অনেক জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে ,দেশে এবং বিদেশেও ,কিন্ত ছোট্টবেলা থেকে বাবার মুখে শুনে শুনে যে সুন্দর গ্রামটায় বেড়াতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে ছিলো ,সেটা এখনও অপূর্ণই থেকে গেলো ,জানিনা কোনোদিন যেতে পারবো কিনা .......
সেই গ্রামের কথা বলতে গেলেই বাবার চোখে একটা মন কেমন করা ছায়া ভাসত,"জানো বাবুন,কী সুন্দর ছিলো আমাদের গ্রাম ,স্কুল থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে দেখতাম সুদূর শীতের দেশ থেকে হাজার মাইল পেরিয়ে আসা পাখিরা উষ্ণ আশ্রয়ের খোঁজে ভি এর আকারে নিজেদের সাজিয়ে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ,নরম হাওয়া ভেসে বেড়াচ্ছে বিশাল দীঘি ,ধানক্ষেত ,পুকুর আর মাঠের ওপর দিয়ে ,কোজাগোরী পূর্ণিমার রাতে আমরা যখন অন্য বাড়ীতে লক্ষী পুজোর প্রসাদ খেতে যেতাম ,ধানক্ষেতে মা লক্ষীর নূপুরের শব্দ শোনা যেতো ,আমাদের গ্রামে কোনোদিন কারো সাথে ঝগড়া হতো না ,সবাই কী সুন্দর মিলেমিশে থাকতো "
বাবার মুখে শুনে আমার জানা হয়ে গিয়েছিলো যে বাবার বাড়ীর সামনে ছিলো একটা মিষ্টি তেঁতুল গাছ ,অনেকে আসত তার বীজ নিয়ে যেতে ,বর্ষাকালে রান্নাঘর থেকে ঘরে আসতে নৌকো লাগতো ,একটা ঘরে সারা বছরের জন্য রেখে দেওয়া থাকতো চিঁড়ে ,মুড়ি ,মুড়কি ,আচার ,আমসত্ত্ব ,নাড়ু ,মোয়া আরো কতো কী ,দরকার হলে মইতে উঠে নিয়ে আসা হতো l
তারপর এলো দেশভাগ ,যার দগদগে ঘা এখনো শুকায় নি ঘরছাড়াদের মনে ,সেই দাঙ্গা ,ছিটকে এই পাড়ে এসে স্রোতের শেওলার মতো ভেসে বেড়ানো ,সেই অপাপবিদ্ধ কিশোর জানতেই পারলো না কেন তাদের বাড়ী ,প্রিয় গ্রাম ছেড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হলো ,আর কোনওদিন তো সে শুনতে পাবেনা নদীর জলে খ্যাপলা জাল ফেলার শব্দ ,দেখতে পাবে না তার হাতে পোঁতা আমগাছে কটা বাবুইয়ের বাসা তৈরী হলো .........
বাবার খুব কষ্ট হতো ,আমি বুঝতে পারতাম ,মাঝে মধ্যেই আমার অঙ্ক খাতায় ছবি এঁকে বাবা দেখাতেন কোন পথ দিয়ে গেলে খেলার মাঠ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ী পৌঁছনো যেতো ,উঠোনের কোন দিকটায় বাড়ীর পিসিমা ,ঠাকুমারা বড়ি দিতেন ,"বাপী ,তুমি আর যাও নি কেন ওখানে ?"অবাক আমার প্রশ্নের উত্তরে বাবা কষ্ট ভেজা চোখে মাথা নাড়তেন ,"না বাবুন,আমার নিজের গ্রামে যেতে হলে পাসপোর্ট ,ভিসা লাগবে ,এটা আমার সহ্য হবে না ,দেখি যদি কোনও দিন ..........."
আরো অনেকের মতো বাবা ও বোধহয় ভেবেছিলেন আবার দুটো দেশ জুড়ে যাবে ,আবার ____
আমার বাবা মৃত্যুশয্যায় শুয়েও দিন গুনতেন ,আমি মনে মনে ভেবেই রেখেছিলাম আমি একবার অন্তত যাবো সেই রূপকথা মেশানো গ্রামে ,বাংলাদেশের বরিশাল জেলার জলাবাড়ী তে ,যেখানে বাবা ,আমার পিতৃপুরুষ জন্মেছিলেন ,ধূলোকাদা মেখে বড় হয়েছেন ,সেখানে গিয়ে একবার দেখবো পুরনো গাছের বংশধরেরা আমায় চিনতে পারে কিনা ,বলে ওঠে কিনা "এসো এসো ,এতদিনে আসবার সময় হলো ?"কতো লোক বাংলাদেশ বেড়াতে যায় ,ফিরে এলে তাদের কথা হাঁ করে শুনি আমি ,নেট সার্চ করে খালি ঘুরে বেড়াই বরিশালের গ্রামে গ্রামে ,খুঁজে নিতে চাই শিকড় ,কিন্ত আজও আমি যেতে পারিনি সেখানে ,হয়তো মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আমিও অপেক্ষায় থাকবো সাইবেরিয়া থেকে আসা পাখির দলের মতো আবার ফিরে যেতে আমার বাবা ,কাকা ,জ্যাঠার জন্মভূমিতে ,অন্তত একটিবারের জন্যেও .............
Friday, 11 November 2016
অপূর্ণ ইচ্ছা
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment