সরস্বতীপুজো, ছোটবেলায় মনে হতো এই সময়টায় রোদ্দুরে কে যেন বাসন্তী রঙের আদর মাখিয়ে দিয়েছে , টুকরো টাকরা হাওয়া, শীতটা যাই যাই করছে, কিন্তু যাচ্ছে না, চান করবো কী করবো না, ভাবতে ভাবতেই কখন দেখতাম, ভিজে গায়ে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে মায়ের ভালো ভালো শাড়ীগুলো নিয়ে টানাটানি আরম্ভ করে দিয়েছি, পরে স্কুলে যাবো বলে। তারপর তো আছেই হুড়োদ্দুমাস করতে গিয়ে আঁচলটা ফর্দাফাঁই করে আনা অথবা শাড়ী সামলাতে না পেরে ধপ্পাস করে পড়ে গিয়ে গোড়ালি মচকে সাতদিন বিছানায় শুয়ে থাকা, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে মায়ের দাঁত কিড়মিড়ি আর বাছা বাছা শব্দ প্রয়োগ, থাক গে, ওগুলো তো ছিলো প্রায় প্রত্যেক বছরের ব্যাপার, ক্লাস টেনে পড়বার সময় যে ঘটনা ঘটেছিলো, সেটা বড়ই হৃদয়বিদারক, এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়লে.... আচ্ছা থাক, প্রথম থেকেই বলি।
তখন সবে সবে ক্লাস টেনে উঠেছি, বিশাল ব্যাপার, কাঁধে কত্ত কত্ত গুরুদায়িত্ব, সরস্বতীপুজো করতে হবে, স্পোর্টস এর ইভেন্ট ভাবতে হবে, প্রেয়ারের সময় নাইন ওবধি পুঁচকেগুলোকে সামলাতে হবে, কুইজ পরিচালনা করতে হবে, কাজ কী একটা? প্রায় দিদিমণিদের সমকক্ষ মনে হচ্ছে নিজেদের, কলার ফলার উঠিয়ে গটমট করে হাঁটছি, চেহারাই পালটে গেছে। তখন পুজোর আর দিন পনেরো বাকি, হইহই করে গিয়ে সরস্বতীমূর্তি পছন্দ করে এলাম আমরা কয়েকজন,এইবার প্যান্ডেল সাজানোর পালা। আমাদের স্কুলটা ছিলো এল শেপের, ঢুকে অফিসঘর, তার পাশেই একটা বড় ঘরে পুজোর তোড়জোড়, সব কাজ সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হলো, আলপনা দেবে কাকলী, দোলা আর পর্ণা, নামী শিল্পী বলে পরিচিত এরা, ফুল দিয়ে সাজাবে মৌসুমি, জয়া, দেবারতি আর টুসি, বিভিন্ন হাতের কাজে জায়গাটা ভরিয়ে দেবে বিধুরা, মহুয়া, তুলিলেখা। আমার দিকে কেউ একটিবার ও তাকালোই না, নেহাত নাকি বন্ধুদের হিংসা করতে নেই, তাই, নইলে মজা দেখিয়ে দিতাম আর কী।
সরস্বতীপুজো তো আর এমনি হয় না, এই পুজোর সংগে স্কুলের মানসম্মান জড়িয়ে আছে, আশেপাশের সব স্কুলকে নেমন্তন্ন করে এসেছি আমরা গিয়ে, তাদের কাছে মুখ থাকতে হবে তো। আমাদের টেন সি এর দিদিমণি ছিলেন কেয়াদি, তাঁর সাজানোর হাত ছিলো ভীষণা সুন্দর, তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হতো সরস্বতীপুজোর । তিনি সবাইকে বাড়ী থেকে বিভিন্ন জিনিষ আনতে বলে দিলেন, কেই আনবে চারটে ফুলদানি, কেউ আনবে টেবিলকভার, কেউ ছোট চীনেমাটির পুতুল , এই আর কী, মানে যেগুলো আবার ফেরত দেওয়া যাবে। অনেকক্ষণ পরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন 'চৈতালী, তুমি একটা ধবধবে সাদা কাপড় নিয়ে আসবে তো, বেশ বড় দেখে, বুঝলে? ' 'ঢক করে মাথা নেড়ে দিলাম আমি, আরে, এ তো একদম সহজ কাজ, সবার বাড়ীতেই সাদা কাপড় থাকে, চিনেমাটীর পুতুল আনতে বললে চাপ হয়ে যেতো।
