পথচলা মানেই আনন্দের ,সে রায়চক হোক বা রোম , আগ্রা বা আলেকজান্দ্রিয়া ,বেড়াতে যাওয়ার নামেই বুকের মধ্যে হাজারটা গঙ্গাফড়িং কিছু না ভেবেই, তিড়িং বিড়িং নাচানাচি শুরু করে দেয় l "ওরে শান্ত হ ,সবদিক দেখেশুনে নে "কে শোনে কার কথা ,নাচাই তাদের কাজ ,সামলাতে গিয়ে বকুনি কম খাই না ,যাই হোক ............
গন্তব্য মিশর ,ছোটবেলায় পড়া "নীলনদের দান"i কথাবার্তা শুরু হতেই উত্তেজনায় ঘুমের বারোটা বেজে গেলো ,যেটুকু ঘুম হয় ,ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নে ভেসে আসে পিরামিড ,মমি ,সাহারা মরুভূমি ,আর ও কতো কী l রাত তিনটে বেজে পাঁচ ,উড়ে চললাম কলকাতা থেকে কায়রো ,ভায়া দোহা .........
আহা ,কী নীল আকাশ , সুন্দর নীলনদ সেই রঙ ভাগাভাগি করে নিয়েছে ,কারো ভাগে একটুও কম পড়ে নি l হোটেলের বিশাল ছাদে সুইমিংপুল , এলোপাতাড়ি ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে দূরে দেখা গেলো গিজা পিরামিডের হাল্কা ছায়া ,কোথায় কোথায় ???আরে ,তাই তো !সত্যিই মিশরে এলাম তাহলে l সন্ধ্যেবেলায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো ,কে জানতো রাত্তিরে এতো ঠান্ডা পড়ে ?চার পাঁচটা লেয়ারে গরম কাপড় জড়িয়েও ভাড়া করা কম্বলে আপাদমস্তক ঢেকে সেই অপরূপ শো দেখেই দৌড়ে হোটেলে ফিরে মোটা লেপের তলায় l
সে অপূর্ব সৌন্দর্য্য ভাষায় বর্ণনা করবার সাহস নেই , দুচোখ ভরে শুধু দেখে নিয়েছি সাহারার মরীচিকা , সত্যিই যেখানে মায়াবী পুকুরে ভেসে আছে উড়ো ঝুরো বালির পাহাড়ের ছায়া ,পথভোলা কোনো হতভাগা দৌড়ে কাছে গেলেই নিমেষে উধাও হবে , দেখেছি আবু সিম্বল ,কারনাক ,লাক্সার ,ফিলে মন্দির ,হাজার হাজার বছরের ইতিহাস যেখানে খোদাই হয়ে আছে ,তাদের বিস্মৃতপ্রায় রূপ রঙ ,কাহিনী নিয়ে ,নীলনদের বুকে পালতোলা নৌকায় ভেসে যেতে যেতে মেতে উঠেছি নুভিয়ানদের গানের তালে ,সে এমনই মোহময় যে আমার মতো মানুষও হাত পা ছুড়ে নেচে টেচে একাকার ,কেউ হাসলো কিনা পরোয়া নেই , বেলুনে উড়তে উড়তে পেরিয়ে এসেছি দুপাশে সবুজ আদর মাখিয়ে বয়ে চলা নীলনদ , রাজা রাণীর উপত্যকায় দেখেছি ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তে ..........
ছোটবেলায় রাজা হয়েছিলেন তুতানখামেন ,মাত্র দশ বছর রাজত্বকালের শেষে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে ,মমি দেখে কী অদ্ভুত এক বিষাদে মনটা ভরে উঠলো ,কায়রো মিউজিয়ামে তাঁর ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেখেও ,কী অন্যরকম ছিলো মিশরীয় সভ্যতার এই মৃত্যুবিলাস ,এই জীবনের চেয়ে মৃত্যুর পরের জীবনকেই বেশী গুরুত্ব দেওয়া .....l
আর একটা কথা না বললেই নয় , বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা শুনে তাহরীর স্কোয়ার এর সামনে দাঁড়িয়ে একটা গা ছমছমে অনুভূতি হচ্ছিলো ঠিকই ,কিন্ত পরক্ষণেই মনে পড়ে গেলো আরে !ইসমাইল ভাই আছে না ? আমিরা এবং মেহমুদ ভাই ও ,ওরা কী অপরিসীম যত্নে এই কদিন আমাদের নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায় ,আগলে রেখেছে প্রাণপণে ,আরো কতো এই প্রাচীন সভ্যতার মানুষ সহাস্যে বলেছে "আপনারা ভারত থেকে এসেছেন না ?আপনাদেরও তো সভ্যতা অনেক প্রাচীন ,"গর্বে বুক ভরে উঠেছে ,নাড়ির টান অনুভব করেছি তাদের সাথে .........
যদি পারি আবার আসবো , নুভিয়ান মিউজিয়ামে হাঁ করে দেখবো অধুনা লুপ্তপ্রায় শিল্পকলা ,
কোমোম্বো মন্দিরের কারুকাজে আধুনিক ডাক্তারী শাস্ত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ছবি দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবো ,নীলনদের জলের রঙ কেমন পাল্টে যায় আকাশের সুর মিলিয়ে ,দেখবো ,আসবো আবার .........
No comments:
Post a Comment