক্ষণ পরে মাঝারি একটা ঝাঁকুনি ,আমরা মাটিতে নেমে পড়েছি ,যুদ্ধ জয়ের হাসি ওসমানের মুখে l সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে তার সঙ্গীরা ,ক্রুজে পৌঁছে নিশ্বাস নিয়ে বাঁচলাম l

         ক্রুজে ফিরে শুনলাম আগের বছরে একটা বেলুন এই সংস্থার লোকদেরই নিয়ে ,খেজুর গাছের ডালে আটকে গিয়েছিলো ,মই আনিয়ে তাদের নামাতে হয় ,তাহলেই বুঝুন ,ভয়টা কী আমার এমনি এমনি ছিলো ?
           -------------------:::::::::::::::----------------------

Wednesday, 15 March 2017

গোয়া থেকে ফিরেও

অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল গোয়া বেড়াতে আসার ,ভাস্কো দা গামার স্মৃতি জড়ানো গোয়া ,যা সাড়ে চারশো বছর ধরে ছিল পর্তুগিজ কলোনী l

              প্রায় দুদিন ট্রেনে ঘোরাঘুরি করে পুণে শহরের নাকটুকু ছুঁয়ে সকালবেলা তো এসে পৌঁছনো গেলো  ,সরকারি অতিথিশালায় চাবি নিয়ে ঘর খুলেছি কি খুলিনি ,বলে এক্ষুণি বাস ছাড়বে ,যদি যেতে চাও তো বেরিয়ে পরো ,সাউথ গোয়া , আর কী ,দৌড়ে উঠে পড়লাম বাসে ......

          একটা জিনিস দেখেছি ,সূর্যদেবের অকৃপন কৃপা আমার উপর বর্ষিত হয় ,যে সিটেই বসি ,সারাক্ষণ রোদ্দুরে ভাজা হয়ে যাই ,উঠে অন্যদিকে বসলেও একটু পরেই তিনি উঁকি মারেন l যাহোক ,সে দুঃখের কথা আরেকদিন হবে l

            অনেককিছুই দেখলাম এই কয়েকদিনে , উত্তর দক্ষিণ গোয়ার কত মন্দির ,গির্জা ,অপূর্ব কারুকাজ করা , মন্দিরে কোনো পান্ডার জবরদস্তি নেই ,পুজো দিলে দাও ,না দিলেও কেউ অভিশাপের ভয় দেখাবে না ,আর গির্জার তো কথাই নেই ,শান্ত পরিবেশ দেখে মাঝেমাঝে মনে হয় ধর্মান্তরিত হলে কেমন হয় l

          সমুদ্র এখানে খুব সুন্দর ,নানা বিচের সৌন্দর্য্য নানারকম ,কেউ শান্ত থাকতেই ভালোবাসে ,কেউ বা  আবার বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে লোকজনকে ডাকাডাকি করছে ,পুঁথির মালা ,কাজু ,ছোট বড় স্মারক ,ট্যাটু করাতে চাও ?তাও পাবে l টেম্পোরারি অথবা পার্মানেন্ট ,শুধু নকশা পছন্দ করে বসে পড়া ,ব্যস্ ........

             রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন , কলকাতার মতো লাল রঙের ছাপ ছাপ নয় ,কারণ ওই জিনিসটি এখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ,কেউ লুকিয়ে খেলেও হাজতবাস অনিবার্য ,এমনকি সিগারেট ও ,হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন ,তবে ওটা একটু লুকিয়ে চুরিয়ে চলে l

           ডলফিনের লাফ দেখলাম স্পিডবোটে গিয়ে ,রিভার ক্রুজে মেতে উঠলাম গোয়ানিজ নাচগানের তালে , আর খাবারের কথা না বললেই নয় ,বেশ ভালো চাইনিজ পাওয়া যায় এখানে ,কলকাতার  লোকেদের কোনো অসুবিধা নেই ,তবে আমি তো সর্বভুক , মাটন ,চিকেন ,পর্ক ,হ্যাম ,বিফ ,সি ফুড ,অজানা অচেনা মাছ ,শাকসবজি কিছুতেই আপত্তি নেই ,গোয়ানিজ খাবার চেখে না দেখলে চলে ?আহা ,অপূর্ব !নারকেল দিয়ে কুচো চিংড়ির একটা তরকারি করেছিলো ,স্বাদ অনেকদিন মনে থাকবে l

             অনেক অনেক ভালোলাগা নিয়েই যাচ্ছি ,গোয়া যেমন তারুণ্যের শহর তেমন বৃদ্ধাবাস ও বটে ,সন্তানরা চলে গেছে পর্তুগালে ,হয়তো বেশী সুযোগ সুবিধা পাওয়ার আশায় ,আগের প্রজন্ম রয়ে গেছে এখানে ,এই দেশকেই চেনে তারা ,রঙিন পানীয় সামনে নিয়ে সস্তা রেস্তোরাঁয় বসে সুর করে গেয়ে ওঠে "ও মাই সুইট হার্ট " হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে ,সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে মনখারাপের টুকরো টাকরা ,হয়তো ...........