Monday, 14 November 2016

"দোলাচল"

      গত কাল রাত্রে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে মিমি ,ও নাকি একটা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ,সামনে দুটো নৌকায় ওর দুজন মিস্ ,একজন গানের আর একজন অঙ্কের ,তাঁরা  দুজনে ই ওকে ডাকছেন "ও সুচন্দা ,তুমি আমার সাথে চলো ,আমি তোমায় খুব সুন্দর জায়গায় নিয়ে  যাবো ,সেখানে তুমি খুব ভালো থাকবে ......"মিমি একবার ভাবছে অঙ্কের নৌকায় যায় আবার ভাবছে না গানই ভালো ,ইতিমধ্যে নাকি দাদা গিয়ে বিনুনী ধরে টেনে তুলে দিয়েছে ,ফলতঃ ব্রেকফাস্ট টেবিলে মুখ ভার  করে বসে আছে মিমি .....
      
       দ্রুত হাতের কাজ সারছিলো কেয়া , মেয়ের
স্কুলের বাস এক্ষুনি এসে যাবে ,তার আগে টিফিন গোছানো ,ছেলে কলেজ যাবে তার প্রস্তুতি ,নিজের অফিসের জন্য রেডি হওয়া ,নিশ্বাস নেওয়ার ফুরসত থাকে না এই সময়ে ,"ওরে মিমি ,তাড়াতাড়ি রেডি হ ,বাস চলে গেলে আজ কিন্ত দাদা বাইকে করে দিয়ে আসতে পারবে না ,ওর টিউশনি আছে "
"যাব না আমি দাদার সাথে ,বাজে বিচ্ছিরি দাদা "

        উল্টো দিকের চেয়ারে বসে মিটমিট করে হাসছিল সায়ন ,আরও রাগাতে বলে ওঠে "তোকে কেউই নিতো না ,কিছুদূর গিয়েই ঝপাস করে নদীতে ফেলে দিতো বুঝলি ?ওই তো গান আর অঙ্কের ছিরি ,আমিই  বরং বাঁচালাম তোকে ,এর জন্য কোথায় ধন্যবাদ দিবি আমায় ,তা না "
"ও ও মা আ আ ,দেখো না ,আমি কিন্ত কিচ্ছু খাবো না আজকে ,ও বাবা ,বকছ না কেন দাদাকে ?

     কাগজ পড়তে পড়তে মুখ তোলে মলয় ,এই এক নেশা তার ,সকালবেলা ই  পুরো কাগজটা খুঁটিয়ে পড়া চাই ,এমনকি ব্যস্ততার মধ্যেও  ,অন্যমনস্ক ভাবে বলে "কেন ওর পিছনে লাগছিস ?এক্ষুনি কান্নাকাটি ,মারপিট সব শুরু হবে ,তখন তোকেই আবার রাগ ভাঙাতে হবে "
মিমির মনে হয় বাবা তো দাদা কে বকুনি দিলোই  না ,বরং ওকে কাঁদুনে ,মারকুটে কতো কী বলল ,সোজা গিয়ে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে সে ,"ওরে ছাড় ছাড় ,দেরী হয়ে যাচ্ছে ,ওমনি করে না সোনা মেয়ে আমার "সায়ন আবার ফুট কাটে "হ্যাঁ ,বিয়ের পর পকেটে করে মা কে নিয়ে যাস ,কিসুই তো করতে পারবি না ,বকুনি খেলে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দিবি "
    চটাস করে থাপ্পড় লাগায় কেয়া ছেলের কাঁধে "কীরে ,এইবেলা দেরী হচ্ছেনা তোর ?শুধু বোনের পিছনে লাগা ....."
   মলয় বলে "আহ্ ,মারছ কেন ?ভাইবোনেরা খুনসুটি করবে না ?"
"তাহলে তুমিই সামলাও তোমার আদরের ছেলেমেয়েদের ,তোমার আর কী ?দুপুরে ট্রেন ,এখন বসে মজা দেখছ ,আমায়  অফিস যেতে হবে না ?"
  ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে মলয় ,"তোমায় তো বলাই হয়নি ,একটু আগে অফিস থেকে ফোন এসেছে ,আমিও সায়নের সাথেই বেরোব,অফিস থেকে কয়েকটা জরুরী কাজ সেরে পেপারস কালেক্ট করে ওখান থেকেই ট্রেন ধরে নেবো "
"যাহ্ বাবা ,আগে বলবে তো ,আমি এখন অফিস যাবো না তোমার লাগেজ গোছাব?"
"কী করে আজ অফিস যাবে তুমি ?আজ সায়নের ঘরের এসি ইনস্টল করতে আসবে না ?প্লীজ কেয়া ,একটু সামলে দাও  আজ ,রাগ করো না "
      সঙ্গে সঙ্গে মিমি মায়ের কোমর ধরে ঝুলে পড়ে ,"হ্যাঁ মা ,প্লীজ থাকো ,আমি দুপুরে তোমার কাছে ভাত খাবো ,ঘুমাবো ,থাকো না মা "

     রিমোট কন্ট্রোল হাতে অলস ভাবে টিভির সামনে বসে ছিলো কেয়া ,আজ প্রচুর ঝামেলা গেছে সারাদিন ,এখনও গরম পড়ে নি তবু দুটো ঘরে এসি বসে গেলো ,মলয় একেবারে ছেলেমেয়ে অন্ত প্রাণ ,সত্যিই সুখী হয়েছে কেয়া ওকে পেয়ে ,শুধু একটা কালো অন্ধকার স্মৃতি ,দমবন্ধ পরিবেশ .......,না না ,মাথা ঝাঁকায় কেয়া ,কোন ও কিছু যেন ছায়া না ফেলে ওর এই রোদ্দুর মাখা সংসারে l

       পাশে মিমি ঘুমোচ্ছে ,সস্নেহে তাকায় তার দিকে ,সবাই বলে ওকে পুরো মায়ের মতো দেখতে ,হতে পারে ,তবে স্বভাব পুরো উল্টো l নিজের কথা মনে পড়ে যায় তার ,অনেক ছোটবেলায় মা মারা যাবার পরে বাবা আবার যখন বিয়ে করলেন ,সবাই বলেছিল মেয়েটার কপালে দুঃখ আছে l নতুন মায়ের নিক্তি মাপা কর্তব্যে আর শাষনে বেড়ে ওঠা কেয়া কখনও মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতে পারে নি ,গ্রাজুয়েশনের পরে এম এ পড়বার ইচ্ছেকে চাপা দিয়ে বিয়ে করতে হয়েছে সুদূর মফস্বলের বনেদী  পরিবারে ,যেখানে সারাদিন কেটে যেতো ঘরের কাজে ,মেয়েদের বেশী পড়াশোনা করা যেখানে সমালোচনার বস্তু ,যেখানে  কেউ কোনোদিন বুঝতে পারেনি এই ভীরু মেয়েটার বুকের মধ্যে জন্ম নিয়েছে ঘৃণা ,আর তাতে জলসেচন করে গেছে প্রতি রাত্রে ভালোবাসাহীন বিবাহিত জীবনের প্রাপ্য বুঝে নেওয়া l

      "অ্যাই টুসি ,আজকের কাগজটা নিয়ে আয় তো ,একটু চোখ বুলিয়ে নিই ,যা ঝামেলা গেলো আজ "কাজের  মেয়েটাকে ডাক দেয় কেয়া ,ময়দা মাখতে মাখতে উঠে আসে টুসি ,"ও মামী , কোথাও নেই গো ,আমি একটু আগেই খুঁজে দেখেছি "
"সে কী রে !কোথায় যাবে কাগজ ?"
"মনে হয় এসি লাগানোর লোকগুলো নিয়ে গেছে  জানো ?"
"হ্যাঁ ,তাদের তো আর কাজ নেই তাই কাগজ নিয়ে গেছে ,থাক ছেড়ে দে ,ময়দা মাখা হলো ?"
"এই  তো হয়ে এলো "
"হয়ে গেলে বলবি ,কিমার  পুর ভরে ফেলবো "
"আচ্ছা "
     ধূপগুড়ির বিখ্যাত ব্যবসায়ী অবনী সেনের স্ত্রী হয়ে আর কয়েক বছর থাকতে হলে কেয়া বোধহয় মরেই যেতো ,ওই ঘন অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আলো নিয়ে এলো অবনী সেনের মামাতো  ভাই মলয় ,কেয়ার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো সেই আলোর ছোঁয়ায় ,এক রাত্রে কেয়া আর এক বছরের সায়ন কে নিয়ে পিসির বাড়ী ছাড়ল মলয় ,তারপর অনেক বছর কেটে গেছে লড়াইয়ে ,ওদের ভালো রাখার জন্য চেষ্টার অন্ত নেই তার ,কেয়াও এম এ কমপ্লিট করে সরকারী চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে ,অনেক ভালো আছে সে এখন , তবু মাঝে মাঝে একটু দোলাচলে ভোগে কেয়া ,সত্যিই কী সায়নকে  অতটাই  ভালোবাসে মলয় ?মানুষ কী এতটাই স্বার্থশূণ্য হতে পারে ?কে জানে ...........

