জোর তর্ক জমে উঠেছে বাবিয়া আর চুমকির মধ্যে,এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, এই দুই মাসতুতো ভাইবোন দেখা হলেই প্রথমে ঝগড়া তারপর মারপিট করবেই , কয়েকদিনের ছোট বড় বলে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, অন্য তুতো ভাইবোনরা সামাল দিতে (মতান্তরে বাড়িয়ে দিতে) ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
আজকের টপিক হল ভূত আছে কী নেই, বাবিয়ার মতে খুব আছে, ওদের বাড়ীর থেকে একটু দূরের আমবাগানটা একদম গিজগিজ করছে ভূতে, আনেকদিন আগে গ্রামে ডাকাত পড়েছিল, তাদের সংগে লড়াই করতে গিয়ে কয়েকজন শহীদ হয়েছিলেন, চার পাঁচজন ডাকাত ও মারা গিয়েছিল, তাদের আত্মা এখন ও ঘুরে বেড়ায়, তবে কেউ রাত্তিরে ওই বাগানে গেলে একসাথে তাড়া করে ঘাড় মটকে দেয়। এই অবধি শুনে যেই চুমকি হি হি করে হেসেছে, অমনি চোখ মুখ লাল করে তেড়ে এসেছে বাবিয়া,
'দেখ চুমকি, কলকাতায় থাকিস তাই ভূত দেখিস নি কোনওদিন, তা বলে তারা নেই? গাধার মতো কথা বলিস না '
' আর তুই বুঝি রোজ ভূতেদের সাথে বসে চা বিস্কুট খাস '
' যা না, আজ রাত্তিরে ওই আমবাগানে এক চক্কর ঘুরে আয় না, দেখি তুই কেমন সাহসী '
কুহুদির বিয়েতে আজ অনেকদিন পরে সব ভাইবোন একসাথে হয়েছে, রান্নাঘর থেকে মুখরোচক খাবারদাবার সাপ্লাই হচ্ছে, আড্ডা, গল্পও চলছে দেদার, এর ওর পিছনে লাগা, চুলের মুঠি ধরে টান, গুম গুম করে ফিরতি ঘুসি, বিভিন্ন পরিকল্পনা, সবই চলছে নিয়মমাফিক, তার মধ্যে চুমকিকে এই ওপেন চ্যালেঞ্জ, অ্যাকসেপ্ট না করলে নিজের দলের কাছে মান থাকে কখনও? মুন্না, জিনি,বুকু কতো আশা নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, বুকের ভিতর মৃদু ভয়ের শিরশিরানি উপেক্ষা করে চুমকি বলে, 'ঠিক আছে, যা, ডান, দেখতে পেলে একটার নাকে দড়ি বেঁধে নিয়ে আসবো, কলকাতায় গিয়ে দোকান বাজার করতে শিখিয়ে দেবো, মায়ের খুব সুবিধে হবে '
মাসিমণির বাড়ী স্টেশন থেকে একটু দূরে, হেঁটেই যাওয়া যায়, পথে বাঁ দিকে পড়ে আমবাগানটা, ওইদিক দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছনো যায়, কিন্ত সন্ধ্যে হয়ে গেলে সবাই নাকি ডান দিকের পাকা রাস্তাটা ধরে আনেক ঘুরে স্টেশনে যায় তাতে যদি দু'একটা ট্রেন মিস ও হয় তা ও সই, সারাদিনের ফাঁকে ফাঁকে এই কথাগুলো চুমকির কানের সামনে বলে যাচ্ছিলো বাবিয়ার সাঙ্গপাঙ্গরা, জিকো, বুবলু আর মিঠাই, পাত্তা দিতে বয়েই গেছে চুমকির, আর ওইসব বেশী শোনাও উচিত নয়, অপপ্রচার যতো। কে নাকি বাগানে ঢুকেছিল, হসপিটাল যাওয়ার তাড়া ছিল তার, দেখে বাগানের মধ্যে দু 'দল লোক লাঠি খেলছে, ওকে দেখেই নাকি হা রে রে রে করে তেড়ে এসেছিলো, কোন ও রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে সে।
একটু আগে কুহুদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল, কান্নাকাটি করে মা, মামা,মাসী, মামীরা সব গাল ফাল ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে,আর চুপচাপ কালকের জন্য তত্ব গোছাচ্ছে, সারাক্ষণ ওদের ওপর সবকিছু নিয়ে খিটখিট করছে না, আজকেই সুযোগ, ঠিক হয়েছে সন্ধ্যেবেলা পেরিয়ে অন্ধকার হলেই চুমকি আমবাগানে ঢুকে ওখানে যে শহীদ বেদীটা আছে, তার উপর কিছু চিহ্ন রেখে আসবে, সকালে বাবিয়ারা সবাই মিলে যাবে (কী ভীতু রে বাবা, একা যেতে ও পারবে না) ওই চিহ্নটা দেখে এসে তবে মেনে নেবে যে চুমকি ওদের থেকে বেশী সাহসী।
চুমকি একদম রেডী, এইবার বেরবে, সংগে নিয়েছে একটা লাঠি, তার মাথায় লাল ওড়না বাঁধা, একসাথে দু'টো কাজ ই হবে, যারা মাটিতে লতিয়ে চলে, তাদের হাত থেকে বাঁচতে হবে তো নাকি? আর নিয়েছে একটা শক্তিশালী টর্চ। ও মা, মুন্নার চোখ ছলছল করছে কেন! চুমকিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বুকু আর জিনি একসুরে বলে ওঠে 'থাক না দিদিভাই, ছেড়ে দে, যা ইচ্ছে বলুক গে ওরা, এই অন্ধকারে একা একা ওই জংগলে যাস না তুই, আমাদের খুব ভয় করছে, ছোটমামা জানতে পারলে খুব বকবে কিন্ত , আর তোকে যদি, মানে সত্যিই যদি কেউ --মানে কেউ যদি ধরে? 'তুতলে যায় মুন্না।
ছেড়েই দেবে নাকি চুমকি ? কী ই বা দরকার এই অন্ধকারে ভূতের হাতে কানমলা খাবার? বিয়েবাড়ী এসেছে, খাবে দাবে, ঘুরে বেড়াবে, এই তো ভালো, না মানে হঠাৎ কেউ যদি তত্ব সাজাতে কোন ও দরকারে ওকে ডাকে? অসুবিধে হবে না তার? ভাবতে ভাবতেই দেখে বাবিয়া দলবল নিয়ে উঠোনের একপাশে এসে দাঁড়িয়েছে, মুখে সেই গায়ে জ্বালা ধরানো একপেশে হাসিটা, মুন্নার গালটা একটু টিপে দিয়ে রাস্তায় নামে চুমকি।
যাক, অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে, ওই যে শহীদবেদীটা দেখা যাচ্ছে, এখনও অবধি তো তেনাদের কাউকে দেখা টেখা যায় নি, এইবার ওড়না লাগানো লাঠিটা রেখে দিয়েই এক ছুট্টে বাড়ী।
বিপত্তি টা ঘটলো এর পরেই, যেই না ও লাঠিটা রাখতে গেছে, কে যেন বলে উঠলো ' বাঃ বাঃ বেশ বেশ 'প্রচন্ড চমকে উঠলো সে, এমন ভয় পেলো যে মনে হলো ওর হার্টটা এক্ষুণি লাফিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে, কোনও রকমে তাকিয়ে দেখে ওরে বাবা!! ওটা কী!! একটা কালো কুচকুচে ভূত ওর সামনে, মুখটায় আলো ঝকমক করছে, আর ভূতটা হিঁ হিঁ খিঁক খিঁক করে হেসেই চলেছে। একটুও দৌড়তে পারছে না চুমকি, পায়ে কোনো জোর নেই, চোখ টোখ বন্ধ করে রামায়ণের সব ভাইদের নাম আউড়ে যাচ্ছে, শুধু রামের নামে যদি কাজ না হয়, কে জানে। কিছুক্ষণ সময় কেটে যাবার পরে মনে হল, আরে, হাসিটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? মনে জোর এনে এক ঘুসি চালিয়ে দিলো ভূতটাকে, সেটা হঠাৎ নাকি গলা ছেড়ে এমনি গলায় বলে উঠলো,
'ও চুমকি দিদিমণি গো, মেরোনি গো, আমি গোপাল, তোমারে ভয় দেখাতে পাল্লে আইসকিরিম দেবে বলিছে বাবিয়াদাদা '
তাই এত চেনা লাগছিলো গলাটা, এ তো গোপাল, মাসিমণির বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করে আর টুকটাক ফাইফরমাশ খাটে, কী শয়তান দেখেছ বাবিয়াটা? চুমকিকে ভয় দেখানোর জন্য গোপালকে ভূত সাজিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ও আবার গায়ে একটা কালো চাদর জড়িয়ে চিবুকের তলায় একটা টর্চ জ্বালিয়ে ধরে আছে, তাই অতো ভয়ানক দেখতে লাগছিলো। ব্যস, আর যায় কোথায়, টানতে টানতে গোপালকে নিয়ে মাসিমণির বাড়ীতে এসে হাঁক পাড়ে চুমকি।
' কী রে বাবিয়া, কোথায় গেলি? চোর কোথাকার, তোর চ্যালা চামুন্ডাদের ডাক, তারা দেখুক তুই কেমন চোট্টামি করিস '
' আরে না না, ভূল বুঝলি চুমকি, আমার আসলে চিন্তা হচ্ছিলো, একা একা গেছিস, তাই গোপালকে পাঠিয়েছিলাম, অন্য উদ্দেশ্য ছিলো না, বিশ্বাস কর তুই ' লজ্জা লজ্জা মুখে সাফাই দেয় বাবিয়া।
জিনি,মুন্নারা আলো জ্বলা মুখে তাদের আইকনের দিকে তাকিয়ে আছে, জিকোরা মুখে বোকা বোকা হাসি মাখিয়ে চুপ করে আছে, এর থেকে সুখের সময় আর চুমকির কী আছে? তবুও সে হঠাৎ 'ওরে বাবা রে, ও মা গো,ও মাসিমণি ই ই, বাঁচাও ও ও' বলে চিৎকার করে, জিনি আর বাবিয়াকে ধাক্কা টাক্কা মেরে লাফ দিয়ে বাড়ীর মধ্যে ঢুকে গেলো, সব্বাই অবাক, কী দেখে এত্ত ভয় পেলো সে? জিকো ই দেখালো, একটা পুঁচকে আরশোলা উঠোনের মাঝখানে এসে ভ্যাবাচ্যাকা, খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, বেচারি কোনদিকে যাবে ঠিক করতে পারছে না।