বাড়ী ফিরলাম, শুরু হলো বড় সাদা কাপড় খোঁজা, যা ব্বাবা, একটাও নেই তো,বাড়ীতে একটা ধবধবে সাদা কাপড় থাকবে না? এ আবার কেমন কথা! আলনা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো, আলমারি যেগুলো চাবি দেওয়া ছিলো না, উদ্বাস্তু পরিবারের রূপ নিলো, যাক গে, মা অফিস থেকে ফেরবার আগেই বোনকে পটিয়েপাটিয়ে ঠিকঠাক করে নিতে হবে, আমার আবার গোছগাছ ঠিক আসে না। অনেকবার হিংস্র দৃষ্টিতে চাবি দেওয়া আলমারিটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, নিশ্চিত ওর মধ্যেই আছে সেই পরম রত্ন, লুকিয়ে নিতে হবে তো, জানলে কেউ নিতে দেবে না, বড় অন্যায়, কবে কী কী নিয়ে গিয়ে আর অক্ষত ফেরত আনিনি, সেই কথা মনে করে রেখে দিয়েছে, যত সব। যাই হোক, মন টন খারাপ করে বিছানায় বসে আছি, হঠাত্ এক বুদ্ধি মাথায় চিড়বিড় করে উঠলো, আরে, এই তো লেপের ওয়াড়, সাদা, পেয়ে গেছি, তবে ধবধবে নয়, একটু কালচে কালচে লাগছে, ঠিক হ্যায়, কোঈ বাত নেহি, এক গামলা জলে এক খাবলা গুঁড়ো সাবান দিয়ে সেটা কাচতে শুরু করলাম। ও বাবা, যতই কাচি, সাদা আর হয় না, এক চৌবাচ্চা জল শেষ হয়ে গেলো, কাপড় কাচার সাবানও আধ কৌটো শেষ, ইতিমধ্যে কখন যে সন্ধ্যে হয়ে গেছে, জানিই না। অফিস থেকে ফিরে মা আমাকে চুলের মুঠি ধরে বাথরুম থেকে বের করলো, ততক্ষণে আমার নাক দিয়ে প্রবল বেগে জল পড়ছে, জ্বর এল বলে, স্কুলে নিজের সম্মান রাখবার আর কোন ও উপায় নেই দেখে, চোখের জলে আত্মসমর্পণ করলাম।
বড় মেয়ের কান্নাকাটি দেখে বাবা বললো 'আহা থাক থাক, বাবুন, তুমি আমার ধুতিটা নিয়ে যাও, বলছ তো, সাজানোর কাজে লাগবে, কাজ হয়ে গেলে নিয়ে এসো, '
'কেমন কথা বলছ তুমি? তোমার তো ওই একটাই ভালো ধুতি আছে, বিয়েবাড়ী যেতে টেতে পরতে হয় না?''
'ও তো আর বাজে কাজে নিচ্ছে না, স্কুলে সরস্বতী পুজো তে সাজাতে লাগবে, তাই নিচ্ছে, নষ্ট করবে না তো বাবুন? '
'নাঁ নাঁ, বাঁপীঁ, পুঁজোঁ হঁয়েঁ গেঁলেঁ ইঁ নিঁয়েঁ চঁলেঁ আঁসঁবোঁ............... '(কাঁদলে গলাটা যদি নাকি হয়ে যায়, আমার কী দোষ?)
পাশ থেকে মা, তীব্র স্বরে , 'হ্যাঁ, একটা যদি দাগ লাগে না, মেরে পাটপাট করে দেবো কিন্ত, বাপীর নতুন ধুতি নিয়ে যাচ্ছ, মনে থাকে যেন '
পরেরদিন, বুক ফুলিয়ে স্কুলে, হুঁ হুঁ বাবা, এত দুন্দর সাদা কাপড় কেউ আনতে পারে নি, কেয়াদির খুব পছন্দ হলো, বললেন, 'বাঃ , এমন না হলে কী আর এঁকে সুখ আছে? যাও সুতপা, নীল রঞ্জক সাবানে ওই কাপড়টার কিছুটা কিছুটা অংশ ডুবিয়ে দাও, আচ্ছা চলো, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, তুমি একা পারবে না, কিছুটা থাকবে ধবধবে সাদা, কিছুটা নীল, মানে আকাশ থাকবে মূর্তির ব্যাকগ্রাউন্ডটা আর কী,বুঝেছ তো? আর তুলিলেখা তোমার হাঁস তৈরী তো? '
আমি বসে পড়ে (আক্ষরিক অর্থে) দেখতে লাগলাম কেমন করে বাপীর ভালো নতুন ধুতি পরিণত হল নীল সাদা আকাশে, তার উপর দিয়ে উড়ে আসছে বিশালাকৃতি দুটি সাদা রাজহংস, (আঠা দিয়ে কষ কষে করে আটকানো) লাল রঙের সুর্য্য উঠে আসছে, আকাশে একটু একটু লাল গোলাপী আবীর ছড়িয়ে দিয়ে, আর ভাবতে লাগলাম বাড়ী ফিরবো নাকি যেদিকে দু চোখ যায় চলে যাবো। ভয়ের থেকেও বেশী অনুভব করেছিলাম লজ্জা, বাপীর ধুতিটা নষ্ট হলো বলে, লুকিয়ে মোছা চোখের জলে ভেবেছিলাম, চাকরী পেয়েই বাপীকে খুব সুন্দর একটা ধুতি কিনে দেবো, বাপী কিন্তু সেই সুযোগটা আমায় দেয় নি।
No comments:
Post a Comment