আমি তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি ,বাবা চলে গেলেন l যাদের বাবা ছোটবেলায় চলে যান ,তারাই বোঝে যে পৃথিবীর রূপ পাল্টে যায় সঙ্গে সঙ্গে ,চেনা মানুষদের অচেনা লাগে l দিনরাত চোখে জল চলে আসত l আমাদের সঙ্গেই কেন এমন হলো !আমার সব বন্ধুদের সৌভাগ্য দেখে বড্ডো মন খারাপ হতো l ওদের সাথে মিশতে আর ইচ্ছে করতো না .......
অনেক আত্মীয়স্বজন এসে কয়েক দিন করে আমাদের বাড়ীতে থেকে যাচ্ছিলেন,মা আর আমাদের দুই বোনকে দেখাশোনা করতে ,অনেক অনুশাসন মেনে চলতে হতো তখন ,"সন্ধেবেলা বেরোবি না ,চুল খোলা রাখবি না ,একা একা থাকিস না ,আমাদের কাছে এসে বোস ,খাবি কিছু ?মুখটা শুকনো লাগছে কেন ?"এই সময়ে নাকি আত্মা প্রিয়জনদের কাছাকাছি ঘুরে বেড়ায় ,তাই সাবধানে থাকতে হয় l খুব কষ্ট হতো আমার ,বাবা যদি সত্যিই আসেন ,আমি কেন ভয় পাবো! কেন সাবধানে থাকবো !কতোদিন দেখিনি বাবাকে ,কী করে থাকবো তাঁকে ছাড়া ?সবাই নিশ্চয়ই ভালোর জন্যই বলতেন ,কিন্ত আমি একদম সহ্য করতে পারতাম না কথাগুলো ......
পারলৌকিক কাজের জন্য ছাদে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছিল ,সন্ধেবেলা সবার চোখের আড়ালে ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে থেকেছি কতোদিন ,যদি বাবার দেখা পাওয়া যায় ,যদি কেউ বলে ওঠে "কী হলো বাবুন,পড়তে বসবে না ?ফাঁকি দিলে কিন্ত নিজেই ফাঁকিতে পড়বে l " বারবার মনে মনে ডেকেছি ,ও বাপী ,এসো না একবার ,একটুও কি শুনতে পাচ্ছ না আমার কথা ?দেখতে পাচ্ছ না কেঁদে কেঁদে কেমন চোখ ফুলে গেছে আমার .........?
বাবার চাকরিটা দেওয়া হলো আমায় ,কিছু কারণে পুরনো পাড়া ছেড়ে আমরা তিনজন চলে এলাম সল্টলেকে ,রাস্তাঘাট এতোটাই গোলমেলে লাগতো যে ভালো করে চিনতে পারতাম না l অন্ধের মতো এক বাসে করে অফিস আর বাড়ী ,এই ছিলো দৌড় l একদিন বাড়ী ফেরবার সময়ে বাসে ঘুমিয়ে পড়েছি ,হঠাত্ ধড়ফড় করে উঠে দেখি আমাদের স্টপেজ ছাড়িয়ে অনেকটা চলে এসেছি ,তাড়াতাড়ি নেমে হাঁটা দিলাম বাড়ীর দিকে l রাত প্রায় আটটা বাজে ,অন্ধকার ,রাস্তায় কয়েকটা মাত্র আলো মিটমিট করে জ্বলছে l তখন ওখানে এতো দোকানপাট ছিলো না ,লোকজনও খুব কম দেখা যেত l বুক ঢিপ ঢিপ করছে ,সাহস পেতে ছাতাটা হাতে শক্ত করে ধরে আছি l জোরে হাঁটছি ,হঠাত্ একটা ছেলে সাইকেলে করে পাশ দিয়ে চলে গেলো ,কিছুদূর গিয়ে আবার দেখছি ফিরে আসছে ,এইভাবে দু তিনবার পাশ দিয়ে যাতায়াত করলো ,মনে হছে যেন বৃত্তটা ছোট হয়ে আসছে আস্তে আস্তে ,যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে হেঁটে যাচ্ছি ,আরো কাছে এলেই চিত্কার করতে করতে ছাতা দিয়ে এলোপাথারি পিটুনি লাগাবো ,তারপরে যা হবার হবে ,কেউ কি শুনতে পাবে না ?বাড়ী তখনও অনেকটাই দূর ,ছেলেটা এবার এগিয়ে আসতে গিয়েই পিছন ফিরে জোরে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলো ,মনে হলো যেন কী দেখে খুব ভয় পেয়েছে ,আর এলো না l
পরদিন অফিসে বাবার এক বন্ধু বললেন "বাবুন একটু শোনো ,কাল কি কিছু হয়েছিল ?কোন ও বিপদে পড়েছিলে?"আমি হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি "কেন কাকু ?হঠাত্ এই কথা জিজ্ঞেস করছেন যে ?" "কী বলবো তোমায় ,কাল রাত্তিরে ঘুমোচ্ছি ,চিত্তদা যেন ঠেলা দিয়ে তুলে দিলো ,বললো ,আমার বাচ্চা মেয়েদের দায়িত্ব তোমাদের দিয়ে এসেছি ,তোমরা একটু নজর রাখছো না ?ওকে বলবে যেন ফেরার সময়ে ঘুমিয়ে না পড়ে ,বিপদ আসতে কতক্ষণ !
আমি এতবার ডেকেছি ,বাবা কোনওদিন দেখা দেন নি ,একরাশ অভিমান জমা হয়ে ছিলো মনের মধ্যে ,কাকুর কথা শুনে তা শরত্কালের ঝুরো মেঘের মতন উড়ে গেলো ,অনুভব করলাম বাবা ছেড়ে যাননি আমাদের ,এখনও হয়তো কোনও কারণে মন খারাপ হলে বলে উঠবেন " বাবুন,সবার ভালটা নিতে শেখো ,খারাপটা ভুলে যাও ,দেখবে সুখী হবে ,সেই সুখ কেউ কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না"...............
Friday, 28 April 2017
"অনুভব "
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment