পুজো মানেই ছিলো একরাশ সিউলিফুলের গন্ধে নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ মিশে যাওয়া ,ছোটবেলায় ধৈর্য্য ধরতো না ,কখন হাতে আসবে রঙিন ফ্রক ,জুতো ,টিপ ,নেলপালিশ ,আরো কতো কী ,বন্ধুদের সাথে চলতো অলিখিত রেষারেষি ,"অ্যাই ,তোর কটা হলো রে এবার ?"
"জানিস তো ,আমার দাদু কী সুন্দর গোলাপী রঙের একটা মিডি পাঠিয়েছে ,এবার ওটা পরে অষ্টমী তে অঞ্জলি দেবো "
"আমার আবার গোলাপী রংটা একটুও ভালো লাগে না ,আমার নীল চুড়িদারটা দেখিস ,দিল্লী থেকে মাসী এনে দিয়েছে "
কতো পরিকল্পনা ,কতো খুনসুটি ,"অ্যাই রিঙ্কু ,মহালয়া শুনবি তো ?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ ,শুনবো না ?কী যে ভালো লাগে "
"ওই গানটা শুনতে দারুণ লাগে ,ওই যে বাজল তোমার আলোর বেণু "
"আমার ওই গানটা বেশী ভালো লাগে ,জাগো দুর্গা ,জাগো দশপ্রহরণধারিণী "
একপাশে চুপ করে বসে থাকে তিতান ,বড্ডো
ঘুমকাতুরে ও ,কোনোদিন আজ অবধি পুরো মহালয়া শুনতে পারেনি ,সব্বাই শোনে ,আলোচনা করে ,ও কিছু বলতে পারে না ,ভোরবেলা বাবা প্রতিবছর ওকে ডেকে দেন ,"অ্যাই তিতান ওঠ ,ওঠ ,মহালয়া শুনবি না ?শুরু হয়ে গেছে "
আঠা লাগানো চোখ ,অনেক দূর থেকে ভেসে আসে সুরেলা গলায় গান ,স্তোত্রপাঠ ,হালকা খুশীর আমেজ গায়ে মেখে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমের দেশে চলে যায় তিতান ........
সেই দিনগুলো আজ অনেক দূরে ,রিঙ্কু ,মৌটুসী আর ঝিলমদের সাথে কতোদিন দেখা হয় নি ,জানা হয়নি ওরা এখন কেমন করে পুজো কাটায় ,মহালয়া শোনে কিনা ছেলেমেয়ের সঙ্গে ,তবে তিতান এই দিনটা এলেই অদ্ভুত এক দোটানায় ভোগে ,এক সঙ্গে মিশে যায় অনেকটা সুখ ,অনেকটা দুঃখ .........
বাবা চলে গেলেন পুজোর কয়েকদিন আগে ,অসময়ে ,কঠিন অসুখটা কবে থেকে যে বাবাকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠছিল ,আগে বোঝা যায় নি ,যখন ধরা পড়লো ,তখন আর কিচ্ছু করার ছিলো না ,বাবার পারলৌকিক কাজের দিন পড়লো মহালয়ার দিনে ,বাড়ীতে রেডিও চলেনি ,কিন্ত ভোরবেলা সেই অদ্ভুত উদাত্ত কণ্ঠের সুর ভেসে এলো আকাশ বাতাস মাতিয়ে ,তিতান জেগেই ছিলো ,সেইদিন ও প্রথম শুনলো পুরো অনুষ্ঠান ,মনে হলো বাবা যেন মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন ,আর
মুচকি হেসে বলছেন "কী রে তিতান ,কেমন লাগলো , আর কে ঘুম থেকে তুলে দেবে এখন ?"
না বাবা ,ঘুম পায় না আর এখন আমার ,মহালয়ার সময় মনে হয় ওই তো তুমি দাঁড়িয়ে আছো ,হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে ,চলো আমরা একসাথে শুনি "বাজলো তোমার আলোর বেণু ".............
Monday, 18 September 2017
''দুখজাগানিয়া ''
Saturday, 16 September 2017
সেদিন সকাল থেকেই বাড়ীতে তুমুল অশান্তি ,বাবার মানিব্যাগ থেকে নাকি দু হাজার টাকার একটা নোট গায়েব , বাবা কাল রাত্তিরে অফিস থেকে ফিরে ড্রয়ারে রেখেছিলেন মানিব্যাগ ,আজ বাজার করতে যাবার সময় দেখেন এই অবস্থা l এখন তুমুল লড়াই চলছে মা আর বাবার মধ্যো l
'কাল দেখেছি ,আজ উধাও ! এটা কী বাড়ী না ম্যাজিকের স্টেজ ,অ্যাঁ ? '
'তোমার কাণ্ডকারখানা তুমিই দেখ ,আমার দেখে দেখে চোখ পচে গেছে ,নিশ্চয়ই কেউ তোমার কাছে চেয়েছিল ,দয়ার শরীর তোমার ,দিয়ে দিয়েছ ,আর এখন ভুলে গিয়ে টাকা টাকা করে লাফাচ্ছ '
' বাজে কথা বোলো না ,আমি মোটেই কিছু ভুলে যাই না ,জান আমি মাধ্যমিকে নাইনথ হয়েছিলাম ?'
' প্রতিদিনই তিরিশবার করে শুনি ,কী কী প্রাইজ পেয়েছিলে ,পরের কয়েকমাস তুমি শুধু অন্যের বাড়ী নেমন্তন্ন খেয়ে বেরিয়েছ , স্যারেরা কী কী বলেছিলেন ,সব স অ ব l '
কান খাড়া করে বসেছিল জিকো আর জিনা ,হয়ে গেল ,আজ আর কমলা রঙের মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া হবে না ,প্রতি রবিবার একটাই পাঁঠা কাটে ঝন্টুদা , একটু দেরী করে বাজার গেলেই ওই ফ্যাটফ্যাটে সাদা মুরগির টুকরো ব্যাগ থেকে নিরীহের মতো মুখ বাড়িয়ে থাকে ,নাঃ,আজ পুরো ভাত টা পোস্ত মেখে খেতে হবে বোধহয় l জিনা উসখুস করে 'অ্যাই দাদাই , চল না অন্তুদের ফ্ল্যাটে গিয়ে ক্যারাম খেলি , '
'তুই যা ,আমার এখন অনেক বড় কাজ মাথায় চেপে আছে l '
'কী বড় কাজ রে দাদা ?আজ তো রোববার ,স্যার আসবেন না তো '
'পড়াশোনা আবার কবে থেকে বড় কাজ হলো রে গাধা ? আমি এখন গোয়েন্দা ,বাবার টাকাটা কে নিয়েছে আমিই তদন্ত করে বার করবো ,এই সব কাজ পুঁচকে মেয়েদের দিয়ে হয় না '
বয়ে গেছে জিনাই এর ,তুই ই কর তদন্ত ,রোববারের সকালটা মাটি হতে দিতে একদমই চায় না ও ,অন্তুদের বাড়ীতে আবার ওর এক পিসতুতো দাদা এসেছে ,অনেকরকম খেলা জানে ,গুটিগুটি পায়ে ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে ওঠে জিনাই l
বাবার টাকা হারিয়ে যাওয়ার খবরটা সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ফলে আজ প্রচুর মানুষ খোঁজখবর নিতে জিকোদের বাড়ী এসেছেন ,তাই মিষ্টি আনতে আনতে হরণ কাকুর পায়ে এবং শরবত করতে করতে মায়ের হাতে ব্যথা হয়ে গেছে ,রাত্তিরে কী রান্নাবান্না হবে কে জানে l সামনের দোকানের রুটি আর রসগোল্লা ?হতে পারে ll
সন্ধ্যেবেলা , পড়ার টেবিল ,সারাদিন টাকা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত দুজন একসাথে ,একজন শিক্ষক এবং অন্যজন ছাত্রের ভূমিকায় , মাঝে মাঝে বাবার মনে হয় ওরা কিছুই পড়ছে না ,তখন প্রচন্ড মেজাজ গরম করে তিনি ওদের বইপত্র নিয়ে বসেন ,জিকো জিনাই প্রস্তুত হয়েই থাকে মার বকুনি খাবার জন্য ,কারণ ক্লাসে ভালো ছেলেমেয়ের সুনাম থাকা সত্বেও মাধ্যমিকের নবম স্থানাধিকারীকে সন্তুষ্ট করা প্রায় অসম্ভব l
'আকবরের বাবার নাম কি ?'
'অ্যাঁ ?আকবরের বাবা ?কে যেন ?ও হ্যাঁ ফেলুদা '
ঠ ক্ কা আ স করে একটা থাপ্পড় জিকোর গালে এসে গালটা রঙিন করে দিলো ,প্রমাদ গোনে জিনাই ,সারাদিন গোয়েন্দাগিরি করলে এইই হয় ,ওর এখন নিজের বাবার নাম মনে আছে কিনা কে জানে l হঠাত্ প্রচন্ড জোরে কলিং বেল বেজে উঠলো ,থামছেই না , কে রে বাবা ! দরজা খুলতেই গোঁ গোঁ করে প্রায় তেড়ে এলেন দোতলার রায়কাকু ,শুধু পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে চলে এসেছেন ,চোখদুটো টকটকে লাল
'কী ই ই !আমি চোর ? দুহাজার টাকা চুরি করেছি ?ছেলেমেয়েকে শিখিয়ে দেওয়া ? আমি মানহানির মামলা করবো , ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে যাব ,পুলিশে খবর দেবো ,আমার সাথে চালাকি ?অ্যাঁ ?'
বাবা আর মা প্রাণপণে বলে যাচ্ছেন' কী হয়েছে ?ও রায়দা কী হয়েছে ?জিকো জিনাই কি করেছে ?আপনি একবার শুধু বলুন , তারপর দেখছি ওদের '
'এটা কী ?অ্যাঁ ,এটা কী ?'
একটা কাগজ বাবার নাকের সামনে প্রবলভাবে নাড়াতে থাকেন রায় কাকু ,অনেক কষ্টে বাবা দেখেন ওতে লেখা আছে চোর -2000 ,বাবা বলেন ' কোথায় পেলেন এটা ?' রায় কাকু বলেন 'আবার ন্যাকামি হচ্ছে ? ওদের দিয়ে লিখিয়ে আমার বারান্দায় ছুড়ে ফেলেছেন ,আপনি জানেন না ?'দাঁড়ান ,আমার মাসতুতো শালার বোনপো বোম্বাগড় থানার ওসি ,আমি এক্ষুণি তাকে ফোন করছি ,মজাটা টের পাবেন l '
অনেক কষ্টে জিকোদের বাড়ীর সামনে থেকে চিৎকারে জড়ো হয়ে যাওয়া লোকজন রায় কাকুকে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হলো ,জিনাই একদমই চুপ ,ওটা তো অন্তুর হাতে লেখা ,আজ সকালে ওদের বাড়ীতে চোর পুলিশ খেলা চলছিলো ,ছোট ছোট কাগজে লেখা হয়েছিলো চোর -2000, পুলিশ -3000, ডাকাত -4000 ইত্যাদি ,খেলা হয়ে যাবার পরে ওর পিসতুতো দাদা কাগজ গুলো প্লেন বানিয়ে উড়িয়ে দিলো ,চোর লেখা কাগজটা রায়কাকুর বারান্দায় পড়েছে তাহলে ,কিন্ত এখন সত্যি কথা বললেও কেউ কি বিশ্বাস করবে ?থাক বাবা ,চেপে যাওয়াই ভালো l
বিধ্বস্ত বাবা পড়ার টেবিলে এসে বসলেন , পড়ানোর মুড টুড পুরো গায়েব ,আবার কলিং বেল বাজলো ,আবার রায় কাকু ?জিনাই ভাবে এবার পেট ব্যথা বলে বিছানায় শুয়ে পড়াই ভালো ,আর রসগোল্লা তো বেশী খাওয়া উচিত নয় ,যদি কিছুটা বেঁচে থাকে মা কি দু একটা দেবে না ? দৌড়ে পালাতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে সে ,মা দরজ খোলার পরে দেখে একজন অচেনা লোক হাতে একটা বড় ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ,আর সেই ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে ওটা কী দেখা যাচ্ছে ?একটা ছোট্ট কুকুরছানা না ?বাবা একগাল হেসে বলেন 'ওহ্ হো ,ওই দু হাজার টাকা দিয়েই তো অ্যাডভান্স করে এসেছিলাম ,ভুলে গেলাম কেমন করে বলতো !'
..........................................................................
Monday, 11 September 2017
সুকুমার রায় কে স্মরণ করে ,যাঁর অবদানে বাঙালীর রঙিন শৈশব ছিল :-
নিঝুম দুপুর পথ হারালে ,
রোদের খিদে ঝাঁপিয়ে আসে --
লুকোচুরি এদিক সেদিক ,
পেয়ারা ডালে ,আমবাগানে l
আবার যখন শীতের বিকেল
মনখারাপের আঁচল গায়ে ,
বেহিসেবী আলসেমিতে
রঙিন বইয়ে রসদ খোঁজে l
আস্ত মজার কারবারী সেই
আবোলতাবোল রাজার দেশে ,
হঠাৎ কখন পৌঁছে গেছি
পাগলা দাশুর ফরমায়েশে l
অচিন জ্ঞানের অবাক কথা
আজগুবি সব গল্প ছড়া ,
নিপুণ কত ব্যঙ্গ ছবি
কল্পনাতে জাগিয়ে সাড়া l
এতই ছিল যাবার তাড়া ?
আছো বুঝি মস্ত সুখে ?
তোমায় কাছে পেয়েই বুঝি
কষ্টই নেই মেঘ মুলুকে ?