ছোট্টবেলা থেকেই বই পড়বার নেশা, যা পেতাম হাতের কাছে, গোগ্রাসে গিলতাম, ক্লাস ওয়ানে সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর, ক্লাস সিক্সে বুদ্ধদেব গুহর 'কোয়েলের কাছে', ক্লাস সেভেন এ 'বঙ্কিম রচনাবলী 'শেষ। আমাদের বাড়ীতে একটা মিনিছাদ ছিলো, ঘরের মধ্যেই, আমার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য 'বড়দের' গল্পের বইদের স্থান হতো ওই মিনিছাদে, কুছ পরোয়া নেই, প্রথমে টেবিল, তার উপরে চেয়ার লাগিয়ে পেড়ে এনে সারাদিন পড়ে নিয়ে আবার ওই পথে তাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে দিতাম। লুকিয়ে পড়তে হতো বলে অত তাড়াতাড়ি পড়া রপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। বাবা মায়ের প্রবল পিটুনি, কানমলা, চড় ইত্যাদি ও আমাকে পড়ার বইমুখো করতে পারেনি কোনওদিন। দু'জনে অফিস বেরিয়ে গেলেই অভিযান শুরু হতো আমার, টেবিল, চেয়ার, মিনিছাদ, গল্পের বই আবার গল্পের বই,মিনিছাদ, চেয়ার, টেবিল, মোটামুটি এই ছিলো আমার লাইফ সার্কেল। মাধ্যমিক পরীক্ষার দিন পঁচিশেক আগে একবার বাবা অফিস যাওয়ার নাম করে লুকিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে এসেছিলেন, যথারীতি আমি তখন ভুগোলের বই সরিয়ে রেখে আয়েশ করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিয়ে বুঁদ হয়ে আছি, কিচ্ছু টের পাই নি, তিনি এলেন এবং মাথার চুল ধরে টেনে বালিশ থেকে তুলে বসিয়ে দিলেন, একটু হেরে যাওয়া দুখী মুখে বললেন, ' বাবুন, এই ফাঁকিগুলো কিন্ত অনেক বড় হয়ে পরে দেখা দেবে, তখন নিজের হাত কামড়ানো ছাড়া আর উপায় থাকবে না। '
যাই হোক, বিশুদ্ধ গল্পের বইয়ের মাঝে কিছু সিলেবাসের বইয়ের ভেজাল মিশেছিলো, তাই মাধ্যমিক পরীক্ষা তো পাশ করা গেল, কপাল খারাপ তাই ফার্স্ট ডিভিশন আর অঙ্কে সবেধন নীলমণি লেটারও জুটে গেল, আর ঘাড়ে চেপে বসলো সায়েন্স, হায় রে, এরকম হবে জানলে ইচ্ছে করে ভুল উত্তর লিখে আসতাম। পুরো গভীর সমুদ্রে পড়ে গেলাম, কোথায় মাল্টিনোমিয়াল, কোথায় ক্যালকুলাস, কোথায় মোমেন্ট অফ কাপল, সব একেবারে তালগোল পাকিয়ে গেল।
উচ্চমাধ্যমিক, সেকেন্ড ডিভিশন, বাবার চলে যাওয়া, তাঁর অফিসে আমার চাকরী, টিবি হওয়ার কারণে বি এস সি কন্টিনিউ না করতে পারা, সব একেবারে হাত ধরাধরি করে চলে এলো। গান ও বন্ধ হলো, ওই টিবির কল্যাণেই। তারপর ছ'মাসের কোর্স করে সুস্থ হতেই প্রেম, এবং বিয়ে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হয়ে রইলো উচ্চমাধ্যমিক।
কোন ও ক্ষতি ছিলো না জানো, কী সুন্দর অফিস আর বাড়ী যাতায়াত করছি, গল্পের বই নিয়ে যতক্ষণ ইচ্ছা বসে শুয়ে থাকছি, যা ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে বেড়াতে চলে যাচ্ছি, কিন্তু ওই মনের মধ্যে কুটকুটে একটা বিচ্ছিরি রকমের খারাপ লাগা, কেউ কতদূর পড়াশোনা করেছ জিজ্ঞেস করলে আরও অসহায় লাগতো। বেশী করে আঁকড়ে ধরেছিলাম গল্পের বইগুলোকেই, তিন চারটে লাইব্রেরীর মেম্বার হয়ে গাদাগাদা বই পড়তাম রাত দুটো আড়াইটে পর্যন্ত, এই দেখে আমার কত্তার মাথায় খেলে গেল ঝক্কাস আইডিয়া, জোরজার করে ভর্তি করে দিলো প্রাইভেটে বি এ পড়তে, আর যে মনযোগ দিয়ে গল্পের বই পড়তাম, পুরোটুকু দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
সবসময় মুখের সামনে ইতিহাস, পলিটিকাল দায়েন্স, অফিস থেকে এসেই পড়তে বসতাম।শুধু এইটুকু মাথায় ছিল যে আমাকে পারতেই হবে।কিচ্ছু জানিনা, ওই বিষয়গুলো পড়িইনি কোনওদিন,তখন যেন প্রাণের দায়ে শুধু পড়তাম আর পড়তাম। এইভাবেই একদিন গ্র্যাজুয়েট হলাম,তারপর কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে দুটো সাবজেক্টে এম এ পাশ করলাম। চাকরি, গান,সংসার,সব সামলে পড়াশোনা করেছি, আমার স্বামীর অবদান সবচেয়ে বেশী। প্রতিবার রেজাল্ট বেরনোর সময় বাবার মুখটা ভেসে উঠতো চোখের সামনে, মৃদু হাসি নিয়ে যেন বলছেন, 'বাবুন, তুমি যে পড়ার বইও এত্ত মন দিয়ে পড়তে পারো, আমার ধারণা ছিল না। '
Tuesday, 5 June 2018
পড়ার বই, না পড়ার বই
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment