ঘটনাটা এখনো আমার কাছে ধোঁয়ায় ভরা ,কী যে উদ্দেশ্য ছিলো তার ,আজ অবধি বুঝতে পারি নি ,এই এত বছর পরে ও ওই বাড়িটাকে দেখলে একটা কেমন দম চাপা কষ্ট ,দুঃখ ,একটা অচেনা আতঙ্ক তাড়া করে আসে ,প্রাণপণে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিই ,চোখ বুজে ফেলি ,কোথায় থাকতাম এতদিনে আমরা ,আদৌ থাকতাম কী ?
খুলেই বলা যাক ঘটনাটা ,তখন ক্লাস সিক্স এ পড়ি ,আমার বোন ক্লাস টু তে , বাবা মা চাকরি করতে বেরিয়ে গেলে আমাদের গার্জেন হয়ে যেত কাজের দিদিরা ,বিভিন্ন সময়ে পালটে ও যেত তারা ,কারো বিয়ে হয়ে যেতো ,কেউ বা এমনি কাজ ছেড়ে দিতো ,নতুন দিদি এলে একটু বুঝে নিতাম আমি ,এ কেমন হবে ,দুষ্টুমির কথা মা বাবাকে বলে দেবে না তো ?দুধের গ্লাস ,ছানার বাটি নিজের দায়িত্বে খালি করে দেবে তো ?মা তাকে কী কী কাজ করতে হবে বোঝাতেন ,আর আমি বোঝতাম কী কী অকাজ করতে হবে ,কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ডিল হয়ে যেত ,সে দুপুরে টিভি দেখেছে আমি বলবো না ,সেও বলবে না পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে আমার মারপিটের কথা ,মানে দু পক্ষই নিজেদের সীমানা লঙ্ঘন করবে না আর কি l
পুরনো লোক মালতী দি প্রায় দুবছর কাজ করে চলে যাওয়ায় আমাদের সব্বার খুব মন খারাপ , যেমন মায়ের প্রিয় ছিলো তেমন আমাদের ,কত অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করেছে ,নালিশ করে বকুনি ,মার খাওয়ায় নি l কিছুদিন পর এলো মঞ্জু দি ,খুব লম্বা চওড়া চেহারা , কেমন একটু যেন অন্যরকম , এতদিন যারা ছিলো তাদের মতো নয় , কেমন রঙচঙে জামাকাপড় পরতো ,লুকিয়ে লিপস্টিক লাগাতো ,তবে ঘরের কাজ ভাল ভাবে করত ,আমাদের যত্ন ও করত কিন্ত আমি বুঝতে পারতাম একে রেখে দেওয়ার ইচ্ছে নেই মা বাবার , অন্য লোকের খোঁজ করা হতো ,পাওয়া যাচ্ছিল না ,যাই হোক ,কেটে গেল কয়েক সপ্তাহ l
এক বিকেলে মঞ্জু দি বলল 'চল বাবুন এক জায়গায় যাবে ?মাকে বলবে না কিন্ত '
'কোথায় গো ?
'আছে একটা জায়গা ,চল না '
কিছুদিন আগে লুকিয়ে আচার খেতে গিয়ে কাচের শিশি ভাঙলেও মায়ের কাছে নালিশ করেনি ,দোষটা নিজের ঘাড়ে নিয়েছে ,সেই কৃতজ্ঞতায় বিকেলবেলার খেলা ফেলে যেতে রাজী হলাম ,ও করল কি ,বাড়ীর চাবিটা পাশের বাড়ীতে দিয়ে এলো ,আমি বললাম কেন দিলে ,আমরা তো এক্ষুনি চলে আসব ,বলল ঠিক আছে চল না ,দেখবে গেলে আর আসতে ইচ্ছে করবে না ,বাবা মা এসে কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে ?
তখন অতটা মাথায় আসে নি ,এই বলছে মা কে না বলতে আবার দেরী করে ফিরলে তো এমনিই সবাই জানতে পেরে যাবে ,পইপই করে বারণ করা ছিলো যেন কারো সঙ্গে কোথাও না যাই l
প্রায় আধ ঘন্টা হেঁটে একটা বাড়ীতে পৌঁছলাম আমরা ,বোন তো তখন খুব ছোট ,অতটা হেঁটে পা ব্যথা করছে , আমরা যেতেই এক মহিলা খুব হাসিমুখে আমাদের ঘরে নিয়ে গেলেন , 'কী সুন্দর দেখতে রে মঞ্জু ,এদের কথাই বলেছিলি ?বোস বোস তোমরা ,কী খাবে বল ,' আঃ বড্ড বেশী কথা বল তুমি ,যাও ,কিছু খেতে দাও ওদের ,আর শোনো বাবুন ,বুবাই ,একদম এখান থেকে কোথাও যাবে না ,আমি একটু বেরোচ্ছি ,কাজ আছে ,এক্ষুনি চলে আসব ,তারপর বাড়ী যাব ,তোমরা ততক্ষণ টিভি দেখ '
'কিন্ত বাপী মামনি চলে আসবেন তো ,খুব বকবেন কিন্ত দেখো আমাকে ,তোমাকে ও '
ও মা ,কোনও পাত্তাই দিল না ,মিষ্টি হেসে বলল 'আরে না না ,দেরী হবে না ,এই যাব আর আসব ,খুব দরকারী কাজে যাচ্ছি ,চুপচাপ বোস l '
কী আর করা যাবে ,বসে বসে টিভি দেখতে থাকলাম ,কিন্ত কেমন একটা অস্বস্তি যেন মাথার মধ্যে ঘুরছে ,কোথায় নিয়ে এলো আমাদের ?এনেই কোথায় চলে গেল ?কেন ?এখনো আসছে না কেন ?দেরী হয়ে গেলে বকুনি আমাকেই খেতে হবে ,বোন তো ছোট ,আমি যা বলি তাই শোনে ,আমি কেন আসতে রাজী হলাম ?কিছুক্ষণ পরে দু বাটি মুড়ি মাখা নিয়ে ওই মহিলা এসে বলল 'আহারে মুখটা শুকিয়ে গেছে ,নাও খেয়ে নাও ,নারকেল বাদাম দিয়ে মেখে দিয়েছি '
'মঞ্জু দি কোথায় গেল ?এখনো আসছে না কেন ?'
