Sunday, 27 November 2016

প্রেম এসেছিলো

শরতকালের  সকালগুলো  কত  অন্যরকম  ছিলো , নীল  আকাশে  বেশ  একটা  সব পেয়েছি  ভাব  , ঘাস ভেজানো  শিশিরকণা  মাঝে মাঝে  ঝলসে  উঠতো  সূর্য্যের  আলোয় ,পাশের  বাড়ীর  কাকিমার  নাকছাবির  মতো ,শিউলি গাছের  তলায়  সাদা হলুদের   আলপনা , পড়ার বইকে  সরিয়ে  দেওয়ার ষড়যন্ত্র  করতো .....
             তখন  সতের বছর বয়স ,চোখ  বুজলেই  সেই  ভীতু   মেয়েটাকে  দেখতে  পায় দিয়া ,যে  সাহস  করে  কোনও দিন  তার  প্রথম  ভাললাগার  কথা কাউকে  বলতে  পারেনি ,অন্য দিকেও  ভয়  ছিলো  নিশ্চয়ই ,তখন  যেন  একটা  ভয়ের  যুগই ছিলো ,বাবা  মায়েদের  সঙ্গে  এই রকম  বন্ধুর  মতো  সম্পর্কের  কথা  ভাবাই  যেতো  না ,দিয়া  কোনোদিন  বন্ধুদের  সাথে সিনেমা  যায়  নি ,ও  জানত  না  বন্ধুর  বাড়ী  গিয়ে  আড্ডা  দিতে  কেমন  লাগে lঅথচ  বাবা  মা  কি  এতোটাই  রাগী  ছিলেন ?বুকের মধ্যে  বাসা  ছিলো  নাম  না  জানা  ভয়টার ,কী  হবে  কেউ  জানতে  পারলে ? কথা  বলা  দূরে  থাক ,তাকিয়ে  দেখারও  সাহস  ছিলো  না , বাড়ীর  সামনে  একটা  বারান্দা  ছিলো ,দিনের  মধ্যে  দু  চারবার  যাতায়াত  করতো  সুজন  তার  সামনের  রাস্তাটা  দিয়ে ,কলেজ  যেতে  আসতে ,আর  জানত  যে  দিয়া  পাশের  জানলার  পর্দাটা একটুখানি  সরিয়ে দাঁড়িয়ে  আছে  যতক্ষণ  দেখা  যায় ,ছোটবোনের  চোখে  পড়লেই  সর্বনাশ ,  গোয়েন্দার  মতো  নজরদারি  চালাত  সেও  যাতে  তার  আদরের  দিদি  বিপদসীমায়  পা  না  বাড়ায় ......
           সেবার  পাড়ার  পুজোর  দশ বছর ,একটু  বড়  করে  পুজো  হবে  ,একটা  ফাংশন  হবে  ,বড়দের নাটক  হবে ,আরো  কতো কী ,দিয়ার  পরিচিতি  ছিলো  গান  ভালো  গায়  বলে ,কাকু  জেঠুরা  বাবাকে  রাজী  করালেন  ,রিহার্সাল  শুরু  হলো ,দিয়া যেতে  শুরু  করল,  সঙ্গে  হিয়া ,গোয়েন্দার  ভূমিকায় , বলা  বাহুল্য  বাড়ীর  পূর্ণসম্মতিক্রমে ,কিছু  হয়তো  আঁচ  করেছিলো  কেউ ,কড়া  নির্দেশ  ছিলো  কোনও ছেলের  সাথে  কথা  বলা  যাবে  না ,সুজন ও  ছিলো  গানের  দলে ,কিন্ত কথা  হতো  না ,মাথা  নিচু  করে  নিজের  অংশটুকু সেরে  চলে  আসত  দিয়া .......
                      সপ্তমীর  রাত্রে  অনুষ্ঠান ,মঞ্চে বসতে  হলো  সুজনের  থেকে  একটু  দূরে ,হিয়া  মঞ্চে নেই ,দিয়া গান  গাইবে কী ,বুকের  ভিতরে দুম  দুম করে  আওয়াজ হচ্ছে , সামনের  সারিতে  সার্চলাইটের  দৃষ্টি  নিয়ে  বসে  বাবা ,মা ,হিয়া ; বোকা  মেয়েটা  কোন ও  ফাঁদে  পা  না  দেয় ,গানের  শেষে  পর্দা  পড়ে  যায় ,আর দিয়ার  হাতে  চলে  আসে  এক  টুকরো  কাগজ ,কুট্টি  করে  ভাঁজ  করা ,কী  লেখা  তখন  কী  পড়ার  সময়  আছে !নতুন  শাড়ি সামলে  মঞ্চ  থেকে  নেমে  আসতেই বোনের  সামনে ,"কী  রে  ওটা  তোর  হাতে ?"এতো  তাড়াতাড়ি  কী  করে  এলো  ও  পিছন দিকটায়  কে  জানে ,তারপর  যা  হয,মা বাবার হাতে সেই টুকরো  চিঠি ,এবং  "অ্যাঁ !তলে তলে  এতো ! দাঁড়া  ওর  বাড়ীর  লোকদের  বলছি ,কেমন  করে  মানুষ  করছে  ছেলেকে ,যে  মেয়েদের  সাথে  অসভ্যতা  করবার  সাহস  পায়.....???
           সুজনকে  ডেকে  পাঠানো  হলো ,ওর  কাছে  বলা  হলো  যে  আর  কোনওদিন এরকম  করলে  বাড়ীতে  খবর  যাবে ,তারপরেও  কিছু  হলে  সোজা  পুলিশে ,বেচারা  মাথা  নিচু  করে  বকুনি  খেলো ,ছলছল  চোখে  চলেও  গেলো ,পরের  বছর  পাড়া  ছেড়ে  দিলো ,আর  কোনোদিন দেখা  হয়নি  দিয়ার  সাথে ........
          দিয়া  আজ ও  জানে  না  সুজন কী  লিখেছিলো ওই ঘামে  ভেজা  চিরকুটে ,দেখে নি  ওর  হাতের  লেখা  ......
         আজ ও  সেই  সপ্তমীর  সকাল ,আকাশ  বাতাস  একই  রকম স্বপ্ন  মাখানো , পূজাবার্ষিকী হাতে  নিয়ে  অলস  সময়  গুনছিল  দিয়া ,ঝড়ের  গতিতে  ঢুকে  এলো  বাবি ,"মা , বেরিয়ে  যাচ্ছি ,টাকা  দাও ,এতক্ষণে  বোধহয়  রাহুল  পৌঁছে  গেছে  আর  আমাকে  যা  তা  বলছে ,উঃ,শুনতে  পাচ্ছ  না  নাকি !"মুচকি  হাসে  দিয়া ,"দাঁড়া ,উঠতে  দে  আগে ,দিচ্ছি আর  রাহুলকে বলবি  একদিন  আসতে ,অনেকদিন  আসে নি ........"

Monday, 14 November 2016

"দোলাচল"

      গত কাল রাত্রে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে মিমি ,ও নাকি একটা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ,সামনে দুটো নৌকায় ওর দুজন মিস্ ,একজন গানের আর একজন অঙ্কের ,তাঁরা  দুজনে ই ওকে ডাকছেন "ও সুচন্দা ,তুমি আমার সাথে চলো ,আমি তোমায় খুব সুন্দর জায়গায় নিয়ে  যাবো ,সেখানে তুমি খুব ভালো থাকবে ......"মিমি একবার ভাবছে অঙ্কের নৌকায় যায় আবার ভাবছে না গানই ভালো ,ইতিমধ্যে নাকি দাদা গিয়ে বিনুনী ধরে টেনে তুলে দিয়েছে ,ফলতঃ ব্রেকফাস্ট টেবিলে মুখ ভার  করে বসে আছে মিমি .....
      
       দ্রুত হাতের কাজ সারছিলো কেয়া , মেয়ের
স্কুলের বাস এক্ষুনি এসে যাবে ,তার আগে টিফিন গোছানো ,ছেলে কলেজ যাবে তার প্রস্তুতি ,নিজের অফিসের জন্য রেডি হওয়া ,নিশ্বাস নেওয়ার ফুরসত থাকে না এই সময়ে ,"ওরে মিমি ,তাড়াতাড়ি রেডি হ ,বাস চলে গেলে আজ কিন্ত দাদা বাইকে করে দিয়ে আসতে পারবে না ,ওর টিউশনি আছে "
"যাব না আমি দাদার সাথে ,বাজে বিচ্ছিরি দাদা "

        উল্টো দিকের চেয়ারে বসে মিটমিট করে হাসছিল সায়ন ,আরও রাগাতে বলে ওঠে "তোকে কেউই নিতো না ,কিছুদূর গিয়েই ঝপাস করে নদীতে ফেলে দিতো বুঝলি ?ওই তো গান আর অঙ্কের ছিরি ,আমিই  বরং বাঁচালাম তোকে ,এর জন্য কোথায় ধন্যবাদ দিবি আমায় ,তা না "
"ও ও মা আ আ ,দেখো না ,আমি কিন্ত কিচ্ছু খাবো না আজকে ,ও বাবা ,বকছ না কেন দাদাকে ?

     কাগজ পড়তে পড়তে মুখ তোলে মলয় ,এই এক নেশা তার ,সকালবেলা ই  পুরো কাগজটা খুঁটিয়ে পড়া চাই ,এমনকি ব্যস্ততার মধ্যেও  ,অন্যমনস্ক ভাবে বলে "কেন ওর পিছনে লাগছিস ?এক্ষুনি কান্নাকাটি ,মারপিট সব শুরু হবে ,তখন তোকেই আবার রাগ ভাঙাতে হবে "
মিমির মনে হয় বাবা তো দাদা কে বকুনি দিলোই  না ,বরং ওকে কাঁদুনে ,মারকুটে কতো কী বলল ,সোজা গিয়ে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে সে ,"ওরে ছাড় ছাড় ,দেরী হয়ে যাচ্ছে ,ওমনি করে না সোনা মেয়ে আমার "সায়ন আবার ফুট কাটে "হ্যাঁ ,বিয়ের পর পকেটে করে মা কে নিয়ে যাস ,কিসুই তো করতে পারবি না ,বকুনি খেলে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দিবি "
    চটাস করে থাপ্পড় লাগায় কেয়া ছেলের কাঁধে "কীরে ,এইবেলা দেরী হচ্ছেনা তোর ?শুধু বোনের পিছনে লাগা ....."
   মলয় বলে "আহ্ ,মারছ কেন ?ভাইবোনেরা খুনসুটি করবে না ?"
"তাহলে তুমিই সামলাও তোমার আদরের ছেলেমেয়েদের ,তোমার আর কী ?দুপুরে ট্রেন ,এখন বসে মজা দেখছ ,আমায়  অফিস যেতে হবে না ?"
  ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে মলয় ,"তোমায় তো বলাই হয়নি ,একটু আগে অফিস থেকে ফোন এসেছে ,আমিও সায়নের সাথেই বেরোব,অফিস থেকে কয়েকটা জরুরী কাজ সেরে পেপারস কালেক্ট করে ওখান থেকেই ট্রেন ধরে নেবো "
"যাহ্ বাবা ,আগে বলবে তো ,আমি এখন অফিস যাবো না তোমার লাগেজ গোছাব?"
"কী করে আজ অফিস যাবে তুমি ?আজ সায়নের ঘরের এসি ইনস্টল করতে আসবে না ?প্লীজ কেয়া ,একটু সামলে দাও  আজ ,রাগ করো না "
      সঙ্গে সঙ্গে মিমি মায়ের কোমর ধরে ঝুলে পড়ে ,"হ্যাঁ মা ,প্লীজ থাকো ,আমি দুপুরে তোমার কাছে ভাত খাবো ,ঘুমাবো ,থাকো না মা "

     রিমোট কন্ট্রোল হাতে অলস ভাবে টিভির সামনে বসে ছিলো কেয়া ,আজ প্রচুর ঝামেলা গেছে সারাদিন ,এখনও গরম পড়ে নি তবু দুটো ঘরে এসি বসে গেলো ,মলয় একেবারে ছেলেমেয়ে অন্ত প্রাণ ,সত্যিই সুখী হয়েছে কেয়া ওকে পেয়ে ,শুধু একটা কালো অন্ধকার স্মৃতি ,দমবন্ধ পরিবেশ .......,না না ,মাথা ঝাঁকায় কেয়া ,কোন ও কিছু যেন ছায়া না ফেলে ওর এই রোদ্দুর মাখা সংসারে l

       পাশে মিমি ঘুমোচ্ছে ,সস্নেহে তাকায় তার দিকে ,সবাই বলে ওকে পুরো মায়ের মতো দেখতে ,হতে পারে ,তবে স্বভাব পুরো উল্টো l নিজের কথা মনে পড়ে যায় তার ,অনেক ছোটবেলায় মা মারা যাবার পরে বাবা আবার যখন বিয়ে করলেন ,সবাই বলেছিল মেয়েটার কপালে দুঃখ আছে l নতুন মায়ের নিক্তি মাপা কর্তব্যে আর শাষনে বেড়ে ওঠা কেয়া কখনও মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতে পারে নি ,গ্রাজুয়েশনের পরে এম এ পড়বার ইচ্ছেকে চাপা দিয়ে বিয়ে করতে হয়েছে সুদূর মফস্বলের বনেদী  পরিবারে ,যেখানে সারাদিন কেটে যেতো ঘরের কাজে ,মেয়েদের বেশী পড়াশোনা করা যেখানে সমালোচনার বস্তু ,যেখানে  কেউ কোনোদিন বুঝতে পারেনি এই ভীরু মেয়েটার বুকের মধ্যে জন্ম নিয়েছে ঘৃণা ,আর তাতে জলসেচন করে গেছে প্রতি রাত্রে ভালোবাসাহীন বিবাহিত জীবনের প্রাপ্য বুঝে নেওয়া l

      "অ্যাই টুসি ,আজকের কাগজটা নিয়ে আয় তো ,একটু চোখ বুলিয়ে নিই ,যা ঝামেলা গেলো আজ "কাজের  মেয়েটাকে ডাক দেয় কেয়া ,ময়দা মাখতে মাখতে উঠে আসে টুসি ,"ও মামী , কোথাও নেই গো ,আমি একটু আগেই খুঁজে দেখেছি "
"সে কী রে !কোথায় যাবে কাগজ ?"
"মনে হয় এসি লাগানোর লোকগুলো নিয়ে গেছে  জানো ?"
"হ্যাঁ ,তাদের তো আর কাজ নেই তাই কাগজ নিয়ে গেছে ,থাক ছেড়ে দে ,ময়দা মাখা হলো ?"
"এই  তো হয়ে এলো "
"হয়ে গেলে বলবি ,কিমার  পুর ভরে ফেলবো "
"আচ্ছা "
     ধূপগুড়ির বিখ্যাত ব্যবসায়ী অবনী সেনের স্ত্রী হয়ে আর কয়েক বছর থাকতে হলে কেয়া বোধহয় মরেই যেতো ,ওই ঘন অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আলো নিয়ে এলো অবনী সেনের মামাতো  ভাই মলয় ,কেয়ার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো সেই আলোর ছোঁয়ায় ,এক রাত্রে কেয়া আর এক বছরের সায়ন কে নিয়ে পিসির বাড়ী ছাড়ল মলয় ,তারপর অনেক বছর কেটে গেছে লড়াইয়ে ,ওদের ভালো রাখার জন্য চেষ্টার অন্ত নেই তার ,কেয়াও এম এ কমপ্লিট করে সরকারী চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে ,অনেক ভালো আছে সে এখন , তবু মাঝে মাঝে একটু দোলাচলে ভোগে কেয়া ,সত্যিই কী সায়নকে  অতটাই  ভালোবাসে মলয় ?মানুষ কী এতটাই স্বার্থশূণ্য হতে পারে ?কে জানে ...........

     মলয় ফোন করেছিলো একটু আগে ,ওদের ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে ,হঠাত্ বললো "কেয়া ,তোমার শরীর ঠিক আছে ?তুমি রাগ করো নি তো আমার ওপর ?"হেসে ফেলেছে কেয়া ,ও ,বাবুর তাহলে মন খারাপ হয়েছে ,কয়েকটা দিন সবাইকে ছেড়ে থাকতে হবে তো ,এতো ছেলেমানুষ আছে এখনও ......

