Thursday, 8 March 2018

নারীদিবস

আজ থেকে বেশ কয়েকবছর আগেকার কথা, তখনো আমার বিয়ে হয় নি,  প্রেমপর্ব চলছে মাত্র। আমাদের বেহালার বাড়ী কিছুদিন আগেই বিক্রী করে দিয়ে আমরা চলে গিয়েছি সল্টলেক। পুরোপুরি অচেনা এক শহর আমার কাছে, বিভিন্ন বাসরুট, খামখেয়ালী নামের স্টপেজ,বিশাল বিশাল জলাধার, নির্জন ভুতুড়ে রাস্তা, (কেউ রাগ করবেন না যেন, অনেকদিন আগে এইরকমই ছিলো সল্টলেক) , সবকিছু কেমন গুলিয়ে যেতো আমার।

          এইরকম এক সন্ধ্যায় আমি বেহালায় বাসের জন্য দাঁড়িয়ে, বাড়ী ফিরবো , সল্টলেক। দেখতে এসেছিলাম আমার হবু বরকে, যিনি কয়েকদিন ধরে তুমুল জ্বরে ভুগছেন। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি পালিয়ে, মা কে না জানিয়েই চলে এসেছিলাম এখানে,  ইচ্ছে ছিলো ওই সময়ের মধ্যেই বাড়ী ফিরে যাবো , যাতে বকুনি খেতে না হয়। যাই হোক, দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই, একটার পর একটা অন্য সব রুটের বাস তিন চারটে করে চলে গেল, আমার নির্দিষ্ট বাসটির আর পাত্তা নেই। ওই একটাই বাস চিনি, যেটা আমাদের ১৩ নম্বর ট্যাংক বাসস্টপেজ অবধি যায়, ব্রেক করে শিয়ালদা বা এসপ্ল্যানেড থেকে কয়েকটা রুট অবশ্য আছে, কিন্তু কোনদিন একা যাইনি বলেই, সাহস পাচ্ছি না।

         ঘড়ির দিকে তাকাতেও ভয় করছে , নিজেদের বাড়ীতে তখন ল্যান্ডফোনই নেই যে কিছু খবর দেবো, মা কে চিন্তা করতে বারণ করবো,  মোবাইল তো অনেক দূরের ব্যাপার। মরিয়া হয়ে ট্যাক্সি ধরবার চেষ্টায় রাস্তার এপারওপার  কাবাডি প্র‍্যাকটিস করলাম, কিন্তু সল্টলেক শুনে তাঁদের দ্রুত পালিয়ে যাওয়া দেখে আস্তে আস্তে নিজের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে থাকলো। মনশ্চক্ষে দেখতে পেলাম বাড়ীর সামনে ভিড় জমতে শুরু করেছে, পুলিশ এসে মা কে আর বোনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে কী কারণে বাড়ী থেকে একটা মেয়ে পালিয়ে গেল। কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না, এমন সময় এগিয়ে এলেন সেই ট্যাক্সিচালক, যিনি অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন একটু দূরে, ট্যাক্সির গায়ে হেলান দিয়ে লাল কাপড়টা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছিলেন। তাঁকে সল্টলেক যাওয়ার কথা বলতেই বলেছিলেন সওয়ারি আছেন, মার্কেটিং করছেন, তাই উনি অপেক্ষা করছেন।, নইলে আমায় পৌঁছে দিতেন।
এখন হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোককে নিয়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন আমার সামনে, বললেন 'দিদিভাই,  এখন তো আর সল্টলেকের বাস পাবেন না, মনে হচ্ছে ২৩৫ রুটে কোন ও ঝামেলা হয়েছে, তাই বন্ধ হয়ে গেছে, আপনি আমাদের সাথেই চলুন, এই দাদাকে লেক গার্ডেনস এ ছেড়ে দিয়ে তারপর  আপনাকে পৌঁছে দেবো। ' সেই ভদ্রলোকও হাসিমুখে বললেন, 'হ্যাঁ  ম্যাডাম, চলুন, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী আর করবেন '
          প্রমাদ গুনলাম, ছোটবেলা থেকে শোনা বিভিন্ন সাবধানবাণী মাথার মধ্যে কিলবিল করতে শুরু করলো, মেয়েদের অনেক সাবধানে থাকতে হয়, কাউকে বিশ্বাস করতে নেই, অচেনা কারোর সাথে কথা বলতে নেই, একসাথে যাওয়া তো দূরের কথা, মরিয়া হয়েই ট্যাক্সি থামাতে গিয়েছিলাম, তখনো কোনওদিন একা ট্যাক্সিতে চড়িনি, তারপর আবার একদম অচেনা একজনের সাথে চড়া। মুখ টুখ শুকিয়ে গিয়েছিলো বোধহয়, ট্যাক্সিচালক বললেন ' চলুন দিদিভাই, আপনার কোন ও চিন্তা নেই,  এই ভাইয়া থাকতে আপনার  কোন ও ক্ষতি হবে না '

           লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম, ওই ভদ্রলোক সামনের সিটে, চালকের পাশে, আর আমি পিছনে,  জানলার একদম ধার ঘেঁষে বসে আছি, কিছু বেগড়বাঁই দেখলেই দরজা খুলে লাফ মারবো, তাতে হাত পা ভাঙুক আর কাটুক, যা ইচ্ছে হোক। দরজাটা লক ও করিনি, এই কারণেই। ওঁদের ভ্রুক্ষেপ নেই,নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করেই যাচ্ছেন,  মনে হলো দুজনেই বেশ অনেকদিনের পরিচিত, হয়তো নিয়মিত এই ট্যাক্সি ভাড়া করে মালপ্ত্র কেনাকাটা করতে আসেন তিনি। যাই হোক, কিছু পরে লেক গার্ডেনস এ ভদ্রলোক নেমে গেলেন, তারপর বিভিন্ন গলি, বড়রাস্তা, ছোটরাস্তা পেরিয়ে আমায় বাড়ী পৌঁছে দিলেন আমার ভাইয়া।তখন বাড়ীর লোক প্রায় বেরিয়ে পড়ছিলো পুলিশে খবর দিতে, অনেকপ্রস্থ বকুনি টকুনি সামাল দিতে হলো।

            জীবনে আর তাঁদের সাথে দেখা হয় নি আমার, নাম ও জানিনা কারোর, তবু আজ একটাই কারণে এই ঘটনাটা সবাইকে জানাতে খুব ইচ্ছে করলো। পৃথিবীতে নারী পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক, দু' জন বেঁচে থাকে একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে, বিশ্বাসে, ভালোবাসায়। নারীদিবস মানে শুধু  মেয়েদের একটা মিষ্টির প্যাকেট, ফুল আর শাড়ী গয়নার দোকানে ডিসকাউন্ট   দেওয়া নয় , হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস যেন ফিরে আসে আমাদের,  সব্বাইকে অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে আমরা প্রাণভরে বাঁচতে ভুলে যাচ্ছি, এই দিনে তাই ভালবাসাভরা  প্রণাম রাখলাম সেই ভাইয়া আর তাঁর দাদার কাছে, ভালো থাকুন তাঁরা।
                  
                   -------------------------------------