     মলয় ফোন করেছিলো একটু আগে ,ওদের ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে ,হঠাত্ বললো "কেয়া ,তোমার শরীর ঠিক আছে ?তুমি রাগ করো নি তো আমার ওপর ?"হেসে ফেলেছে কেয়া ,ও ,বাবুর তাহলে মন খারাপ হয়েছে ,কয়েকটা দিন সবাইকে ছেড়ে থাকতে হবে তো ,এতো ছেলেমানুষ আছে এখনও ......

     লাফাতে লাফাতে বাড়ী ঢোকে ছেলে "ও মা ,দারুণ খবর আছে ,দারুণ খবর ,দাঁড়াও আগে হাতমুখ ধুয়ে আসি ,তারপর বলছি ,ওকি !মিমি এখনও ঘুমোচ্ছে কেন ?অ্যাই ওঠ ওঠ ,আবার কিন্ত সেই দু নৌকায় পা রাখার স্বপ্ন দেখবি" আলতো হাতে বোনকে আদর করে বাথরুমের দিকে চলে যায় সায়ন l

      এক একটা কথা বুকের মধ্যে গিয়ে রক্ত ঝরায় ,সে কী নিজেও দু নৌকায় পা রাখেনি ?না না ,তা কেন হবে ,সে তো পরিপূর্ণ ভাবে এই  সংসারকেই  ভালবেসেছে ,অবনী সেন আর তার পরিবার কবেই মুছে গেছে তার মন থেকে .....কবেই .........

      "মা ,এই দেখো আমাদের ব্যান্ডের কী দারুণ রিভিউ বেরিয়েছে কাগজে ,একদম ছবি টবি দিয়ে ,ঝাক্কাস !তোমার ছেলেকে চিনতে পারছ তো ?এইবার বাবা আর কেমন করে বলবে যে আমি গান গাইতেই পারি না ?"

      হাসিমুখে ছেলের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখতে গিয়েই একটা খবরে চোখ আটকে যায় কেয়ার ,গত পঁচিশ তারিখে বিখ্যাত ব্যবসায়ী অবনী রায় পরলোক গমন করেছেন ,তাঁর আত্মার শান্তির জন্য আগামীকাল পারলৌকিক ক্রিয়ার আয়োজন করা হয়েছে অমুক মন্দিরে ,চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে যায় কেয়ার ,ও ,এইজন্যই কাগজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আজ ,কেয়ার অফিস বন্ধ হলো যাতে সে অফিসে কারো কাছে কাগজ পড়তে না পারে l
দোলাচলে কে ভুগছে তাহলে ?অত ব্যস্ত না হলে মলয় খেয়াল করতে পারত যে অবনী রায় মারা গেছেন ,সেন নয় ,ওকি ভেবেছিল এই খবর পেলে তক্ষুনি ছুটে চলে যাবে কেয়া ?হয়তো এভাবেই কাটবে তাদের নকল সংসারের দিনরাত্রি ,আইনত সে যে এখনো অবনী সেনের স্ত্রী ,হয়তো এভাবেই একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে সবকিছুই ,দীর্ঘশ্বাস চেপে জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে কেয়া বলে "বোনকে ঘুম থেকে তুলে ডাইনিং টেবিলে আয় ,আজ চিকেন কিমা দিয়ে পরোটা করেছি ,গরম গরম খাবি l
         ----:-:------:-:------:-:-----:-:-----:-:-----:-:----

3 comments:

  1. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  2. Story with a dichotomous path culminating in a sudden narrow twist. Loved the style of writing.

    ReplyDelete