তখন খুব ছোট ,যতদূর মনে পড়ে কেজি টেজি তে পড়তাম ,মানে স্কুলে গিয়ে বাঁদরামি করতাম আর কি l পাড়ায় আমাদের দলটা একটু গুন্ডা গোছের ছিলো ,যতো রকম সভ্য কাজ আমরা করে বেড়াতাম l কার গাছে পেয়ারা ,কুল হয়েছে ,আমরা জানতাম ,কার বাড়ীর বাবা মা অফিস বেরিয়ে যান ,তাদের বাড়ীতে ,আচার ,আমসত্ত্ব ,পাটালি মজুত থাকে ,আমরা জানতাম ,হজমি গুলি ,কটা কিনলে কটা ফ্রী ,আমরা জানতাম ,মানে অনেক কিছুই ওই বয়েসেই নখদর্পণে ছিলো আর কি l এতো দরকারী সব কিছুর খোঁজ খবর আমাদের কাছে থাকতো ,কিন্ত বাড়ীর বড়রা মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না আমার উপর ,যাক গে ,সবদিকে তো আর সবাই সুখী হয়ও না l
একদিন কাকামনি বাড়ীতে ঢুকেই বড় চিত্কার চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করে দিলেন ,কি ব্যাপার !না তিনি তখন পাড়ার কালচারাল সেক্রেটারি ,পাড়ায় আঁকার কম্পিটিশন আছে ,সব বাচ্চlরা গিয়ে বসে পড়েছে ,কিন্ত তাঁর নিজের ভাইঝিই আসে নি ,"চল দেখি তোর পেন্সিল ,ইরেজার আর রঙ নিয়ে ,দিনরাত তো পাড়ায় টো টো করে ঘুরিস ,অথচ কোনও কাজের বেলায় নেই ,আমাকেই আসতে হলো নিয়ে যেতে ,চল ,শিগগিরই চল "
জানবো না কেন ?তবে ওই আঁকা টাকার ব্যাপার থেকে আমি একটু দূরে দূরেই থাকতাম ,আজ অবধি যতো ছবি এঁকেছি ,কোনওটাই কেউ বুঝতে পারেনি কী সেটা l ধরুন বেশ মনপ্রাণ দিয়ে একটা গরু এঁকে সবাইকে দেখাতে গেলাম ,"ও মা ,কী সুন্দর হয়েছে রে ব্যাঙের ছবিটা "অথবা "আরে !কী দারুণ এঁকেছিস গোলাপ ফুলটা !"বুঝুন মনের কষ্টটা l সেই জন্যই আর কী ........তা কে শোনে ছোটোদের কথা ,মিতি ,গুলি , নান্টু আর পিয়া দের পাশে দুঃখু দুঃখু মুখে গিয়ে বসলাম , কী অবস্থা হবে একটু পরে তাই ভেবেই গায়ে জ্বর আসছে প্রায় ,নাঃ ,দলপতির আসনটি আর বজায় রাখা যাবে না বোধহয় l
"যেমন খুশী আঁকো ",হাসি হাসি মুখ করে একজন এসে বলে গেলেন ,শুধু পরিষ্কার করে আঁকতে হবে l কী আঁকি ,কী আঁকি ,আড় চোখে তাকিয়ে দেখি সবাই বেশ সিরিয়াস মুখ করে এঁকে যাচেছ ,এতো দূরে দূরে বসিয়েছে যে কে কী আঁকছে দেখাই যাচেছ না l যাকগে ,যা থাকে কপালে ,শুরু তো করি .........
সন্ধ্যেবেলা ,কাকামনি এসে ধপাস করে খাটে বসে পড়লেন ,"কী এঁকেছিস সোনা ওগুলো ?আমি আর লজ্জায় কাউকে বলতে পারছি না যে এই আঁকার পাতাটা আমার ভাইঝির ...."সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুমড়ি খেয়ে এলো "কেন কেন ?কী এঁকেছে সোনা ?"
"একটা ঘর ,একটা মাছ ,দুটো ফুল ,সবার তলায় আবার লিখে দিয়েছে সেগুলো কী ,নইলে কারো সাধ্যি ছিলো না বোঝার l আরেকটা ওটা কী এঁকেছিস রে ?আমি তো তলপেল বলে কিছুর নাম শুনিনি কোনোদিন ,ওই যে গোল মতো ,ওটা কিসের ছবি রে ?"
গোঁজ হয়ে উত্তর দিই "তলপেল আবার কী ?ওটা তো আমি আপেল এঁকেছি "
ঘরে যুগপৎ স্তব্ধতা এবং খোউয়া খোউয়া হাসির মিশ্রণ বিরাজ করে ,কিছুক্ষণ বাদে খবর আসে আমি নাকি ওই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছি !!!!!
অবিশ্বাস্য খবরের সত্যতা যাচাইয়ে গিয়ে বাবা শোনেন যে আঁকার তলায় লিখে বুঝিয়েছি বলেই নাকি আমার দ্বিতীয় স্থান প্রাপ্তি ,পরিচ্ছন্নতার জন্য l
তারপর থেকে আর জীবনে কোনোদিন আঁকার দিকে হাত বাড়াই নি,পড়ার আঁকাগুলো ছাড়া ,তবে সেগুলো নিয়ে দুঃখের কাহিনী লিখতে গেলে মহাভারতের সেকেন্ড এডিশন রচনার সম্ভাবনা আছে ,তাই থাক ........
No comments:
Post a Comment