মাসির বাড়ী গেছি, মাসতুতো দিদির বিয়ে, আমরা কয়েকজন তুতো ভাইবোন ছাড়া গরুর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। মামাতো, মাসতুতো, এরা তো আছেই, সংগে যোগ হয়েছে দিদির খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভাইবোনেরা। মাঝেমাঝেই পান্তুয়া টান্তুয়া উধাও হয়ে যাচ্ছে, দরকারী জিনিষপত্র যেমন তত্ব সাজানোর রাংতা, অথবা মেসোমশাইর গোঁফ কাটবার কাঁচি হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না, তারপর চিৎকার চ্যাঁচামেচি, গণহারে বকুনি, বিভিন্ন মনুষ্যেতর প্রাণীর পাঁচ পা দেখার খোঁটা দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদির পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে।
'অ্যাই মিঠু, একটা মজা দেখবি? '
' কী মজা রে দাদাভাই? '
'চুমকি কে ডাক, দারুণ মজা হবে'
'দাঁড়া ডাকছি, বুবুনদাকেও ডাকি?
'হ্যাঁ হ্যাঁ, সবাই মিলেই চল একটা দারুণ জিনিষ বানাবো, অন্যদের চোখ ট্যারা হয়ে যাবে '
কিছুক্ষণ আগেই মিঠু গুছিয়ে ঝাড় খেয়েছে মাসির কাছে । আজ দিদির আইবুড়োভাত, বাড়ীর সবাই ব্যস্ত, ও তার মধ্যে এক টিয়াপাখিওয়ালাকে বাজারের রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে এসেছিলো একটু আগে, নাকি কয়েকদিন ধরে মাসির খুব পাখি পোষার ইচ্ছে হয়েছে, পেলেই পুষবে। ওর হাঁকডাঁকে কী না কী হয়েছে ভেবে মাসি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখে খাঁচার মধ্যে একগাদা মুনিয়া ঝটপট করছে, পাঁচটা টিয়া ঘাড় ফুলিয়ে বসে আছে, পাখিওয়ালা ময়লা গামছা ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে, আর সামনে কৃতার্থ করার ভংগীতে মিঠু দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাপারটা বুঝে মাসি তো মিঠুকে যাচ্ছেতাই ভাবে বকুনি দিলো, আমরা ওকে বুদ্ধি করে সরিয়ে নিয়ে না এলে হয়তো পিঠেও গোটাকতক পড়তো।তারপর থেকে মিঠু উদাস হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো, ওর মুড ভালো করতেই বাবিয়ার এই যুগান্তকারী প্রয়াস।
একটা টিনের কৌটো, একটুকরো কার্বাইড, একটু জল, একটা দেশলাই বাক্স, বেশী কিছু তো লাগেও না আমাদের মতো প্রতিভাবান বৈজ্ঞানিকদের কিছু আবিষ্কার করতে।যদিও পুরো আইডিয়াটাই বাবিয়ার, আমরা সহকারী মাত্র। বাজারে যে কার্বাইড ল্যাম্প দেখা যায় ,আমরা আজ আমাদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই তাই করে দেখাবো, সবসময় ছোট বলে অবজ্ঞা করা? দাঁড়াও , মজা দেখাচ্ছি, আজ যখন সন্ধ্যেবেলা বর আসবে, কত দারুণ জ্বলবে আমাদের এই ল্যাম্প চাই কি পরে অন্যান্য বিয়েবাড়ী থেকেও ল্যাম্প বানানোর অর্ডার আসতে পারে।
কৌটো খুলে তারমধ্যে কার্বাইড আর জল দেওয়া হল,চারধারে আমরা মানে আমি, বাবিয়া আর বুবুনদাদা গোল হয়ে বসে, মিঠুটা একটু ছোট তো, ভয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কৌটোর মুখ আটকানো হল, টাইট করে, ওপরে ছোট্ট একটা ফুটো আছে, যেই ওখান থেকে গ্যাস বেরোবে, একটা দেশলাই কাঠি জ্বেলে দিলেই ব্যস, আর দেখতে হবে না, 'হঠাৎ ভু উ উ উ র রু রু রু ই উ ম,'একটা বিশাল শব্দে কৌটোটা ফেটে গেল আমরা তিনজন তিনদিকে ছিটকে পড়লাম,এর মধ্যে কৌটোর টুকরোতে বুবুনদার হাত কেটে গিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল, মিঠু কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে ডেকে নিয়ে এলো।
সাময়িক বিহ্বলতা কাটিয়ে ওঠার পরে যাকে যা যা শাস্তি দেবার, শুরু হলো,যত বোঝানো হয় যে সবে তো আমরা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম, কেমন করে জানবো যে কৌটোতে কতোটা বড় গ্যাস বেরনোর রাস্তা রাখতে হয়, পরের বার নিশ্চয়ই ঠিক করবো, তা কে আর শোনে ছোটদের কথা,ওদের শুধু পেটাতে পারলেই হলো।
No comments:
Post a Comment