     লাফাতে লাফাতে বাড়ী ঢোকে ছেলে "ও মা ,দারুণ খবর আছে ,দারুণ খবর ,দাঁড়াও আগে হাতমুখ ধুয়ে আসি ,তারপর বলছি ,ওকি !মিমি এখনও ঘুমোচ্ছে কেন ?অ্যাই ওঠ ওঠ ,আবার কিন্ত সেই দু নৌকায় পা রাখার স্বপ্ন দেখবি" আলতো হাতে বোনকে আদর করে বাথরুমের দিকে চলে যায় সায়ন l

      এক একটা কথা বুকের মধ্যে গিয়ে রক্ত ঝরায় ,সে কী নিজেও দু নৌকায় পা রাখেনি ?না না ,তা কেন হবে ,সে তো পরিপূর্ণ ভাবে এই  সংসারকেই  ভালবেসেছে ,অবনী সেন আর তার পরিবার কবেই মুছে গেছে তার মন থেকে .....কবেই .........

      "মা ,এই দেখো আমাদের ব্যান্ডের কী দারুণ রিভিউ বেরিয়েছে কাগজে ,একদম ছবি টবি দিয়ে ,ঝাক্কাস !তোমার ছেলেকে চিনতে পারছ তো ?এইবার বাবা আর কেমন করে বলবে যে আমি গান গাইতেই পারি না ?"

      হাসিমুখে ছেলের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখতে গিয়েই একটা খবরে চোখ আটকে যায় কেয়ার ,গত পঁচিশ তারিখে বিখ্যাত ব্যবসায়ী অবনী রায় পরলোক গমন করেছেন ,তাঁর আত্মার শান্তির জন্য আগামীকাল পারলৌকিক ক্রিয়ার আয়োজন করা হয়েছে অমুক মন্দিরে ,চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে যায় কেয়ার ,ও ,এইজন্যই কাগজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আজ ,কেয়ার অফিস বন্ধ হলো যাতে সে অফিসে কারো কাছে কাগজ পড়তে না পারে l
দোলাচলে কে ভুগছে তাহলে ?অত ব্যস্ত না হলে মলয় খেয়াল করতে পারত যে অবনী রায় মারা গেছেন ,সেন নয় ,ওকি ভেবেছিল এই খবর পেলে তক্ষুনি ছুটে চলে যাবে কেয়া ?হয়তো এভাবেই কাটবে তাদের নকল সংসারের দিনরাত্রি ,আইনত সে যে এখনো অবনী সেনের স্ত্রী ,হয়তো এভাবেই একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে সবকিছুই ,দীর্ঘশ্বাস চেপে জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে কেয়া বলে "বোনকে ঘুম থেকে তুলে ডাইনিং টেবিলে আয় ,আজ চিকেন কিমা দিয়ে পরোটা করেছি ,গরম গরম খাবি l
         ----:-:------:-:------:-:-----:-:-----:-:-----:-:----

Friday, 11 November 2016

অপূর্ণ ইচ্ছা

      অনেক জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে ,দেশে এবং বিদেশেও ,কিন্ত ছোট্টবেলা থেকে বাবার মুখে শুনে শুনে যে সুন্দর গ্রামটায়  বেড়াতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে ছিলো ,সেটা এখনও অপূর্ণই থেকে গেলো ,জানিনা কোনোদিন যেতে পারবো কিনা .......
       সেই গ্রামের কথা বলতে গেলেই বাবার চোখে একটা মন কেমন করা ছায়া ভাসত,"জানো বাবুন,কী সুন্দর ছিলো আমাদের গ্রাম ,স্কুল থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে দেখতাম সুদূর শীতের দেশ থেকে হাজার মাইল পেরিয়ে আসা পাখিরা উষ্ণ আশ্রয়ের খোঁজে ভি এর আকারে নিজেদের সাজিয়ে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ,নরম হাওয়া ভেসে বেড়াচ্ছে বিশাল দীঘি ,ধানক্ষেত ,পুকুর আর মাঠের ওপর দিয়ে ,কোজাগোরী পূর্ণিমার রাতে আমরা যখন অন্য বাড়ীতে লক্ষী পুজোর প্রসাদ খেতে যেতাম ,ধানক্ষেতে মা লক্ষীর নূপুরের শব্দ শোনা যেতো ,আমাদের গ্রামে কোনোদিন কারো সাথে ঝগড়া হতো না ,সবাই কী সুন্দর মিলেমিশে থাকতো "
         বাবার মুখে শুনে আমার জানা হয়ে গিয়েছিলো যে বাবার বাড়ীর সামনে ছিলো একটা মিষ্টি তেঁতুল গাছ ,অনেকে আসত তার বীজ নিয়ে যেতে ,বর্ষাকালে রান্নাঘর থেকে ঘরে আসতে  নৌকো লাগতো  ,একটা ঘরে সারা বছরের জন্য রেখে দেওয়া থাকতো  চিঁড়ে ,মুড়ি ,মুড়কি ,আচার ,আমসত্ত্ব ,নাড়ু ,মোয়া আরো কতো কী ,দরকার হলে মইতে উঠে নিয়ে আসা হতো l
          তারপর এলো দেশভাগ ,যার দগদগে ঘা এখনো শুকায় নি ঘরছাড়াদের মনে ,সেই দাঙ্গা ,ছিটকে এই পাড়ে এসে স্রোতের শেওলার মতো ভেসে বেড়ানো ,সেই অপাপবিদ্ধ কিশোর জানতেই পারলো না কেন তাদের বাড়ী ,প্রিয় গ্রাম ছেড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হলো ,আর কোনওদিন তো সে শুনতে পাবেনা নদীর জলে খ্যাপলা জাল ফেলার শব্দ ,দেখতে পাবে না তার হাতে পোঁতা আমগাছে কটা বাবুইয়ের বাসা তৈরী হলো .........
      বাবার খুব কষ্ট হতো ,আমি বুঝতে পারতাম ,মাঝে মধ্যেই আমার অঙ্ক খাতায় ছবি এঁকে বাবা দেখাতেন কোন পথ দিয়ে গেলে খেলার মাঠ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ী পৌঁছনো যেতো ,উঠোনের কোন দিকটায় বাড়ীর পিসিমা ,ঠাকুমারা   বড়ি দিতেন ,"বাপী ,তুমি আর যাও নি কেন ওখানে ?"অবাক আমার প্রশ্নের উত্তরে বাবা কষ্ট ভেজা চোখে মাথা নাড়তেন ,"না বাবুন,আমার নিজের গ্রামে যেতে হলে পাসপোর্ট ,ভিসা লাগবে ,এটা আমার সহ্য হবে না ,দেখি যদি কোনও দিন ..........."
         আরো অনেকের মতো বাবা ও বোধহয় ভেবেছিলেন আবার দুটো দেশ জুড়ে যাবে ,আবার ____
       আমার বাবা মৃত্যুশয্যায় শুয়েও দিন গুনতেন ,আমি মনে মনে ভেবেই রেখেছিলাম আমি একবার অন্তত যাবো সেই রূপকথা মেশানো গ্রামে ,বাংলাদেশের বরিশাল জেলার জলাবাড়ী তে ,যেখানে বাবা ,আমার পিতৃপুরুষ জন্মেছিলেন ,ধূলোকাদা মেখে বড় হয়েছেন ,সেখানে গিয়ে একবার দেখবো পুরনো গাছের বংশধরেরা আমায় চিনতে পারে কিনা ,বলে ওঠে কিনা "এসো এসো ,এতদিনে আসবার  সময় হলো ?"কতো লোক বাংলাদেশ বেড়াতে যায় ,ফিরে এলে তাদের কথা হাঁ করে শুনি আমি ,নেট সার্চ করে খালি ঘুরে বেড়াই বরিশালের গ্রামে গ্রামে ,খুঁজে নিতে চাই শিকড় ,কিন্ত আজও আমি যেতে পারিনি সেখানে ,হয়তো মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আমিও অপেক্ষায় থাকবো সাইবেরিয়া থেকে আসা পাখির দলের মতো আবার ফিরে যেতে আমার বাবা ,কাকা ,জ্যাঠার  জন্মভূমিতে ,অন্তত একটিবারের জন্যেও .............

Sunday, 6 November 2016

বন্ধু

ক্লাস  টু তে   পড়ি  যখন ,আমাদের  নিজেদের বাড়ী  হলো  বেহালায় ,তখন  1977,পরের  বছর সেই  বন্যা ,কোমর  সমান  জল  দাঁড়িয়ে গেলো রাস্তা ঘাট ,বাগান ,মাঠে ,কী  মজা  আমাদের ,বাড়ীর  সামনে  দিয়ে  মা শোল মাছ  তার  লাল  ছানাপোনাদের  নিয়ে  ভেসে  বেড়াচ্ছে ,স্কুল  বন্ধ ,অফিস বন্ধ ,কলাগাছ  দিয়ে  নৌকো বানিয়ে  সবাই  যাতায়াত  করছে ,ব্যস্ ,পুরনো  পাড়ার  বন্ধুদের  ছেড়ে আসার  যে  মনখারাপ টুকু  বেঁচে  ছিলো ,সেটা  এত মজা  পেয়ে  উধাও ......
        সেই  বাড়ীতে  আমার  অনেকটা  শৈশব ,পুরো  কিশোরী বেলা ,সামনের  বাগানে  যতো গাছ ,ফুল ,সবাই  আমার  বেড়ে  ওঠার  সঙ্গী ,আশেপাশের  বাড়িগুলোর  আনাচ কানাচ , বড় বড়  মাঠগুলো লুকোচুরি আর  ফড়িং  প্রজাপতি তে ভর্তি ,প্রথম  প্রেমে  পড়া এবং  প্রবল  বকুনি র  চোটে  প্রেমের  দফারফার  স্মৃতি মেশানো  সেই  বাড়ী ......
       বাবা  মা  অফিস  বেরিয়ে গেলে স্কুলের  ছুটি  থাকার সময়গুলো অঢেল  আনন্দ দিয়ে  ভরা থাকত ,কিশোরী বেলা  রোমান্টিকতায় ঘেরা  ,মনে  হতো  আমাকে কেন্দ্র  করেই  সব  আয়োজন ,এই গাছগুলো  আমার  ব্ন্ধু ,একটা  গন্ধরাজ  গাছ  ছিলো ,আমার  জন্মদিনে ফূলেফূলে  ছেয়ে  যেতো ,আসলে  ওটাই  তার  ফুল ফোটানোর  সময় ,কিন্ত  আমাকে  সেটা কে বোঝাবে l
          পরিস্থিতি  অন্যরকম হয়ে  গেলো  বাবা  চলে  যাবার পরে , বাড়ী  বিক্রির  সিদ্ধান্ত  নেওয়া  হলো ,আমরা  চলে  গেলাম  সল্টলেকে , কারণ বেহালায় আমাদের  কাছাকাছি  আত্মীয় স্বজন কেউ  ছিলো  না ,বাড়ীটা পড়ে  রইলো  অনাদরে  ,নতুন  বাসিন্দার  অপেক্ষায় ____
          কয়েক  মাস  কেটে  গেলো ,বিভিন্ন  কারণে  ,তারপর  একদিন  কাগজে  দেওয়া  বিজ্ঞাপনের  সুবাদে  সম্ভাব্য  ক্রেতাদের আসবার  অপেক্ষায়  আমরা  গেলাম  সেই  বাড়ীতে , তাকাতে  পারছিলাম  না ,এ কী  চেহারা  তার !বাগানের  সুখস্বপ্ন  ঢেকে গেছে  আগাছায়
দেওয়ালগুলো  থেকে ঝুরঝুর করে  খসে পড়ছে বালি ,বাড়ীটা যেন মৃত্যুর  প্রহর  গুনছে ...
           থাক ,ওরাই  দেখাক  ,আমি ততক্ষণ বরং  দেখি  ঘাসের  মধ্যে  ছোট্ট  নীল ফুলেরা  উঁকি  মারছে  কিনা ,লাল রঙের  রানী ফড়িং  এখনও  আসে  কিনা ,শিউলি গাছের শুঁয়োপোকারা কেমন আছে ,হঠাৎ চোখ  চলে গেলো  একদিকে ,সমুদ্রে  দিকহারা নাবিক যেমন বাতিঘরের  দিকে ছুটে যায় ,আমিও  গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়ালাম তার সামনে .......
        আজ আমার জন্মদিন ,কারো মনে  নেই  এই  বাড়ী দেখানোর  ঝামেলায় ,কেউ উইশ করেনি ,কিচ্ছু না ,একজন শুধু মনে  রেখেছে ,কতোদিন  সে জল  পায় নি ,শুকিয়ে  গেছে  অনাদরে ,তবু  একটা ডালে  আমার  জন্য  ফুটিয়ে  রেখেছে একটা সাদা  গন্ধরাজ ..........