Monday, 18 September 2017

''দুখজাগানিয়া ''


     
          পুজো  মানেই  ছিলো  একরাশ সিউলিফুলের  গন্ধে  নতুন জামাকাপড়ের  গন্ধ  মিশে যাওয়া ,ছোটবেলায়  ধৈর্য্য  ধরতো  না ,কখন  হাতে  আসবে রঙিন  ফ্রক ,জুতো ,টিপ ,নেলপালিশ ,আরো  কতো কী ,বন্ধুদের  সাথে   চলতো অলিখিত  রেষারেষি ,"অ্যাই ,তোর কটা  হলো  রে এবার ?"
"জানিস  তো ,আমার  দাদু  কী  সুন্দর  গোলাপী  রঙের  একটা  মিডি পাঠিয়েছে ,এবার  ওটা  পরে  অষ্টমী তে  অঞ্জলি  দেবো "
"আমার  আবার  গোলাপী  রংটা  একটুও  ভালো  লাগে না ,আমার নীল  চুড়িদারটা  দেখিস  ,দিল্লী  থেকে  মাসী  এনে  দিয়েছে "
          কতো  পরিকল্পনা ,কতো খুনসুটি ,"অ্যাই  রিঙ্কু ,মহালয়া শুনবি  তো ?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ ,শুনবো  না ?কী যে  ভালো  লাগে "
"ওই  গানটা  শুনতে  দারুণ লাগে ,ওই যে  বাজল তোমার  আলোর  বেণু "
"আমার  ওই  গানটা  বেশী  ভালো লাগে ,জাগো দুর্গা ,জাগো  দশপ্রহরণধারিণী "
           একপাশে  চুপ  করে  বসে  থাকে তিতান ,বড্ডো
    ঘুমকাতুরে   ও ,কোনোদিন  আজ  অবধি  পুরো  মহালয়া শুনতে  পারেনি ,সব্বাই  শোনে ,আলোচনা  করে ,ও  কিছু  বলতে  পারে  না ,ভোরবেলা   বাবা  প্রতিবছর  ওকে  ডেকে  দেন ,"অ্যাই তিতান  ওঠ ,ওঠ ,মহালয়া শুনবি  না ?শুরু  হয়ে  গেছে "
      আঠা লাগানো  চোখ ,অনেক দূর  থেকে  ভেসে  আসে সুরেলা  গলায় গান ,স্তোত্রপাঠ ,হালকা খুশীর  আমেজ গায়ে  মেখে পাশ ফিরে শুয়ে  ঘুমের দেশে  চলে  যায় তিতান ........
         সেই  দিনগুলো  আজ  অনেক  দূরে ,রিঙ্কু ,মৌটুসী আর ঝিলমদের সাথে  কতোদিন  দেখা  হয় নি ,জানা হয়নি  ওরা  এখন  কেমন  করে  পুজো কাটায় ,মহালয়া শোনে কিনা ছেলেমেয়ের সঙ্গে ,তবে তিতান এই  দিনটা  এলেই  অদ্ভুত  এক  দোটানায়  ভোগে ,এক  সঙ্গে  মিশে  যায়  অনেকটা  সুখ ,অনেকটা  দুঃখ .........
               বাবা  চলে  গেলেন পুজোর  কয়েকদিন  আগে ,অসময়ে ,কঠিন  অসুখটা কবে  থেকে  যে  বাবাকে আশ্রয়  করে  বেড়ে  উঠছিল ,আগে বোঝা  যায়  নি ,যখন  ধরা  পড়লো ,তখন  আর  কিচ্ছু  করার  ছিলো  না ,বাবার পারলৌকিক  কাজের  দিন পড়লো  মহালয়ার  দিনে ,বাড়ীতে  রেডিও  চলেনি ,কিন্ত ভোরবেলা  সেই অদ্ভুত  উদাত্ত  কণ্ঠের  সুর  ভেসে এলো আকাশ  বাতাস  মাতিয়ে ,তিতান জেগেই ছিলো ,সেইদিন ও প্রথম শুনলো পুরো অনুষ্ঠান ,মনে  হলো  বাবা  যেন  মাথার  কাছে  এসে  দাঁড়িয়েছেন ,আর
মুচকি  হেসে  বলছেন "কী  রে  তিতান ,কেমন  লাগলো , আর  কে  ঘুম  থেকে তুলে  দেবে  এখন ?"
     না  বাবা ,ঘুম পায়  না আর  এখন  আমার ,মহালয়ার  সময় মনে  হয় ওই  তো   তুমি  দাঁড়িয়ে আছো ,হাত  বাড়ালেই  ছোঁয়া  যাবে ,চলো  আমরা  একসাথে  শুনি "বাজলো  তোমার  আলোর  বেণু ".............

No comments:

Post a Comment