'এক্ষুনি এসে যাবে ,খেয়ে নাও ,দাঁড়াও মিষ্টি নিয়ে আসি'
মহিলা ঘরের বাইরে বেরোনো মাত্র বোনের হাত চেপে ধরলাম আমি ,বেচারী মুড়ির দিকে হাত বাড়িয়েছিল 'খাসনা বুবাই ,চল বাড়ী যাব ,তুই মিছিমিছি খুব বায়না কর বাড়ী যাবার জন্য '
'কেন রে দিদিভাই ?মঞ্জুদি এসে নিয়ে যাবে তো '
কী বোঝাব এই গাধাটাকে ?গোয়েন্দা গল্পের বই তো আর পড়েনা ,কী করে বিপদ টের পাবে ?খিঁচিয়ে উঠে বললাম 'যেটা বলছি কর ,তাড়াতাড়ি '
মুখের দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে ,কান্না মাখা মুখে বাড়ী যাবার বায়না জুড়ে দিল ,ইতিমধ্যে মহিলা মিষ্টি হাতে এসে গেছে , আমি বললাম 'দেখেছ তো ,বোন কাঁদছে ,আমরা এক্ষুনি বাড়ী যাব ,ওর খুব পেটে ব্যথা করছে '
কিছুতেই আসতে দেবে না ,না তোমরা চলে গেলে আমি খুব বকুনি খাবো ,এক্ষুনি মঞ্জু এসে যাবে ,তোমরা নেই দেখলে আমায় আস্ত রাখবে না ,এদিকে বোনের কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে বাড়ছে ,এইবার আমি শুরু করলাম ,আমার কাংসবিনিন্দিত কণ্ঠে ,কিছু সময় সহ্য করে শেষে বলল 'আচ্ছা যাও ,এমন কাঁদছ এবার লোকে ছুটে এসে আমাকে ছেলেধরা বলে পেটাবে '
বাড়ী তো যাব ,কিন্ত কোথা দিয়ে ?কিছু চিনতে পারছি না তো ,কিছুটা রাস্তা এপাশ ওপাশ ঘুরে দেখি কলেজের কাছে চলে এসেছি ,ব্যস আর আমায় পায় কে ,এই ঠাকুর পুকুর বিবেকানন্দ কলেজের একটু পরেই স্কুল ,যেখানে আগে পড়তাম ,তার পাশ দিয়ে চেনা রাস্তায় ছুট ছুট ছুট ,বাড়ী ফিরে একপ্রস্থ মার , 'কেন গেছিলি ?বারণ করা আছে না ?দাঁড়া আজ মঞ্জু আসুক কেন উল্টাপাল্টা জায়গায় নিয়ে যায় ?'
তখন মার বকুনি সব ভাল লাগছে ,অতটা বোঝা যায়নি সেই সময় ,কিন্ত সারারাত মঞ্জু দি ফিরল না ,মা বাবার মুখ আস্তে আস্তে কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল ,পরেরদিন ভোরবেলা উঠে দেখি নিজের ব্যাগ নিয়ে সে চলে যাচ্ছে ,সেই কুয়াশার মধ্যে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাওয়ার ছবিটা আমার এখনো মনে পড়ে l
কিছুদিন পরে জানা গিয়েছিলো একটা ছেলেধরা চক্রের সাথে মঞ্জু দি জড়িত ছিলো ,মিথ্যে পরিচয় দিয়ে আমাদের বাড়ীতে কাজে এসেছিল , নামটা ও সঠিক বলেনি ,তখন তো এত ফোন টোন ছিল না ,আমাদের বসিয়ে দলের লোক আনতে গিয়েছিলো বোধহয় ,হয়তো মুড়ির বাটিতে ঘুমের অসুধ মেশানো ছিল ,কিছুটা পরিকল্পনার অভাবে সফল হয়নি ওরা ,তাই এই লেখাটা লিখতে পারলাম ,নইলে আজ কোথায় থাকতাম ,আদৌ থাকতাম কিনা আমরা দুই বোন ,কে জানে l
!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!
Saturday, 8 July 2017
যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment