Sunday, 3 January 2021

জিমি

      পড়তে বসেছে সোনা ,দাদু আর ঠাম্মার  ঘরে। আশপাশ থেকে বিচিত্র  সব  গন্ধ ভেসে আসছে,তার মধ্যে চেনা বলতে মামণির রান্না মাছের ঝোলের গন্ধ,,ঠাম্মার  মুখের পান সুপুরির গন্ধ,  আরও আছে,  ছোটদাদুর একগাদা ওষুধের মেশানো ঝাল ঝাল,টক তেতো গন্ধ। পড়তে বসা না ছাই, বই খুলে সামনে রেখে অনন্ত বকবক করে  যাওয়া   দাদু ঠাম্মার সাথে।  এই ঘরে থাকতে খুব ভালো লাগে সোনার। ঠাকুরের সিংহাসন একধারে, সেখানে বেশ কেমন ঠাকুরের সংসার যেন।সকালে ঠাম্মা ঘন্টা বাজিয়ে তাঁদের ঘুম থেকে তোলে, পুজো করে, তারপর সবাইকে  ছোট ছোট নকুলদানা, বাতাসা, শশার টুকরো প্রসাদ দেয়। সন্ধ্যেবেলা ' গুরুদেব দয়া কর দীনজনে' গাইতে হয়।তখনও একবার প্রসাদ পাওয়া যায় । রাত্তিরে আবার ঠাকুরদের ঘুমনোর জন্য  সামনের পর্দাটা টেনে দেওয়া হয়। বেশ সুখের ব্যাপারস্যাপার কিন্তু,  পড়াশোনা করতে হয় না,  নামতা মুখস্থ করতে হয় না, দুষ্টুমি করার জন্য পা সুড়সুড় করে ওঠে না, তাই কানমলা অথবা থাপ্পড়ের বালাই নেই,  সুন্দর জীবন। 

      জিমি বারান্দায় ঘুরে এসেই সোজা সোনার কোলের কাছে। " আরে জিমি সর সর ,  দেখতে পাচ্ছিস না সোনা পড়ছে? " বেশ করে কোলের কাছে বাগিয়ে নিয়ে আনন্দে জিমির গায়ে হাত বোলায় সোনা। আরেকটু হলেই নামতা মুখস্থ ধরতো দাদু, বাপরে,খুব বাঁচিয়ে দিয়েছে জিমি।খানিকক্ষণ হুড়ুদ্দুমুস করার পরে খাবার ডাক পড়ে, নরম নরম রুটি, ঝাল ছাড়া মাছের ঝোল  আর মৌরী দেওয়া সুজি।খেতে বসে বাপী বলে," নাহ্, সোনাটার আর পড়াশোনা হলো না। ওই জিমির সাথেই  কাল থেকে ওকে মাঠে পাঠিয়ে দিও তো, লোকজনের বাড়ি চিনে টিনে রাখুক, সবজির  ব্যবসা করেই খাবে নাহয়। " নিজের নাম শুনে দুধরুটি খেতে খেতে আহ্লাদে ভুক ভুক শব্দ করে জিমি, আর রাগে অপমানে লাল হয়ে রুটির টুকরো কুচিকুচি করে ছিঁড়তে থাকে সোনা।                                

         জিমিটা যেন কেমন একটা। সারাদিন সব ঘরে ঘুরঘুর করে বেড়ায়, কিন্তু রাত্তিরে ঠিক ঠাম্মার ঘরে ওকে  শুতেই হবে। আদুরে ভোঁদড় একটা।     ঠাম্মার খাটের পাশে ওর জন্য নরম নরম বিছানা করে দেওয়া হয়। খুব হিংসে হয় সোনার। ও ঠাম্মার   ঘরে শুতে চাইলে কেউ রাজী হয় না। " না না ,  ও ঘরে সারারাত জানলা খোলা থাকে, ঠান্ডা লেগে যাবে , চুপচাপ এখানে শুয়ে পড়ো। " অবাধ্য চোখের জলকে  ফেরত পাঠিয়ে বোনুর পাশে শুয়ে পরের দিনের জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে সোনা। সরিতাকে অনেক  কষ্টে রাজী করানো হয়েছে, কাল ওর মায়ের আমসত্ত্বের বোতল থেকে কিছুটা নিয়ে আসবে।  বুবুল আজ চোরের দানটা দেয় নি, কাল দেওয়াতেই হবে। আর  সামনেই   দোল আসছে, আগেরবার রন্টু  সোনাকে পুরো  ভূত বানিয়েছিল, এবার তার প্রতিশোধ নিতেই হবে। আচ্ছা, এবার যদি রঙের পিচকিরির  মধ্যে  কুটুস কামড়ানো লাল পিঁপড়ে ভরে ছাড়া যায়?  বেশ হবে, যখন তখন সোনার মাথায় চাঁটি মারা বেরিয়ে যাবে তাহলে। কিন্তু পিঁপড়ে ভরবে কে?  মিঠুকে রাজি করানো যাবে?  উঁহু, মনে হয় না, অন্য উপায় ভাবতে হবে। 

" সোনা, ঘুমোও নি তো, ঘুম আসছে না? " 

    বাপীর মিষ্টি গলা  ভেসে এল,  সাড়া দিলেই বিপদ, এক্ষুণি ট্রান্সলেশন ধরবে। চোখ বুজে ঘুমের ভানে অসাড়ে পড়ে থাকে সোনা। এইভাবেই কখন যেন ঘুম এসে যায়। কতদিন ভেবেছে জেগে থেকে দেখবে কেমন করে ঘুম এসে চোখের পাতায় জড়িয়ে ধরে, সেটা আর দেখা হয় না। সকালে উঠে নিজের উপর বড্ডই রাগ হয় তার । কেমন করে যেন স্বপ্নের মধ্যে  কত সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরে আসে,  কেমন একটা আবছা কষ্ট মেশানো আনন্দ মনে ভেসে থাকে  , ঘুম ভাঙার পরেও।   

         নতুন ক্লাসে উঠে গেল সোনা, বাপরে কত্ত বই!! ক্লাস টু হয়ে গেল এবার তার।  বাপী বলেছে  শুধুই খেলাধুলো করলে এবার আর পরের ক্লাসে উঠতে পারবে না সে। এখন থেকে খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।  ভালো রেজাল্ট না করলে নাকি কোনও বন্ধুই ওর সাথে কথা বলবে না। সামনের মাঠে বিকেলে শুধু একঘন্টা খেলতে যেতে পারে, দেরি হলেই  কাকামণি গিয়ে নিয়ে আসবে।জিমিকে বেশী চটকানো যাবে না,  গল্পের বই তাও দিনে এক ঘন্টার বেশী নয়।  এবার রেজাল্ট এর সময়   বাপীকে  স্কুলের দিদিমণি বলেছেন সোনার লেখাপড়ায় একটু নজর রাখতে, একটুও পড়া করেনা সে।খুব রাগী গলায় খারাপ খারাপ সব নিয়মকানুন চালু করে দিল বাপী। জিমি পাশে বসে ওর গায়ে গা ঘষবার, আদর খাওয়ার চেষ্টা করছিল, ওর জন্য সোনা আরও  বকুনি খেয়ে গেল।  

       সারাদিন মন খারাপ থাকে সোনার। বাড়ির সবাই যেন পুলিশকাকুদের মতো হয়ে গেছে, সবসময়ই সোনার উপর নজরদারি।  বাপী মামণি তো অফিসে যায়,  সোনা যদি একটু দেবরত্নাদের বাড়ি যায়,  তারা কি জানতে পারবে?  কে শোনে কার কথা, " না সোনা তুমি একদম পাড়া বেড়াবে না,  বাপী মামণি জানতে পারলে খুব রেগে যাবে কিন্তু।" দূর ছাতা,  ওদের তিনতলার ফ্ল্যাটের  বারান্দায় গিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আরও কষ্ট হয় , কী সুন্দর খেলে বন্ধুরা সবাই,  সরিতা,  দেবরত্না, রূপক, আর সোনার শুধু দিনে ঘড়ি ধরে এক ঘন্টাই বরাদ্দ।  নিজেকে কেমন জিমির মতো বন্দী মনে হয় ওর,  বাড়ির মধ্যে ছাড়া থাকলেও পার্কে এলে জিমিকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, সোনারও  প্রায় একই অবস্থা।    

              সেদিন  জিমি সন্ধ্যে  থেকেই কেমন যেন ছটফট করছিল। ও সাধারণত খুব শান্ত কুকুর,  অ্যালসেশিয়ান প্রজাতির কুকুররা খুব বাধ্য হয়, প্রভুভক্ত হয়। তাই জিমির হাবভাব দেখে বাড়ির সবাই খুব চিন্তা করছিল। কাকামণির সাথে মাঠে বেড়াতে যায় ,  সেদিন কিছুতেই গেল না। দাদু এসে চেষ্টা করল, তাও গেল না।  সোনার দু'দিন ধরে জ্বর,  ওকে নিয়ে বাড়ির সবার  ব্যস্ততা আছে বলে বেশী  ঘাঁটাঘাঁটি আর করা হলোনা। বাপীর আবার রাত্রে ট্রেন, অফিস ট্যুরে সাতদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে বাপী। জ্বরের মধ্যে মনখারাপটাও বাড়ছিল সোনার, বাপীর সাথে কতদিন দেখা হবে না, কত সুন্দর গল্প  বলে বাপী,  সোনা তাড়াতাড়ি হোমওয়ার্ক করে নিলে। তবে এমনিতে  একটু শরীর খারাপ হলে সোনার  মজাই  হয়,  বকুনি টকুনির   হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আর কত আদর, কত মাথায় গায়ে হাত বুলনো। 

 "সোনা,  কি খেতে ইচ্ছে করছে বল তো,  চিপ্স খাবি?  সন্দেশ খাবি?  চকলেট?  "

 " সোনা গল্প পড়ে শোনাবো? সুকুমার রায় শুনবি?"

          বাপীর সব গোছগাছ কম্পলিট,  ওষুধ  খেয়ে   জ্বরটা একটু কমেছে সোনার, বাপী এসে মাথার কাছে বসলো। 

" লক্ষ্মী হয়ে থাকবে বুঝলে?  একদম দুষ্টুমি করবে না।  আমি এসে নতুন বইগুলো সব মলাট দিয়ে দেবো। "

       জিমি এতক্ষণ সারা ঘরে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছিল,  অস্থির ভাবে। মাঝে মাঝেই দরজার কাছে গিয়ে গরর গর আওয়াজ করছিল। ঠাম্মা বললো ও নির্ঘাত পাশের ফ্ল্যাটের রমাকাকিমাদের   বিড়াল  মানে  ভুট্টাকে ধমকাচ্ছে,  দুই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যেই ঝগড়া করে দু'টোতে।  দাদু  চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লো, কে জানে এইরকম কেন করছে ও। বাপী স্যুটকেস নিয়ে ঠাকুর প্রণাম করে দরজার দিকে  যেই এগোতে যাবে , লাফ দিয়ে এসে বাপীর কাঁধে দুটো পা তুলে দিল জিমি। কিছুতেই যেতে দেবে না বাপীকে। সবাই হাঁ হয়ে গেছে,  এ আবার কেমন অসভ্যতা!  ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে সোনা,

 " ও ঠাম্মা, জিমি পাগল হয়ে গেছে, এবার আমাদের সবাইকে কামড়ে দেবে। "

" আহ্, চুপ কর না সোনা, এ আবার কী বিপদ হল?  অ্যাই জিমি ছাড় বলছি, নইলে মারব কিন্তু এইবার। "

     কিছুতেই বাপীকে ছাড়ছে না জিমি, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে আছে জামার কলার। সবাই এসে চেষ্টা করছে, কাকামণি তো গিয়ে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় মেরেই দিল। বাপী  এরপর  ট্রেন পাবে না। কেমন করে যাবে ডিউটিতে?  আচ্ছা জিমির চোখে জল কেন?  সোনারই চোখে পড়ে ব্যাপারটা।  

" ও ঠাম্মা, জিমি কাঁদছে দেখো, ওর বোধহয় খুব অসুখ করেছে, ও বাপী ডাক্তারকাকুকে ডেকে আনো শিগগিরই। "

" না না, অন্য কিছু, হয়তো  এমন কোনও বিপদ আসতে চলেছে যেটা শুধু জিমিই বুঝেছে।"

 চিন্তিতমুখে বলে দাদু। কিন্তু আর তো সময় দেওয়া যায় না, ট্রেনের ব্যাপার, সে বাপীর জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। কাকামণি জোর করে জিমিকে টেনে ধরে, দাদু ঠাম্মাও হাত লাগায়। মামণি ঘর থেকে আরেকটা জামা এনে বাপীর হাতে দিয়ে দেয়, স্টেশনে চেঞ্জ করে নেওয়ার জন্য, এটা একদম ছিঁড়ে গেছে। প্রবল চিৎকার করে যেতে থাকে জিমি, ওদিকে ভয় পেয়ে বোনুর কান্না, সে এক মারাত্মক অবস্থা। বাপীকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই সবার হাত ছাড়িয়ে জিমি এক দৌড় দেয়। পিছনে সবাই বেরিয়ে আসে, ওকে ধরা তখন  সত্যি  অসম্ভব।  এত  শব্দে তখন প্রায় সব ফ্ল্যাটেরই দরজা খুলে গেছে। বেরিয়ে আসছে মিত্রকাকু, গোমসকাকু, রমাকাকিমা, দিপুদাদা, আবদুলকাকুরা।এবার বাপীর পিছনে জিমি, তার পিছনে অন্য সবাই।   সিঁড়ির নিচে যেখানে মিটারগুলো লাগানো থাকে,   সেখানে এসে হঠাৎ  লাফ দিয়ে কাকে যেন কামড়ে ধরলো। কারা বসে ওখানে!! মিশিরজিই বা কোথায় গেল!! খুব চিৎকার করে লোকটা একটা কী যেন বসিয়ে দিল জিমির গায়ে, কোনও পাত্তাই দিলো না সে। আঁচড়ে কামড়ে অন্য লোকগুলোরও অবস্থা খারাপ করে তুললো। এত গোলমাল শুনে  চারপাশের    ফ্ল্যাটগুলো থেকেও অনেকে বেরিয়ে এসেছে। চলে এসেছে  সি ফাইভের দারোগাজেঠু, এ ফোরের বডি বিল্ডার দাদা।  সবাই মিলে   ধরে ফেলে ডাকাতির উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া চারটে লোককে। যারা মিশিরজিকে হাত, পা, মুখ বেঁধে  ফেলে রেখেছিল  সিঁড়ির তলায়।   

               অনেক চেষ্টা করেও  জিমিকে বাঁচানো যায় নি। ছুরির আঘাতে অনেক রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল তার।  এখন তার দুটো ছবি  আছে  দুই ঘরে।   ঠাম্মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সেই ঘটনার পরে,   এখন টুকটুক করে কিছু কাজকর্ম করে। সন্ধ্যেবেলা জিমির ছবির সামনেও প্রদীপ দেখায়  ঠাম্মা,  অনেক সময় ধরে। সোনা তখন দাঁড়িয়ে থাকে পাশে, মনে হয় জিমি হাসছে ওদের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু চোখের কোণায় একটু জলও যেন চিকচিক করছে। এদিকসেদিক তাকিয়ে নিজের চোখের জলটুকু মুছে নেয় সোনা।                                                                                                                      

         

                                          


             

 

 

                                                        
 


                                                                                    


                                                                                                


No comments:

Post a Comment