Sunday, 27 November 2016

প্রেম এসেছিলো

শরতকালের  সকালগুলো  কত  অন্যরকম  ছিলো , নীল  আকাশে  বেশ  একটা  সব পেয়েছি  ভাব  , ঘাস ভেজানো  শিশিরকণা  মাঝে মাঝে  ঝলসে  উঠতো  সূর্য্যের  আলোয় ,পাশের  বাড়ীর  কাকিমার  নাকছাবির  মতো ,শিউলি গাছের  তলায়  সাদা হলুদের   আলপনা , পড়ার বইকে  সরিয়ে  দেওয়ার ষড়যন্ত্র  করতো .....
             তখন  সতের বছর বয়স ,চোখ  বুজলেই  সেই  ভীতু   মেয়েটাকে  দেখতে  পায় দিয়া ,যে  সাহস  করে  কোনও দিন  তার  প্রথম  ভাললাগার  কথা কাউকে  বলতে  পারেনি ,অন্য দিকেও  ভয়  ছিলো  নিশ্চয়ই ,তখন  যেন  একটা  ভয়ের  যুগই ছিলো ,বাবা  মায়েদের  সঙ্গে  এই রকম  বন্ধুর  মতো  সম্পর্কের  কথা  ভাবাই  যেতো  না ,দিয়া  কোনোদিন  বন্ধুদের  সাথে সিনেমা  যায়  নি ,ও  জানত  না  বন্ধুর  বাড়ী  গিয়ে  আড্ডা  দিতে  কেমন  লাগে lঅথচ  বাবা  মা  কি  এতোটাই  রাগী  ছিলেন ?বুকের মধ্যে  বাসা  ছিলো  নাম  না  জানা  ভয়টার ,কী  হবে  কেউ  জানতে  পারলে ? কথা  বলা  দূরে  থাক ,তাকিয়ে  দেখারও  সাহস  ছিলো  না , বাড়ীর  সামনে  একটা  বারান্দা  ছিলো ,দিনের  মধ্যে  দু  চারবার  যাতায়াত  করতো  সুজন  তার  সামনের  রাস্তাটা  দিয়ে ,কলেজ  যেতে  আসতে ,আর  জানত  যে  দিয়া  পাশের  জানলার  পর্দাটা একটুখানি  সরিয়ে দাঁড়িয়ে  আছে  যতক্ষণ  দেখা  যায় ,ছোটবোনের  চোখে  পড়লেই  সর্বনাশ ,  গোয়েন্দার  মতো  নজরদারি  চালাত  সেও  যাতে  তার  আদরের  দিদি  বিপদসীমায়  পা  না  বাড়ায় ......
           সেবার  পাড়ার  পুজোর  দশ বছর ,একটু  বড়  করে  পুজো  হবে  ,একটা  ফাংশন  হবে  ,বড়দের নাটক  হবে ,আরো  কতো কী ,দিয়ার  পরিচিতি  ছিলো  গান  ভালো  গায়  বলে ,কাকু  জেঠুরা  বাবাকে  রাজী  করালেন  ,রিহার্সাল  শুরু  হলো ,দিয়া যেতে  শুরু  করল,  সঙ্গে  হিয়া ,গোয়েন্দার  ভূমিকায় , বলা  বাহুল্য  বাড়ীর  পূর্ণসম্মতিক্রমে ,কিছু  হয়তো  আঁচ  করেছিলো  কেউ ,কড়া  নির্দেশ  ছিলো  কোনও ছেলের  সাথে  কথা  বলা  যাবে  না ,সুজন ও  ছিলো  গানের  দলে ,কিন্ত কথা  হতো  না ,মাথা  নিচু  করে  নিজের  অংশটুকু সেরে  চলে  আসত  দিয়া .......
                      সপ্তমীর  রাত্রে  অনুষ্ঠান ,মঞ্চে বসতে  হলো  সুজনের  থেকে  একটু  দূরে ,হিয়া  মঞ্চে নেই ,দিয়া গান  গাইবে কী ,বুকের  ভিতরে দুম  দুম করে  আওয়াজ হচ্ছে , সামনের  সারিতে  সার্চলাইটের  দৃষ্টি  নিয়ে  বসে  বাবা ,মা ,হিয়া ; বোকা  মেয়েটা  কোন ও  ফাঁদে  পা  না  দেয় ,গানের  শেষে  পর্দা  পড়ে  যায় ,আর দিয়ার  হাতে  চলে  আসে  এক  টুকরো  কাগজ ,কুট্টি  করে  ভাঁজ  করা ,কী  লেখা  তখন  কী  পড়ার  সময়  আছে !নতুন  শাড়ি সামলে  মঞ্চ  থেকে  নেমে  আসতেই বোনের  সামনে ,"কী  রে  ওটা  তোর  হাতে ?"এতো  তাড়াতাড়ি  কী  করে  এলো  ও  পিছন দিকটায়  কে  জানে ,তারপর  যা  হয,মা বাবার হাতে সেই টুকরো  চিঠি ,এবং  "অ্যাঁ !তলে তলে  এতো ! দাঁড়া  ওর  বাড়ীর  লোকদের  বলছি ,কেমন  করে  মানুষ  করছে  ছেলেকে ,যে  মেয়েদের  সাথে  অসভ্যতা  করবার  সাহস  পায়.....???
           সুজনকে  ডেকে  পাঠানো  হলো ,ওর  কাছে  বলা  হলো  যে  আর  কোনওদিন এরকম  করলে  বাড়ীতে  খবর  যাবে ,তারপরেও  কিছু  হলে  সোজা  পুলিশে ,বেচারা  মাথা  নিচু  করে  বকুনি  খেলো ,ছলছল  চোখে  চলেও  গেলো ,পরের  বছর  পাড়া  ছেড়ে  দিলো ,আর  কোনোদিন দেখা  হয়নি  দিয়ার  সাথে ........
          দিয়া  আজ ও  জানে  না  সুজন কী  লিখেছিলো ওই ঘামে  ভেজা  চিরকুটে ,দেখে নি  ওর  হাতের  লেখা  ......
         আজ ও  সেই  সপ্তমীর  সকাল ,আকাশ  বাতাস  একই  রকম স্বপ্ন  মাখানো , পূজাবার্ষিকী হাতে  নিয়ে  অলস  সময়  গুনছিল  দিয়া ,ঝড়ের  গতিতে  ঢুকে  এলো  বাবি ,"মা , বেরিয়ে  যাচ্ছি ,টাকা  দাও ,এতক্ষণে  বোধহয়  রাহুল  পৌঁছে  গেছে  আর  আমাকে  যা  তা  বলছে ,উঃ,শুনতে  পাচ্ছ  না  নাকি !"মুচকি  হাসে  দিয়া ,"দাঁড়া ,উঠতে  দে  আগে ,দিচ্ছি আর  রাহুলকে বলবি  একদিন  আসতে ,অনেকদিন  আসে নি ........"

2